অগ্নিকুমার আচার্য
সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এক মুসলিম নাবালিকা। নোবেল শান্তি পুরস্কার আগেই ঝুলেছে তাঁর গলায়। এখন আর এক বড়ো সম্মান। রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তির দূত নির্বাচিত হলেন এক কনিষ্ঠতম মুসলিম কন্যা।
কে সে?
তাঁর নাম সারা বিশ্বের মানুষ জানে।
তিনি ইউসুফজাই মালালা। নোবেল বিজয়িনী। কনিষ্ঠতম।

মালালা ইউসুফজাই
মালালার জীবনসংগ্রাম অত্যাশ্চর্য। শুনে গায়ে কাঁটা দেয়, পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকার মেয়ে মালালা। ওখানে তালিবানদের দাপট। তালিবানদের ফতোয়া— মেয়েরা স্কুলে যেতে পারবে না। পড়াশুনো তাদের জন্যে নিষিদ্ধ। তালিবানদের ভয়ে থরথর করে কাঁপে সেখানকার মানুষজন।
কিন্তু এই ফতোয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এক নাবালিকা, পড়েন অষ্টম শ্রেণিতে। তিনি স্থির করেন, কিছুতেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ করবেন না। শুধু নিজে নন, সহপাঠী ছাত্রীদেরও সাহস জোগান। লেখাপড়া ছাড়া হিজাব বোরখা থেকে মুক্তি নেই মুসলিম মেয়েদের। ভয় করলে চলবে না। তালিবানি হুকুম মানা চলবে না। অন্য ছাত্রীরা মনে জোর পায়। মালালা তাদের ক্যাপ্টেন।
খবরটা পৌঁছে যায় তালিবানদের কাছে। তারা রেগে কাঁই! একটা কিশোরীর এত বড়ো সাহস! তালিবানরা হুমকি দেয় মালালাকে। প্রাণে বঁাচতে চাও তো স্কুলে যাওয়া বন্ধ করো। নেতাগিরি বন্ধ করো।
কিন্তু মালালা তাঁর সংকল্পে অনড়! অটল! যা হয় হবে, সেস্কুলে যাবেই। মেয়েদের শিক্ষার জন্যে সেলড়াই চালিয়ে যাবেই। দৃঢ়প্রতিজ্ঞা তাঁর। তালিবানদের ফতোয়া সেমানবে না।
কিন্তু তালিবানি শাস্তি নেমে এল মালালার ওপর। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে তালিবানিদের গুলি এসে লাগে মালালার মাথায়। প্রচন্ড আহত হন মালালা। বঁাচার কোনো আশা ছিল না।
খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল সারাবিশ্বে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সরকার মালালার পাশে এসে দাঁড়ালেন। মালালার জন্যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠালেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য মালালাকে নিয়ে এলেন ব্রিটেনে।
চিকিৎসায় সাড়াও দিচ্ছেন মালালা। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। সুস্থ হয়েই মালালা নেমে পড়লেন তাঁর লক্ষ্যপূরণে। মহিলা, শিশুকন্যাদের মুক্তির জন্য, মানবিকতার জন্য লড়াই শুরু করলেন। তালিবানি জঙ্গীদের হুমকিকে তোয়াক্কা না-করে মুসলিম মেয়েদের হাতে বইখাতা তুলে দিলেন। মালালার নেতৃত্বে নারীশিক্ষার এক আন্দোলন গড়ে উঠল সারা বিশ্ব জুড়ে। বিশেষত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশের মেয়েদের চোখে শিক্ষার আলো জ্বেলে দিলেন। স্ত্রীশিক্ষার জন্য যে লড়াই মালালা চালিয়ে গেছেন— তা গোটা বিশ্বের মানুষকে বিস্মিত করেছে।
২০১৩ সালে মালালা ও তাঁর বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই একটা ফাণ্ড গড়ে তোলেন। উদ্দেশ্য, শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা।
মালালার এই ফাণ্ডের অর্থ দিয়ে সিরীয় শরণার্থীদের জন্য গড়ে উঠেছে একটা স্কুল।
মালালার এই সাহসী প্রচেষ্টার জন্য, নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতার জন্য তাঁর জীবনপণ সংগ্রামের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৪ সালে তাঁকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ‘নোবেল’ শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। সতেরো বছর বয়সের এক তরুণীর এই সম্মান লাভ, নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে আর ঘটেনি।

বক্তৃতারত মালালা
সারা বিশ্ব আনন্দিত। মালালা গর্বিত। এবার আরও দ্বিগুণ উৎসাহে তিনি তাঁর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নোবেল পুরস্কারের অর্থে তিনি মেয়েদের শিক্ষার জন্যে বহু স্কুল খোলেন। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশ থেকে বহুবিধ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কানাডা তাঁকে সাম্মানিক নাগরিকত্ব দান করেছে। পেয়েছেন, শাখারভ পুরস্কার, সিমন দে ব্যভিয়র পুরস্কার, জাতীয় যুব শান্তি পুরস্কার, সিতারাই-ই-ইমতিয়াজ পুরস্কার।
আর এ বছর, অর্থাৎ ২০১৮ সালে তাঁর গৌরবের মুকুটে যুক্ত হল নতুন পালক ‘সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তির দূত’। এক বিরলতম সম্মান।
রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল ঘোষণা করেন, এক তরুণী ছাত্রী হিসেবে মালালা কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েও যেভাবে নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তা বিশ্ববন্দিত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তির দূত হয়ে তিনি আরও নির্ভীকতার সঙ্গে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারবেন।
জঙ্গি হুমকি ও হিংস্রতার বিরুদ্ধে মেয়েদের শিক্ষাবিস্তারের সাহসী প্রচেষ্টার আরেক নাম— ইউসুফজাই মালালা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন