অগ্নিকুমার আচার্য
কী-ই বা বয়েস ছাত্রটির!
ক্লাস থ্রি-র ছাত্র।
একদিন সেপথ দুঘর্টনার শিকার হয়। ভেঙে যায় ওর ঊরুর নীচের হাড়টি। যার নাম ফিমার। বাবা-মা নিয়ে যান হাসপাতালে। টানা তিন মাস বিছানায় বন্দি বাচ্চা ছেলেটি।
ছেলেটির নাম ভীর আগরওয়াল। হ্যাঁ, বীর-কে হিন্দি বলয়ে ‘ভীর’ বলে উচ্চারণ করা হয়।
ডাক্তারবাবুরা বললেন, সুস্থ হবে ভীর। কিন্তু চিরকালের জন্যে ফিমার বাদ যাবে শরীর থেকে। ওই হাড়ের স্থানে জুড়ে দেওয়া হবে একটি স্টিলের পাত।
মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে।
স্টিলের পাত লেগে গেল ফিমারের জায়গায়। সারাজীবন বিকলাঙ্গ হয়েই থাকতে হবে ভীরকে।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পায় ভীর।

ভীর আগরওয়াল
ধীরে ধীরে প্রতিবন্ধী ভীর বড়ো হতে থাকে। সেজানতে পারে আমাদের দেশে তারই মতো কত ছেলেমেয়ে আছে যারা হাত-পায়ের হাড় ভাঙে। কিন্তু গরিব বলে একটি স্ক্রাচ কেনার সামর্থ্যও নেই। তাই লাঠিই ওদের একমাত্র সম্বল।
ভীর এখন নবম শ্রেণির ছাত্র।
মুম্বাই-এর আমেরিকান স্কুলে পড়ে। স্কুলের পথে যেতে আসতে পথে দেখতে পায় বিকলাঙ্গ ছেলেমেয়েদের। বড়ো কষ্ট হয় ওর। পয়সার অভাবে কৃত্রিম অঙ্গ লাগাতে পারে না শরীরে!
ভীর ভাবে, যদি ওইসব বিকলাঙ্গদের জন্যে কৃত্রিম অঙ্গের ব্যবস্থা করতে পারতাম, তাহলে বেচারাদের অনেক কষ্টের লাঘব হত।
ভীর ওর সহপাঠী আয়ুষ্মান, সঞ্জীবদের তার স্বপ্নের ইচ্ছাটা জানাল।
খুব ভালো প্রস্তাব।
বন্ধুরা মিলে ঠিক করলে ভীরের ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। সকলে মিলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে দান সংগ্রহ করতে লাগল। ছাত্ররাও দেড়-শো দু-শো করে টাকা দিল।
তহবিল মোটামুটি ভালোই হল। হাজার বারো টাকা জমল।
কিন্তু কৃত্রিম অঙ্গের দাম যে অনেক বেশি! ‘জয়পুর ফুট’ নামক যে কৃত্রিম অঙ্গ লাগে, তার একটার দামই তো পাঁচ হাজার টাকা? এ টাকায় যে তিনজন বিকলাঙ্গকেও সাহায্য করা যাবে না।
তাহলে উপায়?
তিন-চার বন্ধুতে মিলে নানা উপায় খুঁজতে থাকে।
আয়ুষ্মানের নিকটআত্মীয়রা থাকেন আমেরিকায়। আয়ুষ্মান তাদের সমস্যার কথা জানায় ওই আত্মীয়দের। আয়ুষ্মানকে ওঁরা জানান, নেট খুঁজলে এমন সব সংস্থার খবর পাবে, যাঁরা বিকলাঙ্গদের জন্যে মুক্তহস্তে প্রচুর টাকা দান করেন।
ভীর নেটে খুঁজে পেল—‘ওয়াক ফর ফ্রি’ নামে একটি বিশেষ সাইট।
আর যায় কোথা?
ভীর তাদের স্বপ্নের কথা, তাদের ইচ্ছার কথা, সাইটের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়।
প্রচুর সাড়া মেলে দেশ-বিদেশ থেকে।
এক মাসের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ টাকা জোগাড় হয়ে গেল।
ভীরদের মনে আনন্দ আর ধরে না। এবার অনেককে সাহায্য করা যাবে। কিন্তু কীভাবে বিতরণ করা হবে এই টাকা!
ভীরের বাবা-মা যোগাযোগ করেন মুম্বাইয়ের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে। সংস্থাটি আগ্রহ ভরে এগিয়ে এল।
ভীর বাবা-মার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে ওদের গ্রামের বাড়ি ‘বিশোদ’-এ একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে, কৃত্রিম অঙ্গ, হুইল চেয়ার ইত্যাদি।
দরখাস্ত আহ্বান করা হল।
প্রায় চার-শো-র মতো আবেদন পত্র জমা পড়ল।
ভীর করল কী, তার নিজের সেভিংস অ্যাকাউন্টে জমানো ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকাও তহবিলে জমা করে দিলে।
প্রায় সাড়ে তিন-শো প্রতিবন্ধীকে দান করা হল কৃত্রিম হাত-পা, জুতো, হুইল চেয়ার ইত্যাদি।
কৃত্রিম অঙ্গ পেয়ে কী-যে খুশি প্রতিবন্ধীরা! তাঁরা দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন ভীরকে।
আজ ভীর-এর মতো সুখী আর কে আছে! নিজের কষ্ট থেকেই ভীর অন্যের কষ্ট লাঘব করার মন্ত্র খুঁজে পেল।
স্কুলের মাস্টারমশাইরা ভীর-এর এই অসামান্য প্রয়াস দেখে খুব খুশি। তাঁরাও প্রত্যেকে এক মাসের বেতন ভীর-এর তহবিলে দান করেন।
ভীর উৎসাহ পায়। ক্রমশ এগিয়ে চলে তার লক্ষ্যে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন