অগ্নিকুমার আচার্য
মনোবল অটুট থাকলে অসাধ্যসাধন করা যায়।
পঙ্গুও গিরি লঙ্ঘন করতে পারে। একটা গিরি নয়। পর পর ছয়টি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়। তাও কৃত্রিম পা নিয়ে। কী অবিশ্বাস্য কথা, তাই না? কে এমন অসাধ্যসাধন করল!

অরুণিমা সিনহা
নাম তার অরুণিমা। অরুণিমা সিনহা। বাড়ি উত্তরপ্রদেশের আম্বেদকর নগরে। ১৯৮৮ সালের ২০ জুলাই তিনি জন্মেছিলেন।
ছোটো বেলা থেকেই খেলাধুলোর নেশা। জাতীয় মহিলা দলের ভলিবল প্লেয়ার ছিলেন অরুণিমা।
কিন্তু একটা ট্রেন দুঘর্টনায় তিনি বঁা পা-টি হারান।
যাচ্ছিলেন চাকরির পরীক্ষা দিতে। লক্ষ্মৌ থেকে দিল্লি। ট্রেনে একদল দুষ্কৃতি অরুণিমার সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। সাহসিনী অরুণিমা রুখে দাঁড়ায়।
ক্রুদ্ধ দুষ্কৃতিরা অরুণিমাকে ধাক্কা মেরে ট্রেন থেকে বাইরে ফেলে দেয়। বঁা পা ভেঙে খানখান। হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হল। বঁা পা-কে হাঁটুর নীচ থেকে কেটে বাদ দিতে হয়।
পঙ্গু হয়ে যান অরুণিমা। ভাগ্যের কী পরিহাস!
কিন্তু অরুণিমা ভেঙে পড়েন না। মনে তাঁর যথেষ্ট সাহস। পা নেই, কিন্তু মনোবল অটুট।
কৃত্রিম পা জুড়ে শুরু হল হাঁটাচলা। দৌড়ঝাঁপ।
শুরু হল অরুণিমার জীবনের নতুন অধ্যায়।
ভারতের প্রথম মহিলা এভারেস্ট শৃঙ্গ বিজয়িনী বাচেন্দ্রি পালের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। অরুণিমার অদম্য ইচ্ছা পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করা। হোক-না নকল পা! কিছুতেই হার মানতে চান না তিনি।

নকল পা নিয়ে ছয় মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়
শুরু হল অরুণিমার পাহাড়ে চড়ার প্রশিক্ষণ। নকল পা। অসুবিধা তো হবেই! কিন্তু মনে অদম্য সাহস থাকলে যেকোনো বাধা বিপত্তিকেই যে জয় করা যায় তার প্রমাণ রাখলেন অরুণিমা।
শপথ নেন— তাঁকে এভারেস্টের চুড়োয় উঠতেই হবে। চলল জোর প্রশিক্ষণ বাচেন্দ্রি পালের অধীনে।
অবশেষে এল সাফল্য।
২০১৩ সালের ২১ মে।
অরুণিমার অসাধারণ সাফল্য।
৮,৮৪৮ মিটার উঁচু এভারেস্টের চুড়োয় উঠে তাক লাগিয়ে দিলেন বিশ্বকে।
নকল পা নিয়ে সারা বিশ্বে প্রথম মহিলার এভারেস্ট জয়!
চারদিকে অরুণিমার জয় জয়কার। কৃত্রিম পা নিয়ে এমন কান্ড অরুণিমার আগে আর কেউ ঘটাতে পারেনি।
এই অসাধারণ কৃতিত্বের পুরস্কারও মিলল।
২০১৫ সালে অরুণিমাকে ভারত সরকার ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করলেন।
কিন্তু ‘পদ্মশ্রী’ পেয়ে অরুণিমার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। তিনি এখানেই থেমে থাকবেন না। মনে তাঁর জেদ বেড়ে গেল। ঠিক করলেন, বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশের সর্বোচ্চ চুড়ো জয় করবেন।
প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর উদ্যমে কী-না হয়!
নকল পা নিয়েই একে একে আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো; ইউরোপের এলব্রাস, অস্ট্রেলিয়ার কোসিউৎস্কো, দক্ষিণ আমেরিকার অ্যাকোনকাগুয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার কারস্টেনৎজ পিরামিড শৃঙ্গ জয় করেন।
কোনো বিশেষণ দিয়ে একজন প্রতিবন্ধী মেয়ের সাফল্যের পরিমাপ করা যায় না।
ছ-ছটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করে প্রতিবন্ধীদের সম্মুখে যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখলেন, তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।
এবার সম্মানের ডালি নিয়ে এগিয়ে এলেন ব্রিটেনের এক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়। গ্লাসগোর ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্রাট ক্লাইভ।
অরুণিমাকে সম্মানিত করলেন ‘সাম্মানিক ডক্টরেট’ ডিগ্রি তাঁর হাতে তুলে দিয়ে।
৩০ বছরের এক প্রতিবন্ধী তেজস্বিনী ও সাহসিনী মহিলার এই তুলনাহীন কৃতিত্বে সারা বিশ্ব চমৎকৃত, মুগ্ধ।
সম্মানিত হয়ে অরুণিমা বলেন, শারীরিক অথবা মানসিক যতই প্রতিবন্ধকতা আসুক-না কেন অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে, লক্ষ্য স্থির করে এগোলে জীবনে সাফল্য আসবেই।
ধন্য, ধন্য তুমি অরুণিমা! তোমার মনোবল আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে শতকোটি অভিবাদন!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন