তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার

অগ্নিকুমার আচার্য

আবিষ্কারকের তালিকায় নাম উঠে গেল দশম শ্রেণির তিন ছাত্রের। কারা ওরা? কী আবিষ্কার করেছে ওরা?

ওরা তিনজনই একই স্কুলে পাঠরত দশম শ্রেণির ছাত্র। বয়স এখনও ষোলোর নীচে। জয়পুরের তিন কিশোর চেতনা গোলেচ্চা, মৃগাঙ্ক গুজ্জর আর উৎসব জৈন। জয়পুরের নীরজা মোদি স্কুলে পড়ে তিনজন।

পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিন বন্ধুর ভাবনা— একটা নতুন কিছু সৃষ্টি করা, নতুন কিছু আবিষ্কার করা। দিনরাত নিজেদের মধ্যে ওরা আলোচনা করে, মত বিনিময় করে। নতুন পথের খোঁজে তিন সহপাঠী বিভোর। খেলাধুলো, টিভি, মোবাইল, আড্ডা ইয়ার্কি কিছুতেই মন নেই। ভাবনা ওদের একটাই। নতুন কিছু আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিতে হবে সবাইকে।

কথায় আছে, অধ্যবসায় আর নিরন্তর ভাবনা, সিদ্ধি এনে দেয়। তাই হল তিন কিশোরের জীবনে।

তাঁরা আবিষ্কার করল— প্রিজারভেটিভবিহীন স্বাস্থ্যসম্মত পানীয়।

প্রিজারভেটিভ ছাড়া পানীয়! এ তো এক আচানক কান্ড!

চেতনা গোলেচ্চা, মৃগাঙ্ক গুজ্জর ও উৎসব জৈন

বাজারে কত রকমের ঠাণ্ডা পানীয় বিক্রি হয়। সব পানীয়তে প্রিজারভেটিভ মেশানো হয়। প্রিজারভেটিভ-এর দৌলতে পানীয় অনেকদিন টাটকা থাকে। সহজে নষ্ট হয় না।

কিন্তু প্রিজারভেটিভ তো একধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ। প্রিজারভেটিভ যুক্ত ঠাণ্ডা পানীয় খেলে তো স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই মানুষদের এ বিষয়ে সচেতন করে আসছেন। কিন্তু কার কথা কে শোনে! গরমের সময় এক গ্লাস ঠান্ডা পানীয়! আঃ, শরীর-মন জুড়িয়ে যায় যে! কে মাথা ঘামায় প্রিজারভেটিভ মেশানো না কি এ নিয়ে!

কিন্তু জয়পুরের তিন কিশোর ছাত্র মাথা ঘামাতে শুরু করল। প্রিজারভেটিভ ছাড়া কীভাবে পানীয় অনেকদিন টাটকা থাকে। যা মানুষের স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করবে না!

অবশেষে একদিন এল সাফল্য।

তিন ছাত্র বানিয়ে ফেলল প্রিজারভেটিভ হীন পানীয়। অর্থাৎ কোনো রাসায়নিক পদার্থ ছাড়া। কিন্তু প্রিজারভেটিভ ছাড়া পানীয়তে তো পচন ধরে যাবে?

না, পচন ধরবে না। ছাত্রদের দাবি, তারা যে পানীয় তৈরি করেছে, তাতে কোনো ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ তো নেই, এমনকী, বাজারে চলতি পানীয় বা ফলের রসে যে ক্ষতিকারক সোডা ও চিনি মেশানো হয়, তাও নেই তাদের পানীয়তে। তাদের পানীয়তে আছে এক ধরনের সুগন্ধী পানীয় জল। কেওড়া, গোলাপ এবং বেলের স্বাদযুক্ত তিন ধরনের পানীয় তৈরি করে তারা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে।

২০১৭ সালে জয়পুরে অনুষ্ঠিত এক শিল্পোদ্যোগী উৎসব-এ ছাত্রদের এই পানীয় অনেক শিল্পোদ্যোগীর প্রশংসা পায়। সেই উৎসবেই ১৫০ বোতল পানীয় সরবরাহের বরাত পায় তারা।

এরপর থেকেই শিল্পমহলে তাদের নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। মালব্য ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই পানীয় তৈরির দায়িত্ব নেয়। ২০১৮-র জানুয়ারির মধ্যেই আট হাজার বোতল পানীয় বিক্রি হয়ে যায়।

পানীয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোরের এক ব্যাবসায়ী এই তিন কিশোর আবিষ্কারককে তিন কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন।

এখন এই তিন কোটি টাকায় ইন্দোরে তৈরি হয়েছে তিন কিশোরের পানীয় তৈরির কারখানা। কানপুর আইআইটি ও ইন্দোরের আইআইএম এই আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দেয়। শংসাপত্রও দেয়।

হয়তো নাবালক বলে, তাদের আবিষ্কারের পেটেন্ট করার স্বীকৃতি এখনই মিলবে না, কিন্তু এক বছরের মধ্যে সরবরাহের বরাত পাওয়া, লগ্নিকারী পাওয়া এবং বাজারজাত করার যে সুযোগসুবিধা তাদের হাতে এসেছে তাতে ভবিষ্যতের পথ যে প্রশস্ত হয়ে গিয়েছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু পড়াশুনো ছেড়ে এই পনেরো বছর বয়সে ব্যাবসায় জড়িয়ে পড়া কতখানি যুক্তিযুক্ত? কিন্তু তিন কিশোর মনে করে— বিএ, এমএ পাশ করে একটা চাকরির জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ছুটোছুটি করার চাইতে, আমরা যদি অল্প বয়সেই নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখি। তাহলে সেই স্বপ্ন ভবিষ্যতে আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা এনে দেবে।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%