অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়

অগ্নিকুমার আচার্য

বড়ো সাংঘাতিক রোগ।

‘হিমোফিলিয়া’। সাধারণত এই কঠিন রোগ থেকে মুক্তি মেলে না। এটি দুরারোগ্য ব্যাধি। কী হয় এই রোগে?

এই রোগের প্রধান লক্ষণ শরীর থেকে যখন-তখন রক্তক্ষরণ। কারণ, রক্তক্ষরণ আটকানোর জন্য যে উপাদানগুলি শরীরে তৈরি হওয়া প্রয়োজন, তা শরীরে তৈরি হয় না। ফলে শরীরে কোনো আঘাত না লাগলেও যেকোনো সময় রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এই রোগে অস্থিসন্ধিগুলি দুর্বল হয়ে থাকে। যখন-তখন রক্তক্ষরণ হয়। দেহের যেকোনো স্থান থেকে রক্ত ঝরতে পারে। যদি মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, তবে রোগীকে বঁাচানো মুশকিল।

এ তো দেখছি ভয়ংকর রোগ! এই রোগের কি কোনো চিকিৎসা নেই? ‘প্রোফাইল্যাক্সিস’ নামক ইঞ্জেকশন দিলে সাময়িক রক্ত বন্ধ হয় বটে কিন্তু রোগ থেকে মুক্তি ঘটে না। তবে ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের পেশিগুলিকে যদি যথেষ্ট শক্তিশালী করে তোলা যায়, তাহলে দুর্বল অস্থিসন্ধিগুলিও সবল হয়, তাতে রক্তপাত ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে।

অভিজিৎ সরকার

কিন্তু, এই দুরন্ত রোগকেও বশ মানিয়েছেন এক ব্যক্তি। কে তিনি? কীভাবেই-বা বাগে আনলেন এই মারণ ব্যাধিকে?

তাঁর নাম অভিজিৎ সরকার। বাড়ি কলকাতার বিডন স্ট্রিটে। জন্মের পর, যখন অভিজিতের হাঁটি-হাঁটি পা-পা, মাত্র হামাগুড়ি দিতে শিখেছেন, তখনই ধরা পড়ে এই রোগ। শুরু হয় রক্তক্ষরণ। দুটো হাঁটু ও কনুই থেকে রক্তক্ষরণের ফলে, হাঁটু কনুই হয়ে পড়ে অকেজো। বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া তাঁর আর দাঁড়াবার শক্তিও নেই।

বাবা-মা ছেলেকে নিয়ে ডাক্তারদের কাছে ছুটোছুটি করেন। কিছুদিন ওষুধপত্তর ইঞ্জেকশনের সাহায্যে একটু ভালো হয়, তারপর আবার যে-কে সেই।

তবুও মা-বাবা ছেলেকে ভরতি করান স্কুলে। ভয়ংকর অসুস্থ শরীর নিয়েও অভিজিৎ দশম শ্রেণি পর্যন্ত ওঠে।

কিন্তু বিপত্তি ঘটে মাধ্যমিক পরীক্ষার সময়; মস্তিষ্কে শুরু হয় রক্তক্ষরণ। অজ্ঞান হয়ে কোমায় চলে যান অভিজিৎ। হাসপাতালে যমে-মানুষে টানাটানি চলে। কপাল ভালো আট-ন-দিন পর জ্ঞান ফেরে। অনেক কষ্টে ডাক্তারবাবুরা রক্ত বন্ধ করেন।

ডাক্তারবাবুরা সাফ বলে দেন, এই ছেলের কোনোরকম মানসিক চাপ নেওয়া চলবে না।

বিছানা ছেড়ে ওঠার কোনো ক্ষমতা নেই অভিজিতের। তাই চলেছে বিশেষ ধরনের থেরাপি। ডাক্তারবাবু বললেন, অভিজিতের অস্থিসন্ধি ও পেশিগুলি খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। তাই এখন একমাত্র উপায় ব্যায়াম বা শরীরচর্চা। তাহলে ধীরে ধীরে অস্থিসন্ধি ও পেশিগুলি সবল হবে। রক্তক্ষরণও বন্ধ হবে।

কিশোর অভিজিৎ দাঁতে দাঁত চেপে শুরু করলেন ব্যায়াম। রোগকে দমন করতেই হবে। শরীরকে সুগঠিত করাই হল তাঁর একমাত্র সাধনা।

বডি বিল্ডিং-এর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন অভিজিৎ। ধীরে ধীরে সাধনায় সিদ্ধি পেতে লাগলেন তিনি। অস্থিসন্ধি আর দেহের পেশিগুলি ক্রমে শক্তিশালী হতে লাগল। ঠিক যেন এক ব্যায়ামবীর!

প্রশিক্ষকেরা দারুণ খুশি— অভিজিতের সাফল্যে তাঁরা অভিজিৎকে বডি বিল্ডার-এর প্রতিযোগিতায় পাঠাতে থাকেন।

মনের জেদ বাড়ে অভিজিতের। রাত-দিন এক করে চলছে তাঁর শরীরচর্চা।

অবশেষে ২০১৪ সালে অভিজিৎ যোগ দেয় ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায়। ২৪টি রাজ্য থেকে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে কয়েক-শো প্রতিবন্ধী বডিবিল্ডার। সবাইকে অবাক করে দিয়ে হিমোফিলিয়া রোগী অভিজিত চতুর্থ স্থান অধিকার করে।

এখন প্রতিযোগিতায় যোগদান করার নেশায় পেয়েছে অভিজিৎকে। ইতিমধ্যে পঁচিশটি প্রতিযোগিতায় যোগদান করে ট্রফি আর সার্টিফিকেটে ঘর ভরিয়ে দিয়েছে।

এবার অভিজিতের লক্ষ্য জাতীয় স্তরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যোগদান করা।

রোগ আর টিকতে পারেনি। অভিজিতের দেহ ছেড়ে পালিয়েছে।

অসম্ভব মনের জোর আর জেদ অভিজিৎকে মারণ রোগের হাত থেকে মুক্তি দিল।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%