অগ্নিকুমার আচার্য
অদম্য ইচ্ছাশক্তি যে মানুষের জীবনে কত বড়ো সাফল্য আনতে পারে, তা করে দেখাল এক মুসলিম মেয়ে।
নাম তার আফসান। বাড়ি বেঙ্গালুরুতে।
বাবা, মা আর তিন ভাই-বোনের সংসার। বাবা চিত্রশিল্পী ছবি-টবি বিক্রি করে মোটামুটি ডাল-ভাত খেয়ে ভালোই চলছিল পাঁচজনের সংসার।
হঠাৎ ছন্দপতন। একটা সড়ক দুর্ঘটনা পরিবারটাকে ঠেলে দিল অন্ধকারের গর্ভে। চিত্রশিল্পী বাবার একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় হাঁটু গেল ভেঙে। ভয়ংকরভাবে। বাবা চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। চিরকালের মতো শয্যাশায়ী হলেন।

আফসান
তিন সন্তানের মা জাহিরুন্নিসার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কত আশা ছিল, তিন সন্তানকে লেখাপড়া শেখাবেন। বিএ, এমএ পাশ করাবেন! কিন্তু এক মুহূর্তে মায়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা সব কেড়ে নিল স্বামীর দুঘর্টনা।
অগত্যা উপায় না-দেখে, মাকে বেছে নিতে হল বাড়ি বাড়ি ঠিকে ঝি-এর কাজ।
বড়ো মেয়ে আফসান। কৈশোরে পা দিয়েছে। সেমায়ের কষ্ট বুঝতে পারে। মায়ের স্বল্প আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।
আফসান ঠিক করে সে-ও মায়ের মতো বাড়ি বাড়ি ঝি-এর কাজ করবে। মাকে সাহায্য করবে।
মায়ের দু-চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। কত সাধ ছিল আফসান স্কুলে কলেজে পড়বে।
মায়ের ব্যথা বোঝে আফসান। মাকে সান্ত্বনা দেয় ‘তুমি ভেবো না মা, আমি দশ বাড়ি কাজ করেও ঠিক লেখাপড়া চালিয়ে যাব। প্রাইভেট পরীক্ষা দেব।’
আফসান লেগে যায় গৃহপরিচারিকার কাজে। এবাড়ি-ওবাড়ি, দশ বাড়ি ঘুরে ঠিকে ঝি-র কাজ করে। সন্ধ্যায় বিশ্রাম। সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীরটা চায় একটু বিশ্রাম।
কিন্তু আফসান যে মাকে কথা দিয়েছে সেলেখাপড়া করবে? তাই বিশ্রাম তো তার জন্যে নয়! আফসান বইখাতা নিয়ে বসে পড়ে। রাতে দুটো মুখে দিয়ে আবার বই খাতায় মন দেয়। তারপর শুতে যায়। আবার ভোরে উঠতে হবে যে!
এভাবে রাত-দিন বিরাম নেই আফসানের। আবার ফাঁক ফেলেই ছোটো ভাই-বোনদের যত্নআত্যি করা। এ সবই ধাতস্থ হয়ে গেছে আফসানের।
কিন্তু এত সব কাজের মধ্যেও, আফসান ভোলে না তার জীবনের লক্ষ্য। তাকে বিএ., এমএ পাশ করতেই হবে। তাই পড়াশুনোর কোনো খামতি রাখলে চলবে না। বাড়ি বাড়ি বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘরদোর পরিষ্কার করা— সন্ধ্যেয় বাড়ি এসে পড়াশুনো করা— যন্ত্রের মতো চলে আফসানের জীবন। বাড়ির বড়ো মেয়ে, তার ওপর যে অনেক দায়িত্ব। মায়ের বয়েস হয়েছে। আগের মতো আর কাজ করতে পারেন না। ছোটো ভাই-বোনের লেখাপড়ার ভারও সেনিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। ভাই দশম শ্রেণি পাশ করেছে। ছোটো বোন এইটে পড়ে।
আফসানের অধ্যবসায় বেড়ে গেল। কষ্ট না-করলে যে কেষ্ট মেলে না। নিজে পড়ছে, ভাই-বোনকে পড়াতে পারছে। সংসারও চালাচ্ছে!
আফসানের জেদ বেড়ে গেল! তাকেও পাশ করতেই হবে। আবার সংসার চালানোর জন্যে বাড়ি বাড়ি ঝি-এর কাজও চালিয়ে যেতে হবে।
শেষে পরিশ্রমেরই ফল পেল আফসান। একের পর এক পাশ করে বেঙ্গালুরুর সরকারি প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে বিকম পাশ করল। সাধারণ পাশ নয়, একেবারে প্রথম শ্রেণিতে পাশ। কী করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করল আফসান? জীবনে এত প্রতিকূল পরিস্থিতি! এত লড়াই! যখন সেবিকম পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন মা অসুস্থ, বাবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি! কিন্তু পিছপা হয়নি আফসান। মেধা আর প্রবল ইচ্ছাশক্তির যুগলবন্দিতে আফসান আজ সকলের নয়নের মণি। যেসব বাড়িতে সেকাজ করে, তারাও আফসানের পাশের খবর শুনে শুধু আনন্দিত নয়, স্তম্ভিত হয়। সবাই আফসানকে আর পরিচারিকা মনে করেন না, নিজের ঘরের মেয়ে মনে করেন।
এরপর কী করবেন আফসান? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হতে হবে। এমকম পাশ করতে হবে। কিন্তু আগে চাই একটা চাকরি। সেঠিক করে চাকরি আর পড়া একসঙ্গে চালিয়ে যাবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন