অগ্নিকুমার আচার্য
ক্যান্সার!
নাম শুনলেই ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে শরীর। আর ক্যান্সার ধরা পড়লে তো মৃত্যুভয়ে জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।
অর্পণের শরীরেও ধরা পড়েছিল ব্লাড-ক্যান্সার। কিশোর অর্পণ। নবম শ্রেণিতে পড়ে। গরিব ঘরের ছেলে। বাবা চন্দ্রনাথ সর্দার একজন মালি। ছেলের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। মা-বাবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। টাকা কোথায়! রীতিমতো খাবারই জোটে না। কী করবেন, দু-চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পুত্র সন্তান যে! চিকিৎসা তো করাতে হবে। সামান্য জমিজিরেত যা ছিল বেচে দিলেন। দুয়ারে দুয়ারে হাত পাতেন বাবা-মা।
অর্পণ ভরতি হয় ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে। পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতাল। দশমাস ধরে চিকিৎসা চলল। বাবা-মার যা সম্বল ছিল তা নি:শেষ। এখন উপায়! আরও যে আটটা কেমোথেরাপি বাকি! বাবা-মা হতাশায় ভেঙে পড়েন। ছেলেকে বুঝি আর বঁাচানো গেল না।

অর্পণ সর্দার
ছোটোবেলা থেকেই অর্পণের স্বপ্ন ছিল, বড়ো হয়ে সেআর্ট কলেজে পড়বে। শিল্পী হবে। দাদু ছিল মৃৎশিল্পী। মূর্তি বানানোর কারিগর। দাদুর কাছেই মূর্তি বানানোর কাজে হাতেখড়ি অর্পণের।
বঁাচার বড়ো ইচ্ছা অর্পণের। হাসপাতালের বেডে শুয়ে চিন্তা করে কীভাবে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা যায়! ঠিক করে, মূর্তি বানাতে শুরু করবে।
ভরসা দিলেন হাসপাতালের আর্ট থেরাপিস্ট পাপড়ি সাহা। অর্পণের মূর্তি বানানোর ইচ্ছা জানতে পেরে তিনি রং-তুলি এনে দিলেন। আর, উৎসাহ জোগাতে থাকেন।
অর্পণ লেগে গেল মূর্তি গড়ার কাজে। মারণ রোগের অব্যক্ত যন্ত্রণা গেল ভুলে। একের পর এক মূর্তি বানিয়ে চলল সে। সঙ্গে চলল চিকিৎসা। আর্ট থেরাপিস্ট পাপড়ি ম্যাডাম অর্পণের কাজের তারিফ করেন। উৎসাহ দেন।
দুর্গাপুজোর মরশুম। অর্পণের গড়া ছোটো একটা দুর্গা প্রতিমা বিক্রি হল ছয় হাজার টাকায়।
আশার আলো ফুটে ওঠে অর্পণের চোখে। সেপারবে। ক্যান্সারের কথা ভুলে গেল। রোগ যন্ত্রণাকে আর আমল দেয় না। পাপড়ি দিদি আছে অর্পণের পাশে।
কিন্তু আটটি কেমোথেরাপি যে বাকি! এত টাকা কীভাবে জোগাড় হবে? পাপড়িদি বললেন, ‘তুমি ছবি আঁকো। আমি বিক্রির ব্যবস্থা করব। টাকার জোগাড় হয়ে যাবে।’
অর্পণ উৎসাহিত হয়। লেগে যায় ছবি আঁকার কাজে। নতুন সৃষ্টির আনন্দে ডুবে যায় সে। ভুলে থাকে রোগযন্ত্রণা।
ভগবান বুদ্ধের একটা ছবি আঁকে সে। অনবদ্য। দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। এমন চমৎকার হয়েছে ছবিটি। পাপড়ি দেবী ছবি দেখে খুব খুশি। তিনি ছবিটি বিক্রি করার জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন। শেষে ছবিটি বিক্রিও হয়ে গেল।
কত টাকায় জানো? চোখ কপালে উঠবে!
দু-লক্ষ টাকায়। বিশ্বাস হচ্ছে তো! ছবিটি কিনলেন দিল্লির একটি সংস্থা।
অর্পণের আনন্দ দেখে কে! আর, চিকিৎসা চালানোয় কোনো সমস্যা নেই।
কেমোথেরাপি শেষ হল। আর হাসপাতালের বেডে নয়। বাইরের জগৎটা এই ক-মাসে অচেনা হয়ে গিয়েছিল। বন্দিদশা এবার কাটল।
বাড়ি ফেরে অর্পণ। চোখের জলে বিদায় দেন পাপড়িদি। বলেন, ‘ভালো থেকো ভাই। ছবি আঁকা ছেড়ো না।’
পাপড়িদির কথা শুনে কান্না পায় অর্পণের। বলে, ‘দিদি, আপনার কথা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মনে রাখব।’
অর্পণ আবার স্কুলে ভরতি হয়। ২০১৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে। ছ-বছর মারণ রোগের সঙ্গে লড়াই করেছে সে। মনের জোর হারায়নি। তাকে বঁাচার দিশা দেখিয়েছেন ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালের ডা: সোমা দে, আর্ট থেরাপিস্ট পাপড়ি সাহা।
এবার সেআর্ট কলেজে ভরতি হওয়ার জন্য তৈরি। দুরন্ত ইচ্ছাশক্তি জীবনে সাফল্য এনে দেয়।
অর্পণ সেপ্রমাণ রাখল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন