অগ্নিকুমার আচার্য
বিহারের পূর্ণিয়া জেলার নিরক্ষর গ্রাম হারদা।
হারদার খেতমজুর দিলীপ সাহানি।
বাবা লালটুনি সাহানিও খেতমজুর।
দিলীপের বড়ো ভাই দীপক। সবাই খেতমজুর। কষ্টেসৃষ্টের সংসার। নিজেদের জমিজমা নেই। তাই অন্যের জমিতেই দিনভর বাপ-ব্যাটাদের হাড়ভাঙা খাটুনি। শুনেছেন, দ্বারভাঙার জমিদারের খেতে দিনমজুরি করলে দুটো বেশি পয়সা মেলে।
দ্বারভাঙা!
সেতো অনেক দূর। প্রায় আড়াই-শো কিলোমিটারের পথ। কী আর করা যায়। পয়সা যে বেশি পাবে। বাপ দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দ্বারভাঙা আসেন প্রতি বছর।
জুলাই থেকে জানুয়ারি। সাতটা মাস বাদাম আর মকাই খেতে খেতির কাজ। বিরামহীন।
মজুরি আর কত। কোনোদিন একশো টাকা। আবার কোনোদিন সত্তর-আশি টাকা।

দিলীপ সাহানি
দিলীপের খুব ইচ্ছে পড়াশুনো করে। তাই সেএকদিন বই কিনে আনে। রাতে বই খুলে পড়ে, পাঁচ-ছ-মাস ধরে স্কুলে যায়। টানাটানির সংসার। কাজ না করলে তো পেটে দানা পড়ে না, কাজের সঙ্গে চলে দিলীপের লেখাপড়া।
একদিন দিলীপ ভরতি হয়ে গেল হাই স্কুলে। বেণীপুরের নওয়াদের জে এন জে ভি স্কুলে। দিলীপের ধ্যানজ্ঞান কেবল পড়াশুনো। সংসারে কঠোর দারিদ্র্য। তবু বাবা, দিলীপের লেখাপড়ার আগ্রহ দেখে ওকে মদত দেন।
২০১১ সাল।
দিলীপদের পরিবারে বঁাধভাঙা উচ্ছ্বাস। খুশির জোয়ার। দিলীপ মাধ্যমিক পাশ করেছে। ভালো নম্বর পেয়ে, প্রথম বিভাগে।
মাধ্যমিক পাশ! গাঁয়ের লোকজন সব তাজ্জব বনে যায়। ছুটে আসে সবাই দিলীপকে দেখতে। খেতমজুরের ছেলে দিলীপ। খেল দেখাল বটে!
কিন্তু থামলে তো চলবে না! দিলীপের উৎসাহ বেড়ে হল দ্বিগুণ। হোক টাকার অভাব। খেয়ে-না-খেয়ে পড়াশুনা করবে। ছোটো ছোটো বাচ্চাদের টিউশন করবে।
সাধু যার সংকল্প ঈশ্বর তার সহায়!
দ্বারভাঙার বেহেড়া কলেজ। বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছে দিলীপ। আবার ভেলকি দেখাল দিলীপ। উচ্চমাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন।
এবার দু-চোখ-ভরা নতুন স্বপ্ন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। ইঞ্জিনিয়ার হবে। সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হবে। প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসে দিলীপ। যথারীতি ছাড়পত্র পায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। কিন্তু অনেক টাকা যে দরকার। কোথায় পাবে অত টাকা। ব্যাঙ্কের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরল দিলীপ! ঋণ নেবে। কিন্তু বিধি বাম।
ব্যাঙ্ক মুখ তুলে চাইল না।
তাহলে উপায়? মুষড়ে পড়ে দিলীপ।
বাবা বলেন, ‘দীপক আর আমি মিলে ডবল খাটনি খাটব। তবু তোকে পড়তে হবে দিলীপ।’
দিলীপ ভরতি হয় ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। মধ্যপ্রদেশের ভূপালে। মিলেনিয়াম গ্রূপ অব ইনস্টিটিউশনের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে।
বেশি টাকা কীভাবে রোজগার করা যায় বাবার মাথায় ঘুরপাক খায় ভাবনা। ছেলের পড়ার খরচ জোগাতে হবে যে! মাসের মাইনে, থাকা খাওয়ার খরচ! খেতির কাজে তো বঁাধা ধরা টাকা! বাবা শুধুই ভাবেন।
শেষে বাবা লালটুনি পাড়ি দেন নেপালে। আইসক্রিম বিক্রি করেন। ফাঁকে ফাঁকে গ্রামে ফিরে খেতির কাজও করেন।
চার-চারটে বছর কীভাবে চলবে সংসার! কীভাবে চলবে পড়ার খরচ। কলেজ ছুটির অবকাশে দিলীপও হাত লাগায় দিন মজুরের কাজে।
পড়ার মাস-মাইনে জোগাতে হিমশিম খায় দিলীপ। এদিকে ঘরে বড়ো অনটন। দু-বেলা দু-মুঠো জোটে না। আধপেটা খেয়ে দিন কাটে বাবা-মা-দাদার। দিলীপের চোখ ফেটে জল আসে। এত কষ্ট করছেন বাবা-মা-দাদারা!
কথায় বলে না, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।
২০১৬ সাল।
অবশেষে সাধনার সিদ্ধি। দিলীপের অভাবনীয় সাফল্য। পরীক্ষায় মধ্যপ্রদেশে প্রথম স্থান অধিকার। খবরটি ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুতগতিতে। বাবা-মা-দাদা আনন্দে বাকরুদ্ধ। দিলীপের চোখে জল। আনন্দাশ্রু।
চাকরির ডাক পেতে দেরি হল না। অমন দুর্দান্ত মেধাবী ছাত্র! সিঙ্গাপুরের নামি ইস্পাত প্রতিষ্ঠান— সঙ্গম গ্রূপ দিলীপকে চাকরির অফার পাঠাল। মাস মাইনে ৮ লাখ। দিলীপ যেন আকাশ থেকে পড়ে। মাসের শেষে ৮ লাখ আসবে তার পকেটে! এক দিনমজুরের ছেলের। যে নিজেও শৈশবে-কৈশোরে ছিল এক হতদরিদ্র খেতমজুর।
দিলীপ দেখিয়ে দিল চেষ্টা, পরিশ্রম আর উদ্যমে জীবনযুদ্ধে সাফল্য অবশ্যই আসে। সেনিজেই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
দিলীপ স্থির করে, নিজের গ্রামে সেএকটা পাঠশালা খুলবে। শৈশবের দিনগুলি তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গাঁয়ের ছেলেগুলি খেতেখামারে মজুরের কাজ করে। লেখাপড়ার কোনো সুযোগ পায় না। ওদের জন্য সেএকটি স্কুল খুলবে। তার তো এখন অনেক টাকা! অত টাকা তো আর সংসারে দরকার পড়বে না।
এক খেতমজুরের ছেলেও যে ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দিলীপ।
দিলীপ সাহানি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন