অগ্নিকুমার আচার্য
আমরা মুখে বলি, লেখাপড়ার কোনো বয়েস নেই। কিন্তু কাজে দেখা যায়, অনেক ছাত্র-ছাত্রীই স্কুল-কলেজে পড়ার মাঝপথে পড়াশুনো ছেড়ে দেয়। তারপর নানা কাজে ঢুকে পড়ে। আর বই হাতে নিয়ে দেখে না।
এদের বলা হয় ড্রপ আউট ছাত্র। আমাদের দেশে প্রাইমারি স্কুলেই ড্রপ আউটের সংখ্যাটা বেশি।
এই ড্রপ আউটদের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে এসেছেন এক ৯৭ বছরের অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি। যে বয়সে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মানুষ, সেই ৯৭ বছরের বৃদ্ধ এমএ পাশ করে সারা বিশ্বকে চমকে দিলেন।
৯৭ বছরে এমএ পাশ! এও কী সম্ভব?

রাজকুমার বৈশ্য
মানুষের কাছে অসম্ভব কিছু নয়, এটা প্রমাণ করে দেখালেন রাজকুমার বৈশ্য। বাড়ি আমাদেরই দেশে। উত্তরপ্রদেশের বরেলিতে। প্রমাণ করে দিলেন, লেখাপড়ার কোনো বয়স নেই।
৯৭ কেন! আশি হলেই তো মানুষ ভাবেন, যমদূত আসছেন তাকে নিতে। মন দুর্বল হয়ে যায়। নানা রোগ এসে জাপটে ধরে। বিছানায় শুয়ে কোঁ কোঁ করেন।
কিন্তু রাজকুমারবাবু, নানা ব্যায়াম, যোগা ও দেহচর্চা করে শরীরটাকে ফিট রেখেছেন। এটাও বৃদ্ধদের কাছে এক উদ্দীপনাময় দৃষ্টান্ত।
শরীরটা ফিট রেখেছেন বলেই ৯৭ বছরে বইখাতা খুলে বসেছেন। বহুকাল আগে বিএ করেছেন, এবার সাধ জেগেছে পৃথিবী ছেড়ে যাবার আগে মাস্টার ডিগ্রিটা করে যাবেনই। ব্যাস, লেগে গেলেন পড়াশুনোয়। ১৯৩৮ সালে বিএ পাশ করেছিলেন, আজ ৮০ বছর পর আবার বইখাতা নিয়ে শুধু লেগে পড়লেন তা নয়, তুড়ি মেরে, পাশও করে ফেললেন। পড়ার বিষয়টাও মোটেই সহজ ছিল না। অর্থনীতি। নালন্দা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় বসেছিলেন রাজকুমারবাবু।
রাজকুমারবাবুর তিন ছেলে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এক পুত্রবধূও অবসরপ্রাপ্ত। তিনি ছিলেন পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপিকা ভারতী এস কুমার। বলা যায়, এই পুত্রবধূই ছিলেন শ্বশুরমশাই-এর প্রেরণা ও উৎসাহদাত্রী। পাশ করার পর বৃদ্ধ বলেন, ‘আমার পুত্রবধূ সারাক্ষণ মাস্টারমশাই-এর মতো আমার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সন্ধ্যায় টিভিতে যেসব প্রিয় সিরিয়াল দেখতাম, সেগুলি বন্ধ করে দিয়েছেন। পড়াশুনোয় যাতে কোনো ব্যাঘাত না-ঘটে, সে-ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ ছিলেন পুত্রবধূ। তাই আমার এই সাফল্যের পশ্চাতে তাঁর অবদান অনেকখানি।’
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতৃপক্ষও অবাক বনে গেছেন এই অতি বৃদ্ধের উদ্যম ও আগ্রহ দেখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এইচ পি সিনহা দারুণ খুশি। তিনি বলেন, ‘যেদিন এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক পরীক্ষার ফর্ম নিতে আসেন, তখনই আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম। তাই, পরীক্ষা পাশের পর, আমরা নিজেরা মার্কশিট নিয়ে ছুটে যাই তাঁর বাড়িতে। অধ্যবসায় ও নিষ্ঠাকে সম্মান জানাতে।’
নাতি-নাতনিরাও দাদুর এই অভাবনীয় কান্ড দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত। অনেক মিষ্টি আর উপহারে ভরিয়ে দিলেন দাদুকে। বাড়িতে এক উৎসব লেগে গেল।
আর পুত্রবধূ একরাশ হাসি ছড়িয়ে বলেন, ‘আমার শ্বশুরমশাই এখন সমাজের ড্রপ আউট ছাত্রদের কাছে, এবং যারা দু-একটা পাশ করেই লেখাপড়ার যবনিকাপাত করে, সকলের কাছে এক অবিস্মরণীয় রোল মডেল হয়ে উঠেছেন।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন