অগ্নিকুমার আচার্য
অসম সাহসী মেয়েটি।
নাম তার সুস্মিতা। সুস্মিতা পাল। স্কুলের ছাত্রী।
অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে। পশ্চিমবঙ্গের বাগনান থানার আন্টিলা গাঁয়ে থাকে সুস্মিতা। বাবা সঞ্জয় পাল। মৃৎশিল্পী। ঘরে অভাব-অনটন লেগেই আছে। মাটির কাজ করে দু-বেলা দু-মুঠো ভাতের জোগাড় করা বড়ো কষ্টকর। তবু সুস্মিতা পড়া বন্ধ করে না।
একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুস্মিতা। চন্দ্রভাগ শ্রীকৃষ্ণ উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে পড়ে।
সরকার থেকে প্রচার করা হয়— বাল্যবিবাহের কুফল। ১৮ বছরের আগে মেয়েদের কিছুতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসা উচিত নয়। বেআইনিও বটে। সমাজকল্যাণ দপ্তরের বড়ো বড়ো হোর্ডিং সুস্মিতার নজরে পড়ে। সেমনে মনে শপথ নেয়— বাল্যবিবাহ রুখবে।

সুস্মিতা পাল
সুস্মিতা লেগে পড়ে কাজে। যখনই খবর পায় নাবালিকার বিয়ে হচ্ছে— আর কথা নেই। ছুটে যায় ওই নাবালিকার বাড়িতে। বাবা-মাকে বোঝায়। যে নাবালিকার বিয়ে হবে তাকে বোঝায়। অনেক তর্কাতর্কি। কিন্তু সুস্মিতা নাছোড়বান্দা। বিয়ে ভাঙিয়ে তবে ছেড়েছে। কখনো সেহাজির হয়ে গেছে বিয়ের আসরে। সঙ্গে থানা থেকে নিয়ে গেছে পুলিশ। বিয়ে বন্ধ করে ঘরে ফিরেছে।
ধনুর্ভাঙা পণ সুস্মিতার। তার এলাকায় নাবালিকা বিয়ে হতে দেবে না।
এভাবে পাঁচ-পাঁচটি নাবালিকার বিয়ে বাতিল করে ছেড়েছে সুস্মিতা।
বাবা সঞ্জয় পালও চেয়েছিলেন সুস্মিতাকে পাত্রস্থ করতে। কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে বাবাও হার মানেন।
সুস্মিতার নাম ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের গাঁয়ে। সবাই জেনে গেল বিয়ে-ভাঙানিয়া সুস্মিতার নাম।
শুরু হল বিপত্তি। হুমকি আর শাসানির মুখে পড়ল সুস্মিতা। গাঁ-গঞ্জের মানুষ মেয়ের বয়স ১৪/১৫ হলেই পাত্রস্থ করতে উঠে পড়ে লাগে। তাই সুস্মিতা পড়ল সমাজের রোষানলে।
নাবালিকার বিয়ে ভাঙানি চলবে না। আশপাশ এলাকা থেকে ক্রমাগত হুমকি। ‘সুস্মিতা, বন্ধ করো তোমার এই খেলা। নইলে জীবন বিপন্ন হবে।’
হোক জীবন বিপন্ন। সুস্মিতা তার লক্ষ্য থেকে কিছুতেই হটবে না। সেএকদিন ছুটে যায় এলাকার বিডিও প্রণবকুমার মন্ডলের কাছে। সব কথা খুলে বলে সে। পাঁচ-পাঁচটি বিয়ে ভেঙে দিয়ে এখন তার জীবন যে বিপন্ন— সবই শোনেন বিডিও সাহেব।
বিডিও প্রশংসা করেন সুস্মিতার। তাকে বলেন, ‘কোনো চিন্তা কোরো না। আমরা আছি তোমার পাশে। ভয় করো না। সৎ কাজে শতেক বাধা আসবেই। মাথা উঁচু করে নিজের কাজ করে যাও।’
সুস্মিতা সাহস পায়। ভরসা পায়। মনে পড়ে কবিতা— ‘বেরিয়ে যখন পড়েছি ভাই, থামলে তো আর চলবে না।’
সুস্মিতা আবার শপথ নেয়— কোনো হুমকির কাছে মাথা নত করবে না। সেআবার দ্বিগুণ উৎসাহে কাজে লেগে পড়ে। ছুটে যায়, যখনই কানে আসে কোথাও বাল্যবিবাহের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মেয়ের বাবা-মাকে বোঝায় কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হলে কী কী শারীরিক সমস্যা হতে পারে। শুধু তাই নয়, বাল্যবিবাহে নাবালিকা বধূর সাংসারিক জীবনও সুখের হয় না।
এলাকার বিধায়ক অরুণাভ সেন এসে দাঁড়ান সুস্মিতার পাশে। তার লড়াইকে কুর্নিশ জানান। সুস্মিতার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যত উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নেন মাননীয় বিধায়ক।
সুস্মিতার পাশে এসে দাঁড়ায় সহপাঠীরা।
সুস্মিতা আজ একটা আন্দোলনের নাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন