অগ্নিকুমার আচার্য
সবুজ যোদ্ধা? এ আবার কী? তাহলে শোনো—
‘গাছ আমাদের প্রাণ। গাছ লাগান। সবুজ বঁাচান।’
পরিবেশ দিবস পালনের দিন এই স্লোগানে পথঘাট মুখরিত হয়ে ওঠে। তারপর? ক-জনে আর মনে রাখেন প্রত্যেকের উচিত জীবনভর গাছ লাগানো। তবেই পরিবেশ বঁাচবে। পৃথিবীটা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! গাছ লাগানোর সময় কোথায়? মনেও পড়ে না গাছ লাগানোর কথা।
কিন্তু ব্যতিক্রম এক বাসের কণ্ডাক্টর। তামিলনাড়ু রাজ্য পরিবহণ সংস্থার এক কর্মী। হোমরা-চোমরা কেউ নন। চেন্নাইয়ের এক গাঁয়ের মানুষ। নাম— যোগানাথন।
কী করেছেন তিনি?

যোগানাথন
শুনলে, চোখ কপালে উঠবে। তিনি একটা একটা করে ৩৮ হাজার গাছ লাগিয়েছেন গত ২৮ বছরে নিজে একা। মনে হচ্ছে বুঝি বানানো গল্প। মোটেও নয়। যোগানাথন এই অসম্ভব কাজটিই সম্ভব করেছেন। সবুজকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসার তাগিদে।
তাই সিবিএসসি. বোর্ড যোগানাথনকে ‘সবুজ যোদ্ধা’ হিসাবে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে স্থান করে দিয়েছে। তাঁর এই প্রয়াসকে তুলে ধরা হয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে।
সত্যি, এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন যোগানাথন। কোথা থেকে পেলেন তিনি এই প্রেরণা? না, কেউ এই প্রেরণা জোগায়নি। সবুজের প্রতি আকর্ষণ ছোটোবেলা থেকেই। তিনি কবি না-হয়েও প্রকৃতি প্রেমিক।
দ্বাদশ শ্রেণি পাশের পর যোগানাথনের পড়াশুনোয় ইতি। চাকরি নেন সেলস রিপ্রেজেনটেটিভের। নীলগিরি পাহাড়ের কাছ দিয়ে তাঁর যাওয়া-আসা। পাহাড়ের শ্যামল সবুজ রূপ তাঁর মন কেড়ে নিত। চোখ জুড়িয়ে যেত।
একদিন যোগানাথন দেখলেন কি, চোরা কারবারিরা নীলগিরির সবুজ গাছগুলি কেটে পাচার করে দিচ্ছে। সবুজকে নষ্ট হতে দেখে, তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না। প্রতিবাদ করলেন। রুখে দাঁড়ালেন। কিন্তু ওই দস্যুরা তাঁকে প্রাণে মারার হুমকি দিলেন। সেদিনই তাঁর জেদ চেপেছিল। প্রকৃতির সবুজ সৌন্দর্যকে রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন সেদিনই। আর সেদিন থেকে শুরু তাঁর বৃক্ষরোপণ। যা আজও থেমে থাকেনি।
পরবর্তীকালে তামিলনাড়ু পরিবহণ সংস্থায় চাকরি পেয়ে যোগানাথন চলে আসেন কোয়েম্বাত্তুরে। বাসের কণ্ডাক্টরের কাজ। কিন্তু, তাঁর আসল কাজ অর্থাৎ গাছ লাগানোর কাজ থেমে থাকেনি। এ কাজেই তাঁর আনন্দ। এ কাজই তাঁর জীবনের ব্রত।
ক্রমে ক্রমে যোগানাথনের এই সবুজ প্রেমের কথা সারারাজ্যে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই এক ডাকে চেনে এই সবুজ যোদ্ধাকে। ছাত্র-ছাত্রীরা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে জানে তাঁর নাম। তামিলনাড়ু সরকারের সবুজ বঁাচাও আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ যোগানাথন। এখন স্কুল-কলেজে তাঁর ডাক পড়ে। ডাক পড়ে এনএসএস-এর শিবিরে। সবুজ বনায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি সবাইকে সচেতন করেন।
পরিবেশ রক্ষায় এই ‘সবুজ যোদ্ধা’ যে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে— এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন