অগ্নিকুমার আচার্য
দান তো কত রকমেরই হয়। অন্নদান, বস্ত্রদান, টাকাপয়সা দান। এসব দান তো হামেশাই হয়।
কিন্তু জীবিতাবস্থায় নিজের দেহের লিভারদান! এও কি সম্ভব!
হ্যাঁ সম্ভব। এবং এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন এক বাইশ বছরের তরুণী। নাম তার— কাইয়ারটেন মাইলস। আমেরিকার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
কাকে দিলেন মাইলস তার লিভার? এই সৎসাহস তিনি পেলেন কোথা থেকে! সত্যি, এই পৃথিবীতে কত কিছুই ঘটে, যার কোনো সহজ ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না।
এমনই একটা ঘটনা।
ছোট্ট শিশু তালিয়া। বয়েস মাত্র ষোলো মাস। নিউ জার্সির বাসিন্দা। ফুটফুটে শিশু তালিয়া। দেখলেই কোলে নিতে ইচ্ছে করে। আদর করে চুমু খেতে ইচ্ছে করে। এমনই সুন্দর আর মায়াভরা মুখ তালিয়ার।

কাইয়ারটেন মাইলস
কিন্তু ফুলেও যে কীট বাসা বাঁধে। এই খুদে তালিয়ার শরীরে জন্মের পর থেকেই বাসা বেঁধেছে নানা মারণ রোগ। বাইরের অনিন্দ্যসুন্দর চেহারাটার ভেতরে নানা সংক্রামক রোগ ঘাঁটি গেড়েছে।
মা-বাবা শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলেন। আর ক-দিনই বা বঁাচবে মেয়ে!
আমেরিকা চিকিৎসায় অনেক উন্নত দেশ। তালিয়ারও চিকিৎসা শুরু হয়। ডাক্তাররা দেখতে পান— শিশুটির যত গোলমাল লিভারে। ওর লিভারটা সঠিক কাজ করছে না, তাই সেধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে।
ডাক্তারবাবুরা বলেন, একমাত্র উপায়— লিভার প্রতিস্থাপন, তা না-হলে এই শিশুর আয়ু ক্রমশই ফুরিয়ে আসবে।
মা-বাবার মাথায় হাত! কে দেবে লিভার? এমন মানুষ কি পাওয়া সম্ভব? তাও, ব্লাড গ্রূপ এক হতে হবে!
মা-বাবা হতাশায় ভেঙে পড়েন।
এমন সময়, ঈশ্বরের আশীর্বাদস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ‘মাইলস’-এর সঙ্গে তালিয়ার সংযোগ ঘটে। ফুটফুটে শিশুটিকে দেখে মাইলস তাকে কোলে টেনে নেন। আদরে চুম্বনে অস্থির করে তোলেন শিশুটিকে। দু-জনের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, হোক-না বয়েস ১৬ মাস। বন্ধুত্ব তো বয়সের কোনো বাধা মানে না।
ক্রমে মাইলস জানতে পারেন তার খুদে বন্ধুটির মারণ রোগের কথা। তার লিভার খারাপ। একমাত্র অন্যের সুস্থ লিভারের অংশ দানেই তার পুনর্জীবনলাভ সম্ভব। নইলে তার মৃত্যু অবধারিত।
বলে কী? মাইলস অস্থির হয়ে ওঠেন! এভাবে সুন্দর ফুটন্ত ফুলটি অকালে ঝরে পড়ে যাবে! না:, একটা কিছু করতে হবে।
মাইলস অনলাইনে খোঁজ শুরু করতে থাকেন অঙ্গপ্রদানকারীর। যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এগিয়ে আসেন ছোট্ট শিশুটিকে বঁাচাতে।
কিন্তু হতাশ হন মাইলস। কেউ সাড়া দেয় না। কেউ নিজের লিভারের অংশ দিতে এগিয়ে আসে না। ওদিকে দিন দিন যে তালিয়ার অবস্থা অবনতির দিকে যাচ্ছে!
কী করবেন মাইলস! অস্থির হয়ে ওঠেন তিনি। যে করেই হোক ছোট্ট ভালোবাসার বন্ধুটিকে যে বঁাচাতেই হবে— শপথ নিয়ে ফেলেছেন। ভেঙে পড়লে চলবে না।
অগত্যা মাইলস নিজের ব্লাড গ্রূপের সঙ্গে তালিয়ার ব্লাড গ্রূপের মিল আছে কি না যাচাই করতে গেলেন প্যাথোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে।
কী অবাক কান্ড! ব্লাড গ্রূপ যে এক! আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন মাইলস! ঈশ্বরের কী অসীম কৃপা!
মাইলস দ্রুত চলে গেলেন ডাক্তারবাবুদের কাছে। জানালেন, আর যা-যা পরীক্ষানিরীক্ষা দরকার সব করিয়ে নিতে। তিনি লিভারের অংশ দান করতে প্রস্তুত!
ডাক্তারবাবুরা এই তরুণীর সাহস ও উদারতা দেখে অভিভূত। তাঁরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করলেন।
মাইলস-এর স্বপ্ন সফল হল। ডাক্তারবাবুরা বললেন, সব পরীক্ষা সফল হয়েছে। মাইলস-এর লিভারের অংশ তালিয়ার দেহে প্রতিস্থাপনে কোনো অসুবিধা নেই।
২০১৮-র জানুয়ারির গোড়ার দিকে অপারেশন হল পেনসিলভেনিয়া হাসপাতালে। ডাক্তারবাবুরা মাইলস-এর লিভারের কিছুটা অংশ কেটে নিয়ে প্রতিস্থাপন করলেন খুদে তালিয়ার দেহে। সফল হল অস্ত্রোপচার। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল দুই বন্ধু।
তালিয়া এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। ওর শরীরের আর কোনো সমস্যা নেই। মা-বাবারা সুস্থ শিশুকে পেয়ে যারপরনাই খুশি।
সবচেয়ে খুশি মাইলস। সারা মুখে তৃপ্তির ছাপ। তালিয়াকে সুস্থ দেখে মাইলস-এর আনন্দ আর ধরে না।
শুধু মা-বাবা আত্মীয়স্বজনরা নয়। ডাক্তারবাবুরাও মাইলসের এই অবিস্মরণীয় অঙ্গদানের জন্য তাঁকে অকুন্ঠ প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন। বললেন, স্বয়ং ঈশ্বর হয়তো মাইলস-এর বেশে হাজির হয়েছিলেন তালিয়ার জীবনে। ছোট্ট মেয়েটি মাইলস-এর এই ত্যাগের জন্য প্রাণ ফিরে পেল।
মাইলস বলেন, আমার দেহের অংশ যে এক ফুটফুটে শিশুকে বঁাচিয়ে তুলতে পেরেছে সেজন্য আমার জীবন ধন্য। আমরা মানুষ হিসেবে যদি অন্যের উপকারের জন্য কাজে না-লাগতে পারি, তাহলে কীসের মানুষ আমরা?
প্রত্যেক মানুষের উচিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। মানুষের উপকার করাই হোক প্রতিটি মানুষের জীবনের ব্রত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন