অগ্নিকুমার আচার্য
একটি দুটি নয়, পরপর তিন ভয়ংকর জঙ্গিকে খতম করলেন।
কে তিনি?
নাম শুনলে চমকে যেতে হয়!
নাম তার সুহাই আজিজ তালপুর। এক মুসলিম কন্যা।
মুসলিম কন্যা! তিন জঙ্গিকে নিকেশ করলেন! এও কি সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব। যদি সাহস থাকে অদম্য, তাহলে অসম্ভবও সম্ভব হয়।
এই অসম্ভব সত্য ঘটনাটা অবশ্যই নারীদের সাহস জোগাবে। ঘটনাটা বড়োই চমকপ্রদ।
২০১৮ সালের নভেম্বর। সকাল সাড়ে নটা।
পাকিস্তানের পুরোনো রাজধানী করাচি শহর। সেখানে চীনা কনসুলেটের অফিস শহরের অভিজাত ক্লিফটন এলাকায়।
হঠাৎ এই কনসুলেটের সম্মুখে আবির্ভাব তিন সশস্ত্র বালুচ জঙ্গি। এসেই ওই জঙ্গিরা শুরু করে দেয় গ্রেনেড ছোড়া ও বন্দুকের আক্রমণ।
পাহারায় ছিলেন করাচির সশস্ত্র পুলিশবাহিনী। জঙ্গিদের আচমকা আক্রমণে প্রাণ হারান দুই পুলিশ-সহ চারজন। পুলিশদের নেতৃত্বে ছিলেন এক তরুণী। অদম্য সাহস তাঁর। রাইফেল হাতে জঙ্গিদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হলেন। গুলির লড়াই চলল দু-ঘন্টা ধরে।

সুহাই আজিজ
কিন্তু প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারল না জঙ্গিরা। একে একে তিন জঙ্গিকেই খতম করলেন সেই সাহসিনী নারী।
নামটি আবার বলছি।
সুহাই আজিজ তালপুর। করাচি পুলিশের অ্যাসিস্ট্যোন্ট পুলিশ সুপার। কী শৌর্যবীর্য ওই তরুণীর। একাই লড়াই করে তিন জঙ্গিকে যমের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। একেবারে জঙ্গিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পুলিশদের নেতৃত্ব দেন সুহাই।
অথচ এই মেয়েটির পাঠ্যজীবন ছিল বড়োই বিষাদময়। সিন্ধ প্রদেশের ছোট্ট গ্রাম ভিন্দা। সেখানেই জন্ম সুহাইয়ের। এই গ্রামে মুসলিম মেয়েদের পড়াশুনো নিষিদ্ধ। মেয়েরা স্কুলে গেলে তা হয় ধর্মবিরুদ্ধ কাজ।
কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই সোহাই স্কুলের পথে পা বাড়ান। অসম্ভব জেদি মেয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর বাবা আজিজ তালপুর। লেখক ও রাজনীতিবিদ। বাবা উৎসাহ দেন মেয়েকে। মূর্খ করে মেয়েকে রাখতে চান না তিনি। বাবা বিশ্বাস করতেন, লেখাপড়াই মেয়েকে সাহস ও শক্তি জোগাবে।
কিন্তু বাবা চাইলেই কি আর সমস্যার সমাধান হয়? গ্রামের মানুষের প্রচন্ড বঁাধার মুখে পড়েন বাবা আজিজ তালপুর। গ্রামের মাতব্বরেরা ফতোয়া জারি করেন, সোহাইকে কিছুতেই স্কুলে পাঠানো চলবে না।
অগত্যা বাবা উপায় না-দেখে গ্রাম ছেড়েই চলে গেলেন। ডেরা বঁাধলেন সিন্ধ প্রদেশের বিখ্যাত শহর হায়দরাবাদে।
সোহাইয়ের পড়াশোনায় আর বঁাধা রইল না। স্কুল শেষ করে কলেজের পাঠও শেষ করলেন। মেধাবী ছাত্রী ছিলেন সোহাই। বি কম পাশ করে পুলিশ সার্ভিসের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসেন। প্রথমবারেই এল সাফল্য। সেটা ২০১৩ সাল। বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে চার্টাড অ্যাকাউন্ট হোক। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছা পুলিশ সার্ভিস। বাবা আর বাধা দেন না।
সুহাই পরীক্ষায় পাশ করে যোগ দিলেন পুলিশ অফিসার হিসেবে। কয়েক বছরের মধ্যেই প্রমোশন পেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ সুপার।
জঙ্গি খতমের গৌরবময় সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল দেশ-বিদেশে। প্রশংসার বন্যায় ভেসে গেলেন তরুণী সোহাই।
তিনি বলেন, জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল গ্রেনেড আর বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চীনা দূতাবাসটি চটজলদি কবজা করতে। দূতাবাসের দখল নিয়ে সব কর্মীদের বন্দি করতে। সোহাই বলেন, ওদের পিঠের ব্যাগ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম ওরা জঙ্গি। ব্যাস, সোহাই বুক চিতিয়ে লড়াই করলেন। খতম করলেন জঙ্গিদের।
সুহাই প্রমাণ করে দিলেন, মেয়েরাও পুরুষদের থেকে কোনো অংশে কম নয়। চাই শুধু সাহস, জেদ ও আত্মবিশ্বাস।
গ্রামবাসীদের বঁাধা দূরে সরিয়ে, বোরখার আড়ালে নিজের মুখ লুকিয়ে না- রেখে সুহাই আজ দেশের নয়নের মণি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন