ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু

অগ্নিকুমার আচার্য

ভূত!

ওরে বাপরে! নাম শুনলেই পিলে চমকে ওঠে, রাম নাম জপ শুরু হয়! সেই যে সিনেমার একটা গানে আছে—

‘‘ভূত আমার পুত, পেতনি আমার ঝি

রামলক্ষণ সঙ্গে আছে করবে আমায় কী!’’

কিন্তু সত্যি কী ভূত আছে? অনেকেই বলবেন, হ্যাঁ আছে। বিশেষ করে গাঁ-গঞ্জের মানুষ। আদিবাসী মানুষ। কে নয়?

আজকে একুশ শতকে পৌঁছেও ভূতের ভয় আর গেল না মানুষের মন থেকে। ভূত-পেতনি-ডাইনি মানুষের দেহে নাকি ভর করে। বিশেষ করে স্ত্রীলোকের ওপর। তখন ওঝার ডাক পড়ে। ওঝা ঝাড়ফুঁক করে, নৃশংস অত্যাচার চালায় ভূতে পাওয়া মানুষের ওপর। কাজের কাজ কিছুই হয় না। ওঝা ট্যাঁকে টাকা গুঁজে চলে যায়। তবুও মানুষের মন থেকে ভূত আর যায় না।

কিন্তু ভূত থাকে কোথায়?

রামা নায়ডু

সবাই একবাক্যে বলে দেবে, আর কোথায়! শ্মশানে-মশানে। চালতা গাছে, শ্যাওড়া গাছে। নানা জায়গায়। তবে শ্মশানই হল ভূতদের স্থায়ী বাসস্থান। এমনি সব অদ্ভুত বিশ্বাস। কিন্তু ভূত বলতে যে কিছু নেই, তা সম্প্রতি প্রমাণ করে দিলেন একজন। তিনি কে? কীভাবে প্রমাণ করলেন?

তাহলে শোনো সত্যিটা।

ঘটনা অন্ধ্রপ্রদেশের পালাকোলে কেন্দ্রের একটা শ্মশানের। শ্মশানটা ভেঙেচুরে গেছে। ওটা সুন্দর করে গড়তে হবে। রাজ্য সরকার মঞ্জুর করলেন তিন কোটি টাকা।

কথায় আছে, টাকায় কি না হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কথাটা ভুল প্রমাণিত হল। শ্মশান বলে কথা! ওখানে কে যাবে কাজ করতে! টাকার জন্যে কাজে গিয়ে ভূতের খপ্পরে কে পড়বে! শেষে বেঘোরে প্রাণটা যাবে। কোনো শ্রমিক মজুর একদম রাজি নয়।

মহা মুশকিল তো! তাহলে শ্মশানের সংস্কার হবে না? পালাকোলের বিধায়ক নিম্মলা রামা নায়ডু। তিনি অনেক করে বোঝালেন নির্মাণ শ্রমিকদের। বললেন, ‘তোমরা অহেতুক ভয় পাচ্ছ! বিশ্বাস করো ভূত বলে কিছু নেই।’

কিন্তু কথায় কি আর ভূত পালায়! কেউ কাজ করতে রাজি হল না।

নিম্মলা নায়ডু ভাবতে লাগলেন, কীভাবে ভূতের ভয় দূর করা যায়! ভূত যে নেই এ কথা তো কেউ বিশ্বাস করে না। তার ওপর শ্মশান! পৈতৃক প্রাণটা যাক আর কী! শেষে একটা জুতসই বুদ্ধি বার করলেন বিধায়ক। ঘোষণা করে দিলেন, তিনি ঘোর অন্ধকার রাতে শ্মশানটিতে সারা রাত একা কাটাবেন, ওখানেই খাবেন, শোবেন।

বলেন কী? ওঁর কি মরবার শখ হয়েছে! শ্মশানে একা রাত কাটাবেন? ওঁর মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেছে! গাঁয়ের সবাই বলাবলি করতে লাগল।

কিন্তু বিধায়ক অটল। তিনি শ্মশানে রাত কাটিয়ে প্রমাণ করে ছাড়বেন, ভূত বলে কিছু নেই।

একদিন ঘনঘোর অন্ধকার রাত। বিধায়ক করলেন কী, টিফিন কৌটোয় রাতের খাবার ভরে নিলেন। সঙ্গে নিলেন একটা বিছানার চাদর আর একটা বালিশ। তারপর সটান এসে উপস্থিত ওই শ্মশানে। অবশ্য একটা কম্বলও এনেছেন। মশার হাত থেকে বঁাচতে।

শ্মশানে যেখানে মড়া পোড়ানো হয়, ঠিক তার লাগোয়া চাদরটা পেতে নিলেন। এত অন্ধকার যে হাত মেললে হাত দেখা যায় না। তাতে কী যায় আসে! আরাম করে বসলেন চাদরের ওপরে। তারপর টিফিন কৌটো খুলে সঙ্গে আনা খাবার খেতে লাগলেন। খাওয়া সাঙ্গ হলে একটু বিশ্রাম। তারপর কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে সটান শুয়ে পড়লেন।

শেয়াল-পেঁচাদের, রাত পাখিদের আর ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম বিকট বিচিত্র শব্দ। কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই বিধায়কের।

দিব্যি শুয়ে রয়েছেন। নাক ডাকছে। গাঢ় ঘুম।

যখন ঘুম ভাঙল, তখন পুব আকাশে সূয্যিমামা আলো ছড়াচ্ছেন। বিছানা গুটিয়ে, টিফিন কৌটো হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বাড়ি ফিরলেন।

গাঁয়ের সবাই ভেবেছিলেন বিধায়ককে আর জ্যান্ত পাওয়া যাবে না। ভূত অবশ্যই ওঁর ঘাড় মটকাবে।

কিন্তু কী তাজ্জব কান্ড! তিনি সশরীরে বাড়িতে হাজির! গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়ল বিধায়কের বাড়িতে।

বিধায়ক বললেন, ‘দেখলেন তো ভূত বলে কিছু নেই। আমরা অযথা ভূতে বিশ্বাস করি। ভূতের ভয় করি। প্রমাণ করে দিলাম তো?’

শ্রমিক-মজুরদের ভূতের ভয় কেটে গেল। শ্মশান সংস্কারের কাজ শুরু হল।

‘তোমরা কেউ কিন্তু আর ভূত আছে বলে বিশ্বাস করবে না’— জোর গলায় বললেন বিধায়ক।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%