বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই

অগ্নিকুমার আচার্য

লতা। গরিব ঘরের মেয়ে। অনেক কষ্টে পড়াশুনো করে এইট পাশ করেছিল। আর পড়া এগোয়নি। গরিব বাপ। পড়ার খরচ চালাতে পারেন না। বোঝা হয়ে দাঁড়ায় মেয়ে। তাই নাবালিকা লতাকে পাত্রস্থ করেন বাবা।

শ্বশুরবাড়িও গরিব। দু-বেলা দু-মুঠো জোটে না লতার। স্বামী ফুচকার হকারি করে। লতাও স্বামীর কাজে সাহায্য করে। কিন্তু দিন আর চলে না। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। এর মধ্যে একটা বাচ্চা হল লতার। কিন্তু উপযুক্ত খাদ্য ও পুষ্টির অভাবে বাচ্চাটাও বিদায় নিল।

ভেঙে পড়ে না লতা। বঁাচার পথ খুঁজে চলে লতা। আরেকটি ছেলে এসেছে কোলে। আদরের ধন। এ ছেলেকে মরতে দেওয়া যাবে না।

লতা

এক বড়োলোকের বাড়িতে আয়ার কাজ নেয় লতা। ক-টা টাকাই বা পায়! এ টাকায় তো খিদে মেটে না। কী করবে লতা? ভেবেই চলে।

শেষে একদিন আয়ার কাজ ছেড়ে দেয়। ভুজিয়া বানাতে লেগে যায়। নিজের হাতে ভুজিয়া বানায় আর দোরে দোরে ঘুরে ভুজিয়া বেচে। গরিব ভুজিয়াওয়ালিকে দেখে কারও কারও দয়া হয়। বিক্রিবাটা ভালোই হতে থাকে।

দুটো পয়সার চোখ দেখে লতা। উৎসাহ বাড়ে। বেশি করে ভুজিয়া বানায়। প্যাকেট বানায়। প্যাকেট-করা ভুজিয়া পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করে। ইস্কুলের গেটে বসে পড়ে ভুজিয়ার প্যাকেট নিয়ে। ভালোই বিক্রি হয়। দিশা খুঁজে পায় লতা।

কেটে যায় বছর পাঁচেক। ভুজিয়ার ব্যাবসা ছড়িয়ে পড়ে হাটে-বাজারে। দোকানে দোকানে।

লতার ভাগ্যাকাশে সুখের সূর্যের উদয় হল। এখন ছেলেটা ভালো-মন্দ খেতে পায়। শ্বশুরবাড়ির অনটন গেল কেটে।

১৯৯৯ সাল। ভুজিয়াওয়ালি লতাকে দেখে গ্রামের গরিব ছ-জন মহিলা এগিয়ে আসে। তারাও চায় ভুজিয়া বানাতে, ভুজিয়া বেচতে। লতা বলে,—‘চলো, একসঙ্গে মিলেমিশে বেশি বেশি করে ভুজিয়া বানাই। ক-বছরে বুঝে গেছি ভুজিয়ার বাজার ভালো।’

‘দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ।’ সাতজনের সমবায় সমিতি। নেত্রী লতা। রুপোলি রঙের প্যাকেট। নানা মাপের। ভেতরে মুচমুচে ভুজিয়া। ব্যাবসা ছড়িয়ে পড়ল আশেপাশের গ্রামেগঞ্জের হাটে দশ-বারো কিলোমিটার পথ পেরিয়ে। আর খুচরো বিক্রি নয়। মা লক্ষ্মী মুখ তুলে চেয়েছেন। লতাদের চোখ এবার পাইকারি ব্যাবসায়। ভুজিয়ার সুখ্যাতি মুখেমুখে। দারুণ চাহিদা। মশলাদার, স্বাদে গন্ধে যে অতুলনীয় লতাদের ভুজিয়া!

কিন্তু পাইকারি ব্যাবসায় যে প্রচুর টাকা লাগে। লতারা মিলে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারবাবুর কাছে ঋণের জন্যে হাত পাতে। লতা বলে, ‘আমরা মহিলারা স্ব-নির্ভর গোষ্ঠী গড়েছি। আমরা ভুজিয়ার পাইকারি ব্যাবসা করতে চাই। আপনি ঋণ দিন। আমাদের সাহায্য করুন।’

ম্যানেজারবাবু সব শুনে, মহিলাদের উৎসাহ দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। দশ হাজার টাকা ঋণ মঞ্জুর করলেন। এক বছরের মধ্যে ঋণ শোধ করতে হবে। সুদসমেত।

কুছ পরোয়া নেই। লতারা সকলে মিলে জমিয়েছিলেন ষাট হাজার। মোট সত্তর হাজার টাকার পুঁজি হাতে। কেনা হল খান দশেক চুলা, বড়ো সাইজের কড়াই, খুন্তি আর বাকি টাকায় তেল, বেসন ইত্যাদি। ব্যাবসা বেড়েই চলেছে। সঙ্গে মুনাফাও বাড়ছে।

মহারাষ্ট্রের অজ পাড়া গাঁ— সবঙ্গা। এই গাঁয়ের বছর চল্লিশের লতা আজ আয়া থেকে নামডাকি ভুজিয়ার পাইকারি ব্যাবসায়ী। মহিলাদের স্ব-নির্ভর গোষ্ঠীর নেত্রী। একদিনের সাত জনের সমবায় সমিতিতে আজ মহিলাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশ হাজার। আর মোট ব্যাঙ্ক ঋণের পরিমাণ কুড়ি লক্ষ টাকা।

বর্তমানে মুম্বাইয়ের চাঁদনি চকের মতো বিশাল পাইকারি বাজারে নানা স্বাদের রকমারি ভুজিয়া, নিমকি রোজ সরবরাহ হচ্ছে সবঙ্গা গ্রাম থেকে। পরিমাণও চোখ কপালে ওঠার মতো। প্রতিদিন এক টন।

আজ লতার কাছে বড়ো বড়ো সব পাইকারি ব্যাবসায়ীরা ছুটে আসে। লতা এখন বড়ো সুখী। ছেলেটা স্কুলে পড়ছে। পরিবারের মুখে হাসি আর ধরে না।

সত্যি, সমাজের কাছে লতা আজ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লতা দেখিয়ে দিল—পরিশ্রমই সৌভাগ্যের আসল চাবিকাঠি। চেষ্টা আর আত্মবিশ্বাস থাকলে মানুষ অসাধ্যও সাধন করতে পারে।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%