অগ্নিকুমার আচার্য
হ্যাঁ, মাত্র তিন বছর বয়স মেয়েটির।
কী অবাক কান্ড করেছে সে?
অবাক বলে অবাক! সাড়ে তিন ঘণ্টায় সেএকহাজার একশো এগারোটি তির ছুঁড়েছে!
এও সম্ভব! মহাভারতের কর্ণ-অর্জুনকে তো সেতুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলে দেখছি! তিন বছরে এত দুর্ধর্ষ তিরন্দাজ! বিশ্বাস হয় না যে!
বিশ্বাস না-হওয়ারই কথা।
কিন্তু এই অবিশ্বাস্য কাজটিই করে দেখালো চেন্নাই-এর পি সঞ্জনা। লোয়ার কিণ্ডারগার্টেনের ছাত্রী।
২০১৮-র ১৫ আগস্ট। দেশের ৭২তম স্বাধীনতা দিবস। এম জি আর জানকী কলেজের মাঠে এক বিস্ময়কর কান্ড প্রত্যক্ষ করলেন ‘সাউথ এশিয়া আর্চারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর কর্মকর্তারা। ছিলেন হাজার হাজার দর্শক।

পি সঞ্জনা
খবরটা আগেই চাউর হয়ে গিয়েছিল— তিন বছরের শিশু তার তিরন্দাজির কেরামতি দেখাবে।
মাঠে হাজির হল সঞ্জনা। তির ধনুক হাতে। সঙ্গে কোচ সিহান হুসাইনি। কোচের দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁর ছাত্রী অসাধ্যসাধন করবে। বিশ্বরেকর্ড করবে। গিনেস বুকে নাম তুলবে।
কোচকে নিরাশ করেনি সঞ্জনা।
কালো টি-শার্ট, কালো ট্রাউজার্স, ডান হাতের কবজিতে বঁাধা তেরঙা ব্যাণ্ড। টার্গেট অর্থাৎ যে লক্ষ্যবস্তুতে সঠিকভাবে তির ছুড়তে হবে— তার থেকে ৮ মিটার দূরে দাঁড়িয়েছে সে।
শুরু হল সঞ্জনার তিরন্দাজির যাদু। এক-এক করে এক হাজার একশো এগারোটি তির ছুঁড়ল সে। সময় নিল সাড়ে তিন ঘন্টা। আন্তর্জাতিক তিরন্দাজির নিয়ম অনুসারে এক ঘণ্টা তির ছোড়ার পর, পাঁচ মিনিটের বিরতি। তারপর আবার শুরু হয় তির ছোড়া। এবং আশ্চর্য এই যে, সঞ্জনার সবগুলো তির সঠিক টার্গেটে গিয়ে আঘাত করেছে।
সাবাস! সাবাস! সঞ্জনা! হাততালিতে ফেটে পড়ল কলেজের মাঠ! এই কচি নরম দুটো হাতে যাদু আছে নাকি! হতবাক মাঠ-ভরতি দর্শকরা আর কর্মকর্তারা।
কোচ বুকে জড়িয়ে ধরলেন সঞ্জনাকে। আদরে, স্নেহে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিলেন ক্ষুদে ছাত্রীকে।
গর্বিত কোচ বলেন, ‘বাবা-মায়ের হাত ধরে যখন ছোট্ট সঞ্জনা আমার স্কুলে আসে, তখনই ওর চোখের ভাষা দেখে বুঝেছিলাম, ওর ভবিষ্যত উজ্জ্বল। গত তিন মাস ওর সাধনার নিষ্ঠা ও একাগ্রতা দেখে আমি অভিভূত। স্কুল ছুটির পর সঞ্জনা ছুটে চলে আসত আমার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। টানা চার ঘণ্টা সেপ্র্যাকটিস করত। ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই। অনবরত চলত তির ছোড়া। প্রশিক্ষক হিসেবে আমার জীবনে, এ-রকম মেধাসম্পন্ন তিরন্দাজ আমি দেখিনি। সঞ্জনা অবশ্যই ভবিষ্যতে তিরন্দাজিতে অলিম্পিকসে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।’
বাবা প্রেমনাথও ক্ষুদে মেয়ের তির ছোঁড়ার দক্ষতা দেখে গর্বিত। তিনি বলেন, দু-বছরের শিশু সঞ্জনাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলাম ছোট্ট তির ধনুক। কারণ, সেঅন্য কোনো খেলায় মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। আর তখন থেকেই তিরধনুকই ওর ধ্যান জ্ঞান। পড়াশুনোর সময়টুকু বাদ দিলে, তিরধনুকই হয়ে উঠেছিল সঞ্জনার সারাক্ষণের সঙ্গী। আমিও ওকে উৎসাহ দিই। আমার আশা, সঞ্জনা একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেই। এ জন্যে যতদূর যেতে হয় আমি যাব।’
গিনেস বুকে সঞ্জনার নাম ওঠা এখন সুনিশ্চিত।
অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও মনোবল থাকলে যে অসাধ্যসাধন করা যায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ তিন বছরের খুদে শিশু সঞ্জনা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন