আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব

অগ্নিকুমার আচার্য

ঘরে কন্যাসন্তান এসেছে।

মা জন্ম দিয়েছেন শিশুকন্যা।

বাবা রঞ্জিত নায়েক। মা নেহা। মহারাষ্ট্রের শিবাজীনগরের বাসিন্দা। মেয়ের ফুটফুটে মুখ দেখে, বাবা-মার খুশি দেখে কে! ঘরে যে লক্ষ্মী এসেছে! বাবা-মার চোখের মণি।

সেদিনটা ছিল ২০১৭ সালের ১৮ আগস্ট।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে রঞ্জিত এবং নেহা

প্রথম সন্তান। আদরযত্নের সীমা নেই। শশীকলার মতো বাড়তে লাগল আনন্দ-দুলালী।

ক্রমে ক্রমে দেড় বছর হতে চলেছে মেয়ের।

নামকরণ উৎসবের তোড়জোড় চলছে। যেদিন দেড় বছর পূর্ণ হবে সেদিন ঘটা করে অনুষ্ঠিত হবে কন্যার নামকরণ উৎসব। এটাই মহারাষ্ট্রের রেওয়াজ।

বাবা-মা দু-জনে মিলে ভাবেন, খুব স্মরণীয় করতে হবে অনুষ্ঠান! একমাত্র কন্যাসন্তান বলে কথা!

শেষে একটা দারুণ সিদ্ধান্ত নিলেন। অভূতপূর্ব। চমকপ্রদ। তাক লাগানো। কী সেই সিদ্ধান্ত?

বৃক্ষরোপণ। ১০১টি গাছ লাগানো হবে নামকরণ উৎসবে। সঙ্গে থাকবে ভূরিভোজ, অতিথি আপ্যায়ন।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিল। ১০১টা চারাগাছ রোপণ। অনেকখানি জায়গা দরকার যে! এত স্থান তো বাড়িতে নেই! মা-বাবার চোখে ঘুম নেই! ১০১টা চারা যে লাগাতেই হবে! এখন উপায়? প্ল্যানটা কি মাঠেমারা যাবে?

শেষে এগিয়ে এলেন এক অন্তরঙ্গ বন্ধু।

বন্ধু বললেন, ‘রঞ্জিত ভেবো না। তোমাদের আশা অপূর্ণ থাকবে না।’

রঞ্জিত-নেহা যেন হাতে আশমান পেলেন।

বন্ধু বললেন, ‘এখান থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে মালশিয়াস গ্রামে আমার সাড়ে তিন একর ফাঁকা জমি আছে। একটা পুকুরও আছে।’

বাবা বলেন, হোক ৬০ কিলোমিটার! ওখানেই হবে বৃক্ষরোপণ। হবে নামকরণ উৎসব। আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন বাবা-মা। বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কৃতজ্ঞতার যে ভাষা নেই।

বন্ধু বললেন, ‘জায়গাটা ভুলেশ্বর মন্দিরের লাগোয়া। তাই উৎসবও হবে খুব জমজমাট।’

নির্দিষ্ট দিনে ১০১টা নানা জাতের চারা গাছ নিয়ে রওনা দিলেন বাবা-মা। সঙ্গে আদরের দেড় বছরের কন্যাসন্তান।

মালশিয়াস গ্রাম হঠাৎ যেন জেগে উঠল। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সেএক এলাহি কান্ড!

বাবা রঞ্জিত প্রথম একটা নিমগাছ পুঁতলেন। সঙ্গে সঙ্গে সাড়ম্বরে নামকরণ হল কন্যার। বাবা-মার পছন্দের নাম ‘আলিশা’।

শুরু হয়ে গেল বৃক্ষরোপণ উৎসব। মহা ধুমধাম! আত্মীয়স্বজন, অতিথি অভ্যাগত সকলে হাত লাগালেন। ফাঁকা জায়গা ভরে গেল— আম, জাম, কলা, সবেদা, তেঁতুল, বঁাশ ইত্যাদির চারায়।

এখানেই শেষ নয়। মন্দিরের কাছে ছিল একটা প্রাইমারি স্কুল। রঞ্জিত-নেহা এই শুভদিনে স্কুলকে দান করলেন ৫১টি চারা। সেখানেও পালিত হল বৃক্ষরোপণ উৎসব। তারপর অতিথি আপ্যায়ন। ছোট্ট আলিশার নামকরণ উৎসব বলে কথা! চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় কিছুরই খামতি ছিল না। উপস্থিত সবাই তৃপ্ত! প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন আলিশাকে।

উৎসব শেষে বাবা-মার মনে নতুন ভাবনা এসে হাজির। শুধু চারাগাছ পুঁতলেই তো কাজ শেষ হল না। গাছগুলিকে বঁাচাতে হবে। গোরু-ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। যথাযথ পরিচর্যা করতে হবে। তবেই তো সার্থক হবে আলিশার নাম।

বাবা-মা সব ব্যবস্থা করে ফেললেন। বঁাশের কঞ্চি আর তারের জালি মিলে তৈরি হল গোল গোল বেড়া। গাছগুলিকে করা হল সুরক্ষিত।

কিন্তু পরিচর্যা!

রঞ্জিত-নেহা ঠিক করলেন সপ্তাহে দু-তিনদিন চলে আসবেন ছোটো ছোটো গাছগুলির কাছে। জল দেবেন, সার দেবেন। ছায়ার ব্যবস্থা করবেন। আলিশার নাম যে জড়িয়ে আছে চারা গাছগুলির সঙ্গে।

গাঁয়ের লোকজন তো অবাক! একে কন্যাসন্তান, তার ওপর নামকরণের এই অভিনব উৎসব!

সাবাস রঞ্জিতবাবু, সাবাস নেহা!

সবাই ধন্যি ধন্যি করতে লাগল।

সবার চোখ খুলে গেল।

কন্যাসন্তানকে আর হেলাফেলা নয়।

রাজ্যের পরিবেশ দপ্তরের প্রদীপ কুমারের কানে খবরটি পৌঁছোল। তিনি মহাখুশি। পরিবেশ সুরক্ষার এমন উদ্যোগকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন।

সার্থক আলিশা! সার্থক তোমার কন্যাজন্ম!

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%