অগ্নিকুমার আচার্য
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স?
এমন কথা তো জন্মেও শুনিনি! অ্যাম্বুল্যান্স তো গাড়ি!
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স আবার কী?
তাহলে বলছি শোনো, বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদার কথা।
শিলিগুড়ির রাজাডাঙার ধলাবাড়ি গ্রামের মানুষ করিমুল। আশেপাশের সবাই তাঁকে চেনেন, ‘বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা’ হিসেবে। এ-রকম একটা অদ্ভুত নাম কেন করিমুলের?
এর পেছনের কারণটি বড়োই করুণ।
সালটা ১৯৯৫। ডুয়ার্সের চা বাগিচার শ্রমিক করিমুল, এক ঝড়-জলের রাত! হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল করিমুলের। মায়ের আর্তনাদ! ব্যাপার কী? ধড়মড়িয়ে ঘুম থেকে ওঠে করিমুল। ছুটে আসে মায়ের পাশে। মা বিছানায় ছটফট করছেন। কাতরাচ্ছেন। বুকে প্রচন্ড যন্ত্রণা।
অস্থির হয়ে পড়ে ছেলে করিমুল। এক্ষুনি মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ছুটোছুটি শুরু করে করিমুল। একটা গাড়ি যে-করেই জোগাড় করতে হবে। নইলে মাকে যে বঁাচানো যাবে না!

করিমুল
কিন্তু বৃথা চেষ্টা করিমুলের। কিছুতেই আর গাড়ি জোগাড় হল না। চোখের সামনে মা জুফরেন্নেসা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে করতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করলেন!
একটা গাড়ির জন্যে এভাবে মর্মান্তিক মৃত্যু হল মায়ের? করিমুল মায়ের মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ নেয়— গাঁয়ের আর কোনো মাকে— শুধু মাকে নয়, কাউকেই গাড়ির অভাবে মরে যেতে দেবেন না।
কিন্তু কীভাবে? গাড়ি কেনার তো সামর্থ্য নেই তাঁর। শেষটায় ধারদেনা করে একটা পুরোনো বাইক কেনে করিমুল। এই বাইকই হবে তাঁর অ্যাম্বুল্যান্স গাড়ি।
শুরু হল করিমুলের নতুন জীবনসাধনা। রাত-বিরেতে গাঁয়ে, যখনই কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়, ডাক পড়ে করিমুলের! একটুও দেরি না-করে রোগীকে বাইকে চাপিয়ে হাজির হাসপাতালে। গাঁয়ে তো আর অ্যাম্বুল্যান্স গাড়ি মেলে না? তাই, করিমুলের বাইক-ই সম্বল। করিমুলও সঙ্গে সঙ্গে বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে রোগীর ঘরে হাজির। এভাবে আর্ত মানুষের সেবায় করিমুল নিজেকে সঁপে দেয়। করিমুলের নাম ছড়িয়ে পড়ে। শুধু নিজের গ্রামে নয়। আশপাশের সব গ্রামে। বিপদের বন্ধু ‘বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা’কে একডাকে সবাই চেনে।
এভাবে, বছরের পর বছর, বাইশ বছর ধরে করিমুল যখনই খবর পেয়েছে, বাইক নিয়ে রোগীকে পৌঁছে দিয়েছে হাসপাতালে। সেরাত যতই গভীর হোক, যতই প্রাকৃতিক বিপর্যয় হোক, করিমুল কোনো বাধা মানে না। বিনে পয়সায় রুগণ মানুষের সেবা করে চলেছেন।
করিমুলের মানবসেবার এই অভূতপূর্ব ব্রতের কথা ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। খবরটি পৌঁছে গেল দিল্লির পদক বিতরণকারী কর্তাদের কানেও। এমন দৃষ্টান্ত বিরলের মধ্যে বিরলতম।
একদিন দিল্লি থেকে চিঠি এল করিমুলের কাছে। তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করা হবে। ভারতের রাষ্ট্রপতি নিজে পদক তুলে দেবেন করিমুলের হাতে।
‘পদ্মশ্রী’ পাওয়ার খবর শুনেও করিমের হালচালে কোনো পরিবর্তন নেই। একটুও বদলায়নি সুবর্ণপুর চা বাগানের এই শ্রমিকের রোজকার রুটিন। দিল্লি যাত্রার আগেও উঠোনে গাছের শুকনো পাতা জ্বাল দিয়ে ভাত রেঁধে খেয়েছেন।
বিমানে চেপে দেশের রাজধানীতে যাওয়া করিমুলের এই প্রথম। সবটাই তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে যেন। রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার জন্যে চাই ভালো পোশাক। কিন্তু কোথায় পাবেন ভালো পোশাক। বহুদিন আগে একটা পুরোনো কোট তাঁকে দান করেছিলেন ময়নাগুড়ি কলেজের এক অধ্যাপিকার স্বামী। সেটাই টিনের বাক্স থেকে বের করে গায়ে চড়ালেন। এক বন্ধু ফুটপাত থেকে কিনে দিয়েছিল একশো টাকা দামের একটা চশমা। সেই চশমা চোখে লাগিয়ে গরিব করিমুল চললেন রাষ্ট্রপতিভবনে।
রাষ্ট্রপতিভবনে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে সম্মান পেয়ে দারুণ খুশি করিমুল। কিন্তু ‘পদ্মশ্রী’ তাঁর মাথা ঘুরিয়ে দেয়নি। ‘এবার থেকে আরও বেশি করে আর্ত মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করব’।— বললেন, বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা।
সমাজে মানবসেবার আলোর দিশা দেখানো করিমুল হকের বাড়িতে কিন্তু নেই বিজলি বাতির আলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন