আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ

অগ্নিকুমার আচার্য

আমাদের সমাজ ভাবে, মেয়েরা ছেলেদের থেকে দুর্বল। ঘরকন্নার কাজই মেয়েদের উপযুক্ত। এভাবেই সমাজে মেয়েদের দমিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু মেয়েরাও যে পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না, বর্তমানে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে মেয়েরা তার প্রমাণ রাখছে।

তেমনি এক মেয়ে মঞ্জিতা।

গুজরাতের মেয়ে মঞ্জিতা বানজারা। যেমন মেধাবী, তেমনি সাহসী, বাবা গুজরাত পুলিশের পদস্থ অফিসার। বিত্তশালী পরিবার। আর্থিক কোনো টানাপোড়েন নেই। কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই বাবার নির্দেশ— বিলাসিতায় মন দেওয়া চলবে না। সহজ অনাড়ম্বর জীবন কাটাতে হবে।

বাবার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে মঞ্জিতা। অন্য সব ছাত্রীর মতো বাসে চড়ে স্কুলে যায়। বাড়িতে গাড়ি আছে। কিন্তু মঞ্জিতা গাড়ি চড়ে না। বাসে করেই স্কুল কলেজে পড়াশুনো করে।

কিন্তু বাদুড়ঝোলা বাসে যাতায়াত করতে গিয়ে মঞ্জিতা লক্ষ করেছেন, মেয়েদের শ্লীলতাহানি করছে পুরুষ যাত্রীরা। মঞ্জিতার হাত নিসপিস করে। ওই দুষ্ট লোকগুলিকে শায়েস্তা করতে চান তিনি। কিন্তু কীভাবে? তাঁর সেক্ষমতা যে নেই এখন। তিনি মনে মনে শপথ নেন, ভবিষ্যতে সমাজে নির্যাতিতা মহিলাদের সুরক্ষা দেবেন।

মঞ্জিতা বানজারা

স্কুলের পাঠ সাঙ্গ করে মঞ্জিতা ভরতি হলেন নিরমা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে প্রযুক্তিবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ। কিন্তু, মঞ্জিতা আরও পড়তে চান, জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়াতে চান। ফ্যাশন টেকনোলজিতে ভরতি হলেন। সেখান থেকেও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

একাধারে প্রযুক্তিবিদ ও ফ্যাশন ডিজাইনার। মঞ্জিতার চাকরি জুটে গেল দেশের এক খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইন হাউসে। ড্রেস ডিজাইনারের কাজ। মাস-মাইনেও লোভনীয়— দশ লক্ষ টাকা।

কিন্তু এত টাকা পেয়েও মন ভরছে না মঞ্জিতার। তাঁর জীবনের ব্রত যে সমাজের নির্যাতিতা মেয়েদের জন্য কিছু করা। এই চাকরিতে তা হচ্ছে কই? বরঞ্চ, চাকরি করতে গিয়ে আরও দেখেছে পথে-ঘাটে, বাসে, কর্মক্ষেত্রে সর্বত্র মহিলাদের নিগ্রহ। যৌন-পীড়ন।

মঞ্জিতা অস্থির হয়ে ওঠে। তাঁর মাথাটা ঝিমঝিম করে। না:, একটা উপায় বার করতেই হবে। কী উপায়! কী উপায়!

হ্যাঁ, পুলিশের চাকরি। পুলিশকর্তা হলেই তাঁর ইচ্ছাপূরণ হবে। সমাজে অপমানিত লাঞ্ছিত মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে পারবে।

দুম করে দশ লাখ টাকার চাকরিটা ছেড়ে দেয় মঞ্জিতা। পুলিশের বড়ো অফিসার হতে হবে। আইপিএস অফিসার।

শুরু করেন পরীক্ষার প্রস্তুতি। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করতেই হবে।

২০১১ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসলেন। কিন্তু সাফল্য এল না। কিন্তু দমবার পাত্রী নন মঞ্জিতা। আরও ভালো করে প্রস্তুতি নিতে হবে। আইপিএস অফিসার হতেই হবে যে!

২০১৩ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় মঞ্জিতার স্বপ্নপূরণ হল। পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ। সঙ্গে সঙ্গে আইপিএস পুলিশ অফিসার হয়ে গেলেন। যোগ দিলেন গুজরাত রাজ্য পুলিশের মহিলা বিভাগে। প্রথম মহিলা আইপিএস হিসেবে। পুলিশের সুরক্ষাসহায় প্রকল্পের দায়িত্বভার হাতে নিলেন।

মঞ্জিতা দেখলেন, গুজরাতে সালাওয়াদা জেলার চরণ নগরের প্রায় ৯০ শতাংশ মহিলাই পেটের তাগিদে মদের বোতল ও ছিপি ধোয়ার কাজে নিযুক্ত। মঞ্জিতা তাদের এই মদের কারখানার নিম্নস্তরের কাজ থেকে মুক্তি দিতে বদ্ধপরিকর হলেন।

যোগাযোগ করলেন, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির সঙ্গে। পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যরা মিলে মহিলাদের এই দুর্গতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেলেন। মঞ্জিতার সক্রিয় প্রয়াসে মদের বোতল সাফ করার কাজ থেকে মুক্তি পেল মহিলারা। তাদের অন্য শিল্প কারখানায় নিয়োগের ব্যবস্থা করলেন। আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পেলেন মহিলারা। মঞ্জিতার ব্রত সার্থক হল।

মহিলাদের সামাজিক মানোন্নয়ন চাই। এই লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন মঞ্জিতা। তিনি মনে করেন, চলার পথ এখনও অনেক বাকি।

মেয়েরাও যে পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়, সেদৃষ্টান্ত রাখলেন মঞ্জিতা।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%