অগ্নিকুমার আচার্য
অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে সায়নী। পশ্চিমবঙ্গের কালনার মেয়ে। ছোটোবেলা থেকেই জলের প্রতি খুব আকর্ষণ। জলে নেমে সাঁতারকাটা। কী মজাই না লাগে।
দেখতে দেখতে সাঁতারে পটু হয়ে ওঠে সায়নী।
স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে। জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। দুরন্ত ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার হবে।
কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবে যে অনেক ফারাক। প্রতি পদে পদে বাধা। গরিব ঘরের মেয়ে। বাধা কাটানো কি সহজ!
আর্থিক বাধা। রাজনীতির বাধা।
কিন্তু থেমে থাকার মেয়ে নয় সায়নী।
সায়নীর সাঁতারের দক্ষতা আর প্রচন্ড আগ্রহ দেখে কেউ একজন তাকে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার সুযোগ করে দেয়।
কিন্তু বিধি বাম। সুইমিং পুলের দরজা একদিন বন্ধ হয়ে গেল। সায়নী রাজনীতির শিকার।
মন খারাপ হয় সায়নীর। কিন্তু দমবার পাত্রী সেনয়। যত বাধা আসুক, অতিক্রম করতে হবে।
গ্রামের এক এঁদো ডোবা।

সায়নী
ডোবাতেই চলল সাঁতার কাটা। আরও আরও দক্ষ হয়ে ওঠা। ইংলিশ চ্যানেল পার হতে হবে। স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতেই হবে।
কিন্তু বাধা যে আর কাটে না।
ডোবার জল নোংরা। দূষিত জল। গায়ে ফুসকুড়ি হয়। হোক ফুসকুড়ি। কুছ পরোয়া নেই। অনুশীলনে খামতি নেই। চোখে-মুখে অদম্য ইচ্ছাশক্তির ছাপ।
কিন্তু ইংলিশ চ্যানেলে পৌঁছোতে তো অনেক টাকার দরকার। অত টাকা কোথায় পাবে সে!
মনমরা হয়ে বসে থাকে সে।
বাবা লক্ষ করেন মেয়েকে। এত অদম্য ইচ্ছাশক্তি মেয়ের! টাকার অভাবে মাঠে মারা যাবে?
বাবা তা হতে দেবেন না। মেয়েকে সস্নেহে বলেন, ‘ভাবিস নে মা। টাকার জোগাড় হয়ে যাবে।’
মেয়ে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।
বাবা বাড়িটা বন্ধক রাখলেন। ব্যস! আর কোনো সমস্যা নেই। মেয়ে যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে! বাবাও স্বপ্ন দেখেন, একদিন সারা বিশ্বে সায়নীর নাম ছড়িয়ে পড়বে। কত পুরস্কার উঠবে সায়নীর হাতে!
২০১৭-র ৮ জুলাই।
অবশেষে সায়নী যাত্রা করল বিলেতের পথে বাবা-মাকে প্রণাম করে। মাকে দৃঢ়কন্ঠে বলে সায়নী— ‘ভেবো না মা। জলে নামলে আমি জয় ছিনিয়ে আনবই। মা আশীর্বাদ করেন, ‘জয়ী হয়ে ফিরে এসো। ক্ষীরের শুকনো মিষ্টি নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকব।’
তারপর একদিন সায়নী সত্যি সত্যিই ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংলিশ চ্যানেলে।
উত্তাল সমুদ্র। তাপমাত্রা কম। তার ওপর জেলিফিশের সাঁড়াশি আক্রমণ। শরীর ঠিক রাখা খুব কঠিন। বাবা রাধেশ্যামবাবু উৎসাহ জোগান।
শেষে একদিন সায়নীর স্বপ্ন হল সত্যি! টিভি, খবরের কাগজে সায়নীর অভূতপূর্ব সাফল্যের খবর বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল।
সায়নী ইংলিশ চ্যানেল জয় করেছে।
অভিনন্দনের পর অভিনন্দন আসছে। ফোনের পর ফোন। পূর্ব সাতগাছিয়ার বাড়িতে। মায়ের আনন্দ দেখে কে! আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশি ভেঙে পড়ল সায়নীদের বাড়িতে।
বাড়িতে উৎসবের বাজনা বেজে উঠেছে।
মা রূপালি দেবী বিমানবন্দরে হাজির। হাতে পাঁচ রকমের মিষ্টি! বিমানবন্দরে মানুষে মানুষে ছয়লাপ। বিশ্বজয়ীকে একবার দেখবে বলে।
বিমান থেকে নামল সায়নী।
শরীরে ধকলের চিহ্ন।
কিন্তু মুখে জয়ের চওড়া হাসি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন