অগ্নিকুমার আচার্য
— পুলিশ কাকু! পুলিশ কাকু!
ডাক শুনে চমকে ওঠেন থানার দারোগাবাবু। রাত তখন প্রায় বারোটা। এমন সময় এক কিশোরী থানায়!
দারোগাবাবু— কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ?
কিশোরী বলে— আমার নাম পুষ্পাকুমারী। বাড়ি বঁাধকুঠি গ্রামে।
— বঁাধকুঠি! সেতো অনেক দূর। প্রায় চার কিলোমিটার। এত রাতে? সঙ্গে কেউ নেই? দারোগা জিজ্ঞেস করে।
পুষ্পাকুমারী বলে— সঙ্গে কেউ নেই পুলিশকাকু! আমি একাই এসেছি।
দারোগা— একা এসেছ! কেন, কী হয়েছে?
পুষ্পাকুমারী বলে— আমার বড়ো বিপদ!
দারোগা— বিপদ! কী বিপদ!
পুষ্পাকুমারী— আমার বাবা আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে চান! আমার কোনো কথা তিনি কানে নিচ্ছেন না। উলটে আমাকে ধমকাচ্ছেন!

পুষ্পা কুমারী
দারোগা— তোমার বয়স কত?
পুষ্পা— ১৫।
দারোগা— তুমি পড়াশুনো করো?
— হ্যাঁ কাকু। আমি ক্লাস টেন-এ পড়ি।
দারোগা— কোন স্কুলে পড়ো?
পুষ্পা— রানিগঞ্জের জে কে হাই স্কুলে। আমি পড়তে চাই কাকু। আমার তো বিয়ের বয়েস হয়নি এখনও। আমি তো নাবালিকা। আঠারো বছর না-হলে তো মেয়েদের বিয়ে বেআইনি।
দারোগা আশ্চর্য হন। তিনি বলেন, তুমি তো সবই জানো দেখছি। মেয়েদের আঠারো বছর না-হলে বিয়ে দেওয়া যায় না, একথা তুমি তোমার বাবাকে বলোনি কেন?
—বলেছি। কিন্তু বাবা আমার কথা পাত্তাই দেন না। উলটে আমাকে বলেন, ওসব আইনটাইন রেখে দে। আমি পাত্র ঠিক করে ফেলেছি। তোর কোনো ‘না’ আমি শুনব না— সোজাসাপটা বলে দিলুম! তাই আমি আপনার কাছে ছুটে এসেছি— পুষ্পা কাতরকন্ঠে বলে।
দারোগা— তা এত রাতে! একা—
পুষ্পা— কী করব কাকু! বাবা তো আমাকে চোখে চোখে রাখেন, দিনের বেলা বাড়ি থেকে বেরোবার জো নেই। তাই বাড়ির সবাই যখন ঘুমে অচেতন, তখন চুপি চুপি হেঁটে চলে এসেছি। এখন আপনি একটা ব্যবস্থা করুন কাকু! আমি এখন কিছুতেই বিয়ে করব না!
— বা:! সাবাস! তুমি কোনো চিন্তা করো না মা। তুমি তো এখনও নাবালিকা। তোমার এখন বিয়ে তো বেআইনি। আমি এখনই যাব তোমাদের বাড়িতে। তোমার বাবার নামটি যেন কী?
— বলদেব স্বর্ণকার। মেয়েটি বলে।
দারোগা বলেন, ‘তুমি যাও, আমিও তোমার পিছু পিছু আসছি।’
মেয়েটি দারোগাবাবুর এই সহানুভূতি দেখে অবাক হয়। সেবলে, এই রাতেই আপনি যাবেন?
— দেখো পুষ্পা, আমরা পুলিশ। আমাদের কাছে কি-বা দিন কি-বা রাত! সব সমান। তা ছাড়া, তুমি সাহস করে এই রাতে নালিশ জানাতে এসেছ! আর আমরা যেতে পারব না! যাও, তুমি এগোও— আমরা আসছি— কোনো চিন্তা করো না। এর একটা বিহিত করবই— দারোগাবাবু পুষ্পাকে আশ্বস্ত করে।
পুষ্পাকুমারী দারোগাবাবুকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাড়ির পথ ধরে। বাড়িতে পৌঁছে সেশুয়ে পড়ে তার ঘরে। কিন্তু চোখে তার ঘুম নেই!
