অগ্নিকুমার আচার্য
ঈশ্বর তো সর্বত্র বিরাজমান। অরণ্যের কোনো পৃথক ঈশ্বর আছে নাকি?
না, অরণ্যের কোনো পৃথক ঈশ্বর নেই। তাহলে যে বলা হল— অরণ্যের ঈশ্বর?
অনেক সময় মানুষই ঈশ্বরের মতো মঙ্গলময় হয়ে ওঠেন। আমরা তো বলি— ঈশ্বর মঙ্গলময়। তাই যে মানুষ অন্যের মঙ্গল করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তিনি তো ঈশ্বরেরই তুল্য। তাই নয় কি?
এমনই একজন কল্যাণকারী মানুষকে বলা হয়েছে, অরণ্যের ঈশ্বর।
কে তিনি? কী মঙ্গল করেছেন মানুষের?
তাঁর নাম স্বপন দেববর্মা। বাড়ি অরণ্য ঘেরা ত্রিপুরায়। ত্রিপুরায় অনেক পাহাড়-জঙ্গল। একটা পাহাড়ের নাম আঠারমুড়া। এই পাহাড়েই বাস করেন স্বপন দেববর্মা।
খুবই গরিব এই অরণ্যের মানুষটি। রোজ সকালে বেরিয়ে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। বনে পাওয়া যায় ফলমূল, শাকসবজি। পাওয়া যায় শুকনো কাঠ। এসব কুড়িয়ে এনে, পথের ধারে বসে বিক্রি করেন। কিছু নিজেদের খাবার জন্যও রাখেন। শুকনো গাছের ডালপালা নিজেদের রান্নার কাজেও লাগে, বিক্রিও করা যায়। এই হল স্বপন দেববর্মার নিত্যদিনের কাজ। এভাবেই অভাব-অনটনে চলে তাঁর সংসার।

স্বপন দেববর্মা ও তার ছোটো মেয়ে
২০১৮-র ১৫ জুন।
স্বপন দেববর্মা সকালে বেরিয়েছেন বনের শাকসবজি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে। সঙ্গে তাঁর ৬ বছরের ছোটো কন্যা সোমাতি দেববর্মা।
পাহাড়ের ঢালেই চলে গেছে রেলপথ। স্বপনবাবু তাঁর মেয়ে-সহ বাড়ি থেকে নেমে এসেছেন রেলপথের ঠিক পাশে। রেলপথ পেরিয়ে ও-পাশের বনে যাবেন।
হঠাৎ তাঁর নজর গেল রেললাইনের দিকে। সব্বোনাশ! লাইনের নীচে যে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ফাঁকা। ধস নেমে মাটি সরে গেছে। রেললাইন ঝুলছে শূন্যে।
স্বপনবাবু জানেন, কিছুক্ষণ বাদেই বন পাহাড় কাঁপিয়ে চলে আসবে ট্রেন। আগরতলাগামী।
এখন উপায়! এখানে আসামাত্র যে ঘটবে ভয়ংকর দুঘর্টনা! কত যাত্রী যে হতাহত হবে ভেবে স্বপনের গা কাঁটা দিয়ে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্থির করেন রেলকে বঁাচাতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। নিজের গায়ের ছেঁড়া, ময়লা জামা গেঞ্জি খুলে ফেললেন। মেয়ে সোমাতিকেও বললেন, গায়ের জামাটা খুলে নিতে।
বাপ-বেটি দু-জনে করলেন কী, একটু এগিয়ে গিয়ে, জামা গেঞ্জি হাতে নিয়ে মাথার ওপর তুলে ঘোরাতে লাগলেন।
দূরে দেখা গেল দৈত্যের মতো ট্রেনটা ছুটে আসছে। ট্রেনের চালক দেখতে পেলেন এক যুবক আর একটা ছোট্ট মেয়ে জামাকাপড় হাতে নিয়ে মাথার ওপর ঘোরাচ্ছে? কেন? চালক ভাবলেন সামনে নিশ্চয়ই কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে। চালক ব্রেক কষলেন। ধীরে ধীরে ট্রেনের গতি কমতে থাকল। তারপর একটু দূরেই ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়ল। চালক, গার্ড ও যাত্রীরা ছুটে এলেন স্বপন দেববর্মার কাছে।
স্বপন বললেন, ওই যে দেখুন, লাইনের নীচে ধস নেমেছে। লাইন ঝুলছে।
সত্যিই তো! স্বপনবাবু ও মেয়ে সোমাতি বিপদ সংকেত না-দেখালে তো ভয়ংকর দুঘর্টনা ঘটত।

অরণ্যের ঈশ্বর স্বপন দেববর্মা
ট্রেনটিতে হাজার দুয়েক যাত্রী ছিল। সকলের প্রাণ বঁাচালেন স্বপন দেববর্মা। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির জোরে এক মারাত্মক দুঘর্টনার হাত থেকে রক্ষা পেল ট্রেনটি।
সবাই বলল, আপনি অরণ্যের ঈশ্বর। আপনার জন্যই আমরা আজ সাক্ষাৎ যমের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছি।
ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতায় যাত্রীরা ভরিয়ে দিলেন প্রাণরক্ষক বাবা ও মেয়েকে। রেলপথ সারাই করা হল। কয়েক ঘণ্টা বাদে আবার ধীরে ধীরে রেলগাড়ি পার হয়ে এল সারাই-করা স্থানটি দিয়ে।
পরদিন স্থানীয় সংবাদপত্রগুলিতে ফলাও করে ছাপা হল অরণ্যের ঈশ্বর স্বপন দেববর্মা ও তাঁর নাবালিকা কন্যা সোমাতির ট্রেন রক্ষার রোমাঞ্চকর কাহিনি।
সারারাজ্যের মানুষ অভিভূত। এভাবেই বোধহয় ঈশ্বর আসেন মানুষের বেশে মানুষকে রক্ষা করতে।
ত্রিপুরার রাজ্য সরকার, পাহাড়ি গরিব এই উপকারী মানুষটিকে রাজ্য বিধানসভায় আমন্ত্রণ করে এনে সংবর্ধিত করলেন, পুরস্কৃত করলেন। পরে এগিয়ে এলেন বেশ কিছু সামাজিক সংস্থা, সরকারি দপ্তর। অরণ্যের ঈশ্বরকে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য পুরস্কৃত ও সম্মানিত করলেন। তারপর সরকার