অগ্নিকুমার আচার্য
নাম তার রোহিত।
জন্ম থেকেই দিব্যাঙ্গ। পুরো নিম্নাঙ্গ অবশ— অসাড়। হাঁটাচলা দূরের কথা মায়ের কোলে বসতেও কষ্ট হয়।
শিশু রোহিত দেখে তার বয়সিরা বই বগলে গটগট করে স্কুলে যায়। রোহিতের চোখ বেয়ে জল পড়ে। সেকেন যাবে না স্কুলে! খুব সাধ হয় পড়াশুনোর।
মাকে কাতর কন্ঠে বলে, ‘মা, আমি স্কুলে যাব। লেখাপড়া করব।’ মা-র চোখ ছলছল করে ওঠে। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘যাবি বাবা, নিশ্চয়ই যাবি স্কুলে। আমি তোকে কোলেপিঠে করে নিয়ে যাব স্কুলে।’ দিব্যাঙ্গ রোহিতের চোখেমুখে অদম্য উৎসাহের ছাপ।
মা স্লেট, বইখাতা কিনে আনেন। তারপর একদিন মায়ের কোলে চেপে রোহিত ইস্কুলে ভরতি হয়। শুরু হয় রোহিতের বিদ্যাসাধনা।

মায়ের কোলে রোহিত
রোহিতেরা গরিব। বাবা বাণেশ্বর রায়ের একরত্তি একটা মুদির দোকান। কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলে। রিকশা চেপে স্কুলে যাবে সেসামর্থ নেই। তাই মা রেবা দেবীর কোলই সম্বল।
স্কুল কামাই করে না রোহিত। ছেলের আগ্রহ দেখে মাও ছেলেকে কোলে নিয়ে রোজ স্কুলে যান। কোনো কষ্টই মায়ের কাছে কষ্ট নয়। প্রায় দু-কিলোমিটারের পথ। নবদ্বীপ বকুলতলা স্কুল। মা-ই রোহিতের যাওয়া-আসার গাড়ি। ক্লাশ ওয়ান থেকে মা ও ছেলের রোজকার একই রুটিন।
কী অসাধারণ মনোযোগ রোহিতের পড়াশুনোয়। এক-এক করে সব পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে রোহিত মাধ্যমিক পাশ করল।
কিন্তু আসল চমক অপেক্ষা করছিল উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্টের জন্য। চার-চারটি লেটার! কী অবাক করা কান্ড! চারদিকে রোহিতের ধন্যি ধন্যি। মাস্টারমশাইরা প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন রোহিত ও তার মাকে। মা-র চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা অশ্রু। আনন্দাশ্রু।
মায়ের উৎসাহ বেড়ে গেছে। কষ্ট আর তাঁর কাছে কষ্ট নয়। ছেলেকে কলেজে পড়াবেন। মা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোলে চাপিয়েই তিনি ছেলেকে কলেজে নিয়ে যাবেন। কোলে চাপিয়েই ট্রেনে বাসে চাপবেন। কুছ পরোয়া নেই।
মাধ্যমিকে রোহিত পেয়েছিল দুটো লেটার। এমন একটা মেধাবী দৈহিক সামর্থ্যহীন ছাত্রকে বিনা পয়সায় প্রাইভেট পড়িয়েছেন ছ-জন গৃহশিক্ষক। রোহিতের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে তাঁদেরও আনন্দ আর ধরে না।
মুদি দোকানদার বাবাও খুব খুশি। তিনি বললেন, একমাত্র রোহিতের মা-র জন্যেই দিব্যাঙ্গ রোহিত গাঁয়ের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
ভূগোলে অনার্স নিয়ে রোহিত কলেজে পড়তে চায়। মা-ও ছেলের ইচ্ছে পূরণে কোমর বেঁধেছেন। চোখে-মুখে তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছাপ।
আমাদের দেশে দিব্যাঙ্গ ছেলেমেয়ে প্রচুর। সকলে যদি রোহিতের মতো উদ্যমী হয়, আর রোহিতের মায়ের মতো সবার বাবা-মা-রা যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে দিব্যাঙ্গরাও সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
রোহিত হোক সবার প্রেরণা।
রোহিতের মা হোক এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন