অগ্নিকুমার আচার্য
পড়াশোনায় ভালো নয়। সবসময় ক্লাসে পেছনের বেঞ্চে বসে। পরীক্ষায় কোনোদিন ভালো নম্বর পায়নি। সেই পেছনের বেঞ্চের ছেলেই তাক লাগিয়ে দিল নতুন ব্যাটারিচালিত গাড়ি আবিষ্কার করে। তাই নাকি? কে সে?
প্রমিত সাহা।
অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া। পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জের অশোকপল্লিতে বাড়ি। এক বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। লেখাপড়ায় ভালো নয় প্রমিত। কোনোমতে টেনেটুনে পরীক্ষায় পাশ করে উঁচু ক্লাশে ওঠে। কিন্তু কীসের এক অজানা নেশায় সেবুঁদ হয়ে থাকে। কেউ জানে না তার মনের খবর।

প্রমিত সাহা
ক্লাস সেভেনের বার্ষিক পরীক্ষা সামনে।
প্রমিত তার বাবা বিপ্লব সাহার কাছে বায়না ধরে। তাকে কুড়ি হাজার টাকা দিতে হবে।
বাবা বলেন, ‘পরীক্ষা সামনে, এখন কুড়ি হাজার টাকা চাইছিস? কেন রে?’
ছেলে আবদার করে, ‘দাও-না বাবা কুড়ি হাজার টাকা।’
বাবা প্রথমটায় রাজি হননি। পরে সাত-পাঁচ ভেবে বললেন, ‘টাকা দিতে পারি একটা শর্তে। পরীক্ষায় সব বিষয়ে ভালোভাবে পাশ করতে হবে।’
‘তাই হবে বাবা। সব বিষয়েই পাশ করে এইটে উঠব। কথা দিচ্ছি।’— ছেলে দৃঢ়স্বরে বলে।
বাবা আর আপত্তি করেন না। ছেলের আবদার মেটালেন। যদি পড়াশোনায় সেআরও মনোযোগী হয়।
পরীক্ষার ফল বেরোল। কথা রেখেছে প্রমিত। সব বিষয়েই পাশমার্ক পেয়েছে। যদিও তেমন ভালো নম্বর নয়।
কিন্তু কুড়ি হাজার টাকা দিয়ে এই বয়সে সেকী করবে!
শুনলে তোমাদের চোখ কপালে উঠবে!
প্রমিত করল কী, চার চাকার গাড়ির পুরোনো টায়ার কিনল। সঙ্গে আরও কিছু যন্ত্রপাতি। দিনরাত তার মাথায় এক চিন্তা। ব্যাটারিচালিত চার চাকার নতুন গাড়ি বানাবে। দূষণহীন গাড়ি।
অবাক কান্ড! একদিন একটা গাড়ি সেবানিয়েই ফেলল।
কোনোমতে পাশ করা ছেলে কিনা নতুন গাড়ি বানিয়ে ফেলেছে! তাও মাত্র কুড়ি হাজার টাকায়! বিশ্বাস হয় না স্কুলের স্যারদের, প্রমিত হতাশ হয়। স্যারদের অনেক অনুরোধ করে তার তৈরি গাড়িকে প্রদর্শনীতে পাঠাতে। সর্বভারতীয় অটোমোবাইল প্রযুক্তির প্রদর্শনীতে। কিন্তু স্যারদের অনুমতি মেলেনি।
প্রমিতের জেদ বাড়ে। নিজেই খোঁজখবর নিয়ে প্রদর্শনীতে পাঠিয়ে দেয় তার স্বপ্নের আবিষ্কার। যদিও ব্যাটারিচালিত মোটরগাড়ি প্রমিতের নতুন আবিষ্কার নয়। কিন্তু মাত্র কুড়ি হাজার টাকার বিনিময়ে! এত কম দামে গাড়ি! এটা তো প্রমিতের নতুন আবিষ্কার।
প্রদর্শনীতে তাই প্রমিতের জয়-জয়কার। সবার নজর কেড়ে নেয় প্রমিত।

ব্যাকবেঞ্চার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র প্রমিত
পুরস্কৃত হল প্রমিত। ‘বছরের প্রযুক্তি বিস্ময়’ সম্মানে। সঙ্গে মেলে টাকাও। পুরস্কার হিসেবে। প্রদর্শনীর কর্তারা স্বীকৃতি দিলেন প্রমিতকে।
খবরটা ছড়িয়ে পড়ল অটো-মোবাইল দুনিয়ায়। ছুটে এসেছেন টাটা মোটরস, হুণ্ডাই কোম্পানির অফিসাররা। তাঁরা কিনতে চান প্রমিতের গাড়ির স্বত্ত্ব। এ তো চাট্টিখানি কথা নয়। এ যে বিস্ময় বালক! একে তো নামমাত্র দাম! তার ওপর ঘণ্টায় চল্লিশ কিলোমিটার গতি! তাছাড়া একবার ব্যাটারি চার্জ করলে একশো দশ কিলোমিটার দৌড়োবে গাড়ি!
বিপ্লববাবু ছেলের গর্বে গর্বিত। সবাইকে ডেকে বলেন, ‘আমি ভাবতেও পারিনি ছেলের মাথায় এত প্রযুক্তিবিদ্যা লুকিয়ে। তাই কুড়ি হাজার টাকা দিতে ইতস্তত করছিলাম। আমার টাকা আজ সার্থক হল।’
স্কুলের স্যাররা তো স্বপ্নেও ভাবেননি, যে ছাত্র কোনোদিন পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায়নি, সেকি না এ-রকম একটা আবিষ্কার করে বসবে! স্যাররা দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করেন প্রমিতকে।
প্রমিত এখানেই থেমে থাকতে চায় না। আরও কম দামে, অর্ধেক টাকায় সেএবার গাড়ি বানিয়ে ছাড়বে। এই তার স্বপ্ন।
লেখাপড়ায় মেধাবী না হয়েও যে আবিষ্কারক হওয়া যায়, তার প্রমাণ রাখল প্রমিত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন