অগ্নিকুমার আচার্য
সত্যি এক বিস্ময়কর ঘটনা। এক আশ্চর্য আবিষ্কার ভারতীয় ছাত্রের। এবং তার স্বীকৃতি স্বরূপ নাসার ‘মুন অ্যাওয়ার্ড’। সম্মানের পুরো নাম— ‘নাসা এমেস স্পেস সেটেলমেন্ট মুন অ্যাওয়ার্ড’।
২০১৬-১৭ সালে এই বিরল সম্মান প্রথমবার ভারতে হাজির এক দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রর হাত ধরে। কে সে?
এই কৃতি ছাত্রের নাম— সাই কিরণ প্রসাদ। চেন্নাই-এর ছেলে। মাত্র সতেরো পেরিয়ে আঠারোয় পা রেখেছে। এইটুকুন ছেলে চাঁদে পৌঁছোবার যে পথ বাতলেছে তাতে নাসার তাবড়ো তাবড়ো বিজ্ঞানীরা শুধু বিস্মিত নন, উচ্ছ্বসিত! তাই এই আন্তর্জাতিক সম্মানের মুকুট মাথায় উঠল কিরণ প্রসাদের।
ঘটনাটা খুলেই বলা যাক।
২০১৩ সাল থেকে আমেরিকার বিখ্যাত মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র অর্থাৎ ‘নাসা’ চন্দ্রাভিযান বিষয়ে এক গবেষণামূলক প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার চালু করে। খুদে ছাত্র-ছাত্রীদের চাঁদে পাড়ি জমানো নিয়ে কীরূপ বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা মাথায় আসে তাই প্রতিযোগিতার মূল বিষয়। তবে প্রতিযোগিতা কেবল দ্বাদশ মানের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আগের তিন বছর আমেরিকা, চীন ও গ্রেট ব্রিটেনের ছাত্রেরা জিতে নিয়েছে এ পুরস্কার।

সাই কিরণ প্রসাদ
সবাইকে অবাক করে চতুর্থবার এ পুরস্কার দখল করে নিল ‘সাই কিরণ প্রসাদ’। কী ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়? জানতে খুব ইচ্ছে করছে তাই না? বলছি শোনো—
সাই কিরণ প্রসাদ এমন একটা বিশাল লিফট এর পরিকল্পনা করেছে— যার মাধ্যমে চাঁদ থেকে পৃথিবীতে সহজেই যাওয়া যায়! এও কি সম্ভব? পৃথিবীর মহাকর্ষের আকর্ষণকে কীভাবে অতিক্রম করবে? সাই জানায়, পৃথিবী থেকে চাঁদে নয়, লিফট বসাতে হবে চাঁদ থেকে পৃথিবীতে। বিজ্ঞানীরা তাকে প্রশ্ন করেছেন, পৃথিবী থেকে চাঁদে নয় কেন? ছাত্রের উত্তর— পৃথিবীতে লিফট বসালে ভূকম্পনে তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু চাঁদে নেমে সেখানে গর্ত করে লিফট বা এলিভেটর তৈরি করলে ভূকম্পনে ক্ষতির আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে।
বিজ্ঞানীরা খুশি। পরের প্রশ্ন, লিফটের মাধ্যমে পৃথিবীর সঙ্গে চাঁদের এরূপ যোগাযোগের আনুমানিক খরচ কত পড়বে? পদার্থবিদ্যা ও গণিত নিয়ে পড়া ছাত্র সাই হিসাবকিতাব করে জবাব দেয়, প্রতি কেজি ভর বহনে খরচ হবে মাত্র ১০ মার্কিন ডলার।
বলে কী সাই? যেখানে রকেটে প্রতি কেজি ভর বহনে খরচ পড়ে এক হাজার মার্কিন ডলার, সেখানে এত কম অর্থব্যয়ে চাঁদে পাড়ি?
তাক লেগে গেল নাসার বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদের। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হল সাই কিরণ প্রসাদ।
সারা বিশ্বের মোট প্রতিযোগীর সংখ্যা শুনলে তো তোমাদের চোখ কপালে উঠবে। মোট প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৩ হাজার। এই বিশাল সংখ্যক সহপাঠীদের পেছনে ফেলে প্রথম স্থানটি ছিনিয়ে নিল ভারতের ছাত্র সাই কিরণ প্রসাদ।
ধন্য কিরণ! জীবন তোমার ধন্য!
‘আয়, আয়, চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা’— শৈশব থেকেই সাইয়ের চাঁদের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। ছোটোবেলা যখন শিশু সাই কান্না জুড়ত, তখন, মা শিবানীপ্রসাদ শিশুর কান্না থামানোর জন্য চাঁদের ছড়া বলতেন, চাঁদের নানা রূপকথা শোনাতেন। শিশু সাইয়ের কান্না যেত থেমে। তারপরই মাকে নানা প্রশ্ন— চাঁদে কীভাবে যাওয়া যায়? চাঁদ নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, মা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। ছেলেকে একথা-সেকথা বলে কোনোমতে শান্ত করেন।
সেদিনের সেই শিশুর মনে শৈশব থেকেই চাঁদকে নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল। যার সুফল ফলল দ্বাদশ শ্রেণিতে এসে।
সাই পড়ে চেন্নাইয়ের ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। স্কুলের মাস্টারমশাইরা সবসময় সাইকে উৎসাহ দেন, সহায়তা করেন। নাসার বিজ্ঞানীদের কাছে সাইয়ের এই আবিষ্কার অবাস্তব মনে হয়নি। তাই জয়ের মালা পরিয়ে দিলেন কিরণ প্রসাদের গলায়।
মাস্টারমশাইরা বেজায় খুশি, গর্বিত ছাত্রটির অবিস্মরণীয় মেধার জন্য। বাবা মুরতি সত্যপ্রসাদ ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। মা-র আনন্দের সীমা নেই।
ভারতবাসী হিসেবে আমরা সবাই কিরণ প্রসাদের অভাবনীয় সাফল্যে গর্বিত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন