অগ্নিকুমার আচার্য
লে উপত্যকা।
এই দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম— তুরতুক।
ভারতের সীমানার শেষ প্রান্তের পাহাড়ি গ্রাম। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত গ্রামটি ছিল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। পরে ভারতীয় সেনানী তুরতুক-সহ চারটি পাক অধিকৃত গ্রাম দখল করে নেয়। তখন থেকেই ‘তুরতুক’ ভারতের একটি দুর্গম গ্রাম।
এই গ্রামেরই এক মুসলিম মহিলা। রহিমা বেগম।
তুরতুক শুধু দুর্গম নয়, গ্রামের মানুষজন সবাই ছিলেন শিক্ষাদীক্ষাহীন। রহিমা বেগম ৪৭ বছর ধরে লড়াই চালিয়েছেন গ্রামটিতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে। রহিমার এই লড়াই ছিল বহু বঁাধাবিপত্তিপূর্ণ, এক কঠিন সংগ্রাম।
রহিমা ছিলেন পাক অধিকৃত ‘তুরতুকে’র অধিবাসী। মাত্র ১৪ বছর বয়সে গ্রামেরই এক ছেলে শের আলির সঙ্গে রহিমার বিয়ে হয়। পাক সেনাবাহিনীতে জওয়ান হিসেবে যোগ দেন শের আলি।

রহিমা বেগম
বিয়ের পর থেকেই রহিমা কোমর কষে নেমে পড়লেন তুরতুকের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালতে।
মুসলিম মেয়েদের লেখাপড়া?
সমাজের চক্ষে গুরুতর অপরাধ! কিন্তু সমাজের রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা করেন না রহিমা। লেগে যান তুরতুকের ছেলেমেয়েদের পড়ানোর কাজে। বাড়ি বাড়ি ঘোরেন রহিমা। ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়িতে গিয়ে তাদের পড়াতে শুরু করেন।
বিয়ের পর দু-বছর পাকিস্তানের মাটিতেই রহিমার শিক্ষা প্রসারের জন্যে সংগ্রাম চলে।
হঠাৎ একদিন রহিমা দেখেন তাঁর গ্রাম তুরতুক ভারতের সেনারা দখল করে নিয়েছে। রহিমার স্বামী পাকিস্তানে চলে যেতে প্রস্তুত। কিন্তু রহিমা যে পণ করেছেন, তুরতুকের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে তুলবেন। তিনি ভারত ছেড়ে যেতে চাইলেন না। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল স্বামী-স্ত্রীর।
শুরু হল রহিমার জীবনের নতুন অধ্যায়। তুরতুক ছেড়ে তিনি পাকিস্তানে গেলেন না।
এ অস্থিরতার সময় রহিমার কোলে এসেছে তাঁর কন্যা আলিসা। ছোট্ট আলিসাকে কোলে নিয়েই রহিমা গোটা গ্রামকে শিক্ষিত করার কাজে নতুন উদ্যমে নেমে পড়লেন। রহিমা ছিলেন তুরতুকের একমাত্র শিক্ষিতা। উর্দু ভাষায় স্নাতক।
গ্রামে একটি স্কুল ছিল, কিন্তু কেউ পড়তে যেত না।
তার উপর গ্রামে চলছিল সেনাবাহিনীর ভারী বুটের আওয়াজ, গোলাগুলির কান ফাটানো আওয়াজ, বন্দুক কামান নিয়ে সেনাদের ছুটোছুটি। এই ভয়ংকর দিনে রহিমাকে ফেলে চলে গেলেন স্বামী।
কিন্তু রহিমা দমবার পাত্রী নন।
নিজের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে স্কুলমুখী করলেন গ্রামের ছেলেমেয়েদের।
লে উপত্যকার হাড়হিম করা ঠাণ্ডা, বরফের পাহাড় পেরিয়ে শুধু নিজ গ্রাম নয়, আশেপাশের গ্রামেও রহিমা শিক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন।
তুরতুক থেকে ২০৫ কিলোমিটার দূরে লে। সেখান থেকে শ্রীনগর কলেজে পাঠাতে লাগলেন ছেলেমেয়েদের।
বর্তমানে রহিমার বয়েস ৬৩। কিন্তু রহিমা বেগম থেমে নেই। দূরদূরান্তে চড়াই-উতরাই পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে শিক্ষার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এ লড়াইয়ের শেষ নেই রহিমার।
আজ গোটা তুরতুক গ্রাম শিক্ষার আলোয় ঝলমল করছে। একজনও অশিক্ষিত নেই এই গ্রামে।
রহিমা বেগম আজ শুধু তুরতুক নয়, আশেপাশের গ্রামগুলিতেও শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে তুরতুকের ছেলেমেয়েরা আজ শ্রীনগরের কলেজেও পড়াশুনা করছে।
রহিমা বেগম আজ অন্ধকারে এক উজ্জ্বল আলোর জ্যোতি।
যেন এক রূপকথার কাহিনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন