দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য

অগ্নিকুমার আচার্য

যাঁরা সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন, চোখে যাঁরা দেখতে পান না, এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে কম নয়। তাঁদের মনে কত দুঃখ, কত মনোবেদনা!

কিন্তু দৃষ্টিহীনরাও যে কোনো অংশে চক্ষুষ্মান মানুষদের থেকে কম যান না, তা দেখিয়ে দিলেন এক দৃষ্টিহীন মেয়ে আইএএস পাশ করে।

এও কি সম্ভব! আইএএস পরীক্ষা তো সর্বভারতীয় পরীক্ষা! যথেষ্ট কঠিন। এই পরীক্ষায় যাঁরা পাশ করেন, তাঁরা সরকারের সর্বোচ্চ পদে নিযুক্ত হন।

এরকম একটা উঁচুমানের পরীক্ষায় পাশ করলেন এক দৃষ্টিহীন! এ যেন স্বপ্নের মতো লাগছে! কে সে? নাম কী তাঁর? কোথাকার মেয়ে?

নাম তাঁর ‘প্রাঞ্জল পাতিল’। মহারাষ্ট্রের উল্লাস গাঁওয়ের মেয়ে। ভারতের ইতিহাসে প্রথম দৃষ্টিহীন আইএএস।

দৃষ্টিহীন হয়ে আইএএস? কী অসম্ভব মনে হয়, না?

হ্যাঁ। এই অসম্ভবকেই সম্ভব করলেন প্রাঞ্জল।

কীভাবে?

প্রাঞ্জল পাতিল

ছোটোবেলায় অন্ধ হেলেন কেলারের অবিস্মরণীয় সংগ্রামের কথা শুনেছিলেন প্রাঞ্জল। সেই থেকেই প্রাঞ্জলের স্বপ্ন দেখা শুরু। হেলেন কেলার যদি পেরে থাকেন, তবে আমি পারব না কেন? শুরু হল প্রাঞ্জলের লড়াই। তাকে অনেক বড়ো হতে হবে।

দৃষ্টিহীনদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে গেছেন হেলেন কেলার। অন্ধ প্রাঞ্জলও সেই পথ ধরে শুরু করে দিলেন পড়াশুনো। তাঁকে আইএএস হতে হবে। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রাঞ্জল।

প্রথমবার বসলেন ইউপিএসসির পরীক্ষায়। ইউপিএসসি অর্থাৎ ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন— আইএএস, আইপিএস ইত্যাদি পদের জন্য পরীক্ষা নিয়ে যে কমিশন প্রার্থী নির্বাচন করে। প্রথমবার প্রাঞ্জল পরীক্ষায় সফল হলেন বটে, কিন্তু আইএএস পেলেন না, পেলেন— আইআরএএস অর্থাৎ ভারতীয় রেলওয়ের উচ্চ প্রশাসনিক পদ।

কিন্তু দুর্ভাগ্য প্রাঞ্জলের। রেলওয়েতে তিনি যোগদান করতে পারলেন না। কেন? কারণ তিনি ১০০ শতাংশ দৃষ্টিহীন।

জেদ চেপে গেল প্রাঞ্জলের। আবার পরীক্ষা দেবেন। আইএএস তাঁর চাই। আবার শুরু হল জোরদার সাধনা। ‘মন্ত্রের সাধন, কিংবা শরীর পাতন’।

দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় এল তাঁর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। কুড়ি বছর ধরে প্রাঞ্জল যে স্বপ্ন দেখে আসছিলেন তা বাস্তবে পরিণত হল। অধরা এল তাঁর হাতের মুঠোয়।

ভারতের প্রথম দৃষ্টিহীন মহিলা আইএএস। মেধা তালিকায় প্রাঞ্জলের ক্রমিক সংখ্যা ছিল ১২৪। কয়েক লক্ষ পরীক্ষার্থীর মধ্যে এক অসাধারণ সাফল্য।

যোগ দিলেন আইএএস বা ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে অ্যাসিস্ট্যান্ট কালেক্টরের পদে। কেরলের এর্নাকুলাম জেলায়।

সারাদেশে ধন্য ধন্য পড়ে গেল।

তাঁর জীবনের ইতিহাসটা একটু জানতে ইচ্ছে করে বইকী!

জন্মের সময় ক্ষীণ দৃষ্টি ছিল প্রাঞ্জলের। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ক্ষীণদৃষ্টিও অন্ধকারের গর্ভে তলিয়ে যেতে থাকে। ছয় বছর বয়সে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারায় সে। বাবা-মা মেয়েকে বহু বিখ্যাত চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। ওষুধ পথ্য, অপারেশন কোনো কিছুই বাদ গেল না। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। দৃষ্টিশক্তি একবিন্দুও ফিরে পেলেন না প্রাঞ্জল।

কিন্তু দমবার মেয়ে নন প্রাঞ্জল। ভরতি হলেন— ‘কমলা মেহতা দাদার’ স্কুলে। মারাঠি ভাষার দৃষ্টিহীনদের বিদ্যালয়। ভালো নম্বর পেয়ে দশম শ্রেণি পাশ করেন। তারপর ভরতি হন দৃষ্টিহীনদের কলেজ ‘সেন্ট জেভিয়ার্স’-এ। সেখান থেকে একে একে দ্বাদশ শ্রেণি, তারপর অনার্স-সহ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভালোভাবে পাশ করে ভরতি হয়ে গেলেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ বিষয়ে রেকর্ড নম্বর নিয়ে এমএ পাশ। এখানেই থেমে না-থেকে এমফিল ও পিএইচডি দুটো ডিগ্রিই ঝুলিতে ভরে নিলেন। কী বিস্ময়কর তপস্যা!

তারপর ইতিহাস গড়লেন আইএএস পাশ করে।

১০০ শতাংশ দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জলের এই জীবনসংগ্রাম অবশ্যই শারীরিক প্রতিবন্ধী দিব্যাঙ্গদের অনুপ্রাণিত করবে।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%