কিছুক্ষণ পরেই বাড়ির উঠোনে দারোগাবাবুর হাঁকডাক শোনা গেল।
— বলদেববাবু বাড়ি আছেন? বলদেববাবু— দারোগাবাবু হাঁকেন।
ধড়মড়িয়ে ঘুম থেকে ওঠেন বলদেব। এত রাতে কে ডাকছে!
আলো জ্বেলে, দোর খুলে দারোগাকে দেখে বলদেব চমকে ওঠেন। ভয়ে বুক ঢিপ ঢিপ করছে।
— আসুন স্যার, আসুন— আসুন— বসুন! আমি চেয়ার নিয়ে আসি, কাঁচুমাচু হয়ে বলে বলদেব।
— না, না, এত ব্যস্ত হবেন না। আমি বসতে আসিনি। আমি জানতে পারলাম আপনি নাকি আপনার নাবালিকা কন্যার বিয়ে দিচ্ছেন? আপনি কি জানেন না, আঠারো বছরের আগে কোনো মেয়ের বিয়ে দেওয়া বেআইনি! আপনাকে তো মশাই আমরা অ্যারেস্ট করব! দারোগা দৃঢ়কন্ঠে বলেন।
বলদেব তো ভয়ে তটস্থ। আমতা আমতা করে বলেন, ‘না স্যার, কে বললে আমি মেয়ের বিয়ে দিচ্ছি! মেয়ে দুষ্টুমি করছিল, তাই ওকে ভয় দেখানোর জন্যে বলেছিলাম তোর বিয়ে দিয়ে দেব। না স্যার, আমি আমার নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দেব না।’
— হ্যাঁ, এই বেআইনি কাজ কখনো করবেন না, তাহলে কিন্তু বিপদ হবে। আপনাকে অ্যারেস্ট করে কোর্টে চালান দেব— মনে থাকে যেন। দারোগা কড়াভাবে বলে দেন।
— না স্যার, এই আমি তিন সত্যি করছি। এখনই মেয়ের বিয়ে দেব না। মেয়ে আমার পড়তে চায়। বলদেবের কথা শেষ হল না। দারোগা বলেন, ‘কথাটা মনে থাকে যেন। চলি—’
— মনে থাকবে স্যার। অবশ্যই মনে থাকবে। জোড়হাতে দারোগাবাবুকে নমস্কার জানায় বলদেব।
দারোগা চলে গেলেন।
পরদিন খবরটা পৌঁছে যায় এলাকার বিডিও-র কাছে। খবর চলে যায় আসানসোলের চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির সদস্য নরেন্দ্রকুমার গড়াইয়ের কাছে।
রানিগঞ্জের বিডিও প্রশান্তকুমার মাহাতো খবরটি পেয়ে ছুটে আসেন পুষ্পাকুমারীর বাড়িতে। তিনি পুষ্পার বাবাকে স্পষ্ট বলে দিলেন, নাবালিকা কন্যার বিয়ে দেওয়া যাবে না। একই কথা এসে বলেন গেলেন নরেন্দ্রকুমার মাহাতো।
পুষ্পাকুমারীর বিয়ে বন্ধ হল। সেযারপরনাই খুশি। সেযথারীতি স্কুলে যেতে লাগল। বাবা আর পুষ্পার বিয়ে নিয়ে টুঁ শব্দটি করেন না।
সব শুনে স্কুলের সহপাঠীরা, মাস্টারমশাইরা পুষ্পার ধন্যি ধন্যি করতে লাগল।
এভাবে নাবালিকারা যদি সাহস করে বিয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তবে ধীরে ধীরে দেশ থেকে নাবালিকাদের বিয়ে বন্ধ হবে।
পুষ্পাকুমারী সব নাবালিকার কাছে এক প্রেরণা, এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন