অগ্নিকুমার আচার্য
বিয়ের আসর জমজমাট। আলোর রোশনাই। সানাইয়ের সুর ভেসে আসছে বাতাসে।
কনে ‘চুমকি’ লাল চেলি পরে, গলায় মালা ঝুলিয়ে, মাথায় মুকুট চড়িয়ে এসে বসেছে বিয়ের পিঁড়িতে। বরও সেজেগুজে হাজির। ব্রাহ্মণ মন্ত্রপাঠ শুরু করবেন। এমন সময় অঘটন। বর জিতেন্দ্র অতিরিক্ত কিছু গয়না ও পনের টাকা হাতে পেতে চান। এ ছাড়া বিয়ে সম্ভব নয়— বলে বর ঘোষণা করলেন।
বরের প্রস্তাব শুনে কনে রেগে কাঁই। সঙ্গে সঙ্গে, তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ছিঁড়ে ফেললেন গলার মালা, ছুড়ে ফেলে দিলেন মাথার মুকুট। ক্রুদ্ধ চুমকি গলা চড়িয়ে বললেন, ‘এমন অর্থপিশাচ, এমন অমানুষকে আমি কিছুতেই জীবনসঙ্গী করব না।’
বিয়ে ভেঙে গেল। বিয়ের আসরে উপস্থিত অতিথি অভ্যাগত আত্মীয়স্বজনরা চমৎকৃত মেয়ের তেজ দেখে। ভুবনেশ্বরের তাজপুর জেলার ব্রহ্মবড়বা গ্রামের এক বাইশ বছরের যুবতীর পণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি দেখে সকলে শুধু মুগ্ধ নন, ‘বাহবা, সাবাস’ ধ্বনিতে কনেকে আরও সাহস জোগালেন।

পাত্র জিতেন্দ্র, পাত্রী চুমকি
ওদিকে বর জিতেন্দ্র পাত্র ও তাঁর বাবা ভাস্কর পাত্র কনের এই তাজ্জব কান্ড দেখে হতবাক। তাঁদের ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বঁাচি’ অবস্থা। বরযাত্রীদের নিয়ে পালাতে পারলে বঁাচেন। কিন্তু পালাবেন কোথা? উপস্থিত গ্রামবাসীরা তাঁদের ঘেরাও করে রাখলেন। খবর চলে যায় পঞ্চায়েতে।
পরদিন সকালে পঞ্চায়েতের কর্তারা বৈঠকে বসেন। তাঁরা ঘোষণা করে দেন— পণ নেওয়া বা পণ দেওয়া দন্ডনীয় অপরাধ। বরপক্ষ বিয়ের আগে যে পণের টাকা বা গয়না হস্তগত করেছেন, তা এখানে ফেরত দিতে হবে। শুধু তাই নয়, এই অপরাধের জন্যে বরকর্তাকে দশ হাজার টাকা জরিমানা এই মুহূর্তে মিটিয়ে দিতে হবে, নইলে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
বরপক্ষ প্রমাদ গুণলেন। বুঝলেন, বড়ো শক্ত হাতে পড়েছেন, সহজে মুক্তি পাবেন না। তাই বাধ্য হয়ে, বিয়ের আগে পণ হিসেবে হাতিয়ে নেওয়া ৮০ হাজার টাকা ও কয়েক হাজার টাকার গয়না কনের বাবা খগেশ্বর বেহেরার হাতে তুলে দিয়ে নতমস্তকে গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন। গ্রামবাসীরা ওদের ধিক্কার জানালেন এবং মেয়ের প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ। বললেন, এমন সাহসিনীরই প্রয়োজন আজকের সমাজে।
কনের পিতা অস্বচ্ছল কৃষক। অত্যন্ত কষ্ট করে পণের টাকা ও গয়না সংগ্রহ করেছিলেন। পণ দেওয়া নিষিদ্ধ জেনেও শুধু মেয়ের সুখের জন্যে জমি বিক্রি করেছিলেন।
কিন্তু পাত্রপক্ষ বিয়ের আসরে যখন আরও টাকা, গয়না দাবি করে, তখন বাবা বেহেরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। কোন পিতা চান মেয়ে লগ্নভ্রষ্টা হোক, বিয়ে ভেঙে যাক?
এই পরিস্থিতিতে মেয়ের এই দুঃসাহস দেখে বাবা মনে বল পেলেন। তিনিও মেয়েকে সমর্থন করলেন। বললেন, ‘আমার এই মেয়ের জন্যে আমি গর্বিত।’
সমাজপতিরাও আর ‘লগ্নভ্রষ্টা’ বলে ঘোঁট পাকাতে সাহস পাচ্ছেন না। তাঁরা বুঝতে পারছেন দিন বদলাচ্ছে। মেয়েদের আর যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েরাও আজ ঘৃণ্য পণপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। শুধু চুমকি নয়, আরেক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মেয়ে দুর্গাপুরের ‘বুলটি’ সিঁদুর দান হয়ে যাওয়ার পরেও বরপক্ষের পণের খাঁই মেটানোর পথে রুখে দাঁড়ায়। দু-রাত দু-দিন গ্রামবাসীরা বরপক্ষকে পণের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পেতে আটক করে রাখে। বরপক্ষ অধিকাংশ টাকা ফেরত দিয়ে তবে মুক্তি পায়।
এভাবে যদি মেয়েরা পণপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তবেই দেশ থেকে এই জঘন্য প্রথার অবসান ঘটবে।
চুমকি, বুলটিরা সমাজকে এই পথই দেখিয়ে দিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন