সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়

অগ্নিকুমার আচার্য

বিশাল উপাধ্যায়।

ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। বাড়ি গুজরাটের সুরাটে।

দরিদ্র পরিবার। বাবা একটা দোকানের দারোয়ান। মা সেলাইয়ের কাজ করে কিছু রোজগার করেন। দাদারও একটা প্রাইভেট ফার্মে অল্প মাইনের চাকরি।

বিশালের শখ ক্রিকেট খেলায়। বন্ধুদের সঙ্গে প্রায়ই ক্রিকেট খেলতে যায় সুরাটের মাহিদপুরার ডায়মণ্ড স্ট্রিটের লাগোয়া একটা মাঠে।

সেদিনটা ছিল স্বাধীনতা দিবসের ছুটি।

বিশাল গেল ক্রিকেট খেলতে। খেলার সময় ক্রিকেট বলটা চলে গিয়েছিল একটু দূরে রাস্তার পাশে গাড়ি পার্কিং লটে। বিশাল ছুটে গেল বলটা আনতে। বলটা কুড়োতে গিয়ে চোখে পড়ে একটা প্যাকেট।

প্যাকেট! কী আছে ওতে! নিশ্চয়ই কেউ ফেলে গেছে। কাছেই দাঁড় করানো একটা বাইক।

বিশাল চট করে প্যাকেটটা নিজের পকেটে ভরে নেয়। তারপর যথারীতি বলটা কুড়িয়ে নিয়ে খেলতে লেগে যায়। বন্ধুদের কাউকে প্যাকেট সম্বন্ধে টুঁ-শব্দটি করল না।

প্যাকেট ভরা দামি হিরে

মন তার উসখুস করছে। কখন খেলাশেষে বাড়ি গিয়ে প্যাকেটে কী আছে দেখবে।

খেলা শেষ। বাড়ির পথ ধরল বিশাল।

বাড়ি এসে কাউকে কিচ্ছুটি বলল না। কেউ যাতে না-দেখে আড়ালে গিয়ে চুপিচুপি প্যাকেটটা খুলল।

ঝলমল ঝলমল করছে যে! কী ওগুলি! হাতে নেয়। বিশালের চক্ষুদু-টি ছানাবড়া! এযে হিরে! প্যাকেট ভরা দামি হিরে সব! এ যে সাতরাজার ধন! এই ধনের মালিক এখন সে! বিশালের মাথা খারাপ হয়ে গেল। কী করবে এই মহা মূল্যবান বস্তু নিয়ে!

না:, এ যে পরের জিনিস! এ রেখে দেওয়া পাপ! হিরেগুলি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে যে করেই হোক।

রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসে না। এপাশ-ওপাশ করে বিশাল। কখন সকাল হবে। কখন ছুটে যাবে হিরের মালিকের খোঁজে। বাড়ির কাউকে কিছুই জানতে দিল না সে। কার মনে কী আছে কে বলবে।

পরের দিন সকালে চলে এল বিশাল সেই জায়গায়— যেখানে কুড়িয়ে পেয়েছিল প্যাকেটটা। নিশ্চয়ই হিরের মালিক ছুটে আসবে হন্তদন্ত হয়ে। খুঁজতে আসবে তার হারানো ধন।

বিশাল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল প্যাকেটটা নিয়ে। কিন্তু কই! কেউ আসছে না যে! তাহলে কী করা! ভাবতে ভাবতে বাড়ি চলে আসে বিশাল।

পরদিন আবার আসে। তার বিশ্বাস, হিরের মালিক নিশ্চয়ই আসবে। কিন্তু না, সেদিনও মালিক এল না! বিশাল ভেবে পায় না কী করবে! স্থির করে, সেরোজ সময় করে আসবে এখানে।

তৃতীয় দিন।

বিশাল এসে দাঁড়িয়েছে অকুস্থলে।

কিছুক্ষণ পর, একটা লোক এসে দাঁড়ায় প্রায় বিশালের কাছে। এদিক-ওদিক তাকায়। খুঁজছেন তিনি হারানো ধন। তারপর হতাশ হয়ে কাউকে মোবাইলে বলেন, ‘না হে, প্যাকেটটা পেলাম না। খোঁজাখুঁজি তো করলাম! কী সব্বোনাশ যে হয়ে গেল!’ হায় হায় করতে করতে ভদ্রলোক হাঁটতে লাগলেন।

বিশালও ভদ্রলোকের পিছু নিল। তারপর সোজা ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

— আপনি কি কিছু হারিয়েছেন? কিছু খুঁজছিলেন যেন? বিশাল জিজ্ঞেস করে।

— আর বোলো না বাবা, আমার সব্বোনাশ হয়ে গেছে। একটা প্যাকেটে অনেকগুলি হিরে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কোথায় যে পড়ে গেছে! আমি দু-চোখে অন্ধকার দেখছি! ভদ্রলোক হতাশার সুরে বললেন।

— আপনি চিন্তা করবেন না। প্যাকেটটা আমি পেয়েছি। আমার কাছে আছে। পকেট থেকে বার করে প্যাকেটটা ভদ্রলোকের হাতে তুলে দেয় বিশাল।

ভদ্রলোক যেন হাতে আশমান পেলেন। আনন্দে অধীর। বুকে জড়িয়ে ধরলেন বিশালকে। ‘তুমি আমায় বঁাচালে বাবা। নইলে আমার ঘরবাড়ি বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হত, তোমার সততা দেখে আমি অভিভূত। তোমার ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না বাবা! আজকের দিনেও এমন সৎ ছেলে আছে? সত্যি অবিশ্বাস্য! ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।’

ভদ্রলোকের নাম মনসুখ সাভালিয়াই। ডায়মণ্ড স্ট্রিটের হিরে ব্যাবসায়ী। তিনি বিশালের এই সততা দেখে এতই মুগ্ধ হলেন যে, তিনি খুশি হয়ে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে বিশালকে পুরস্কৃত করলেন। অন্যান্য হিরে ব্যাবসায়ীরাও সকলে মিলে তাকে সাড়ে এগারো হাজার টাকা দিলেন।

অবিশ্বাস্য লোভ সংবরণের পুরস্কার।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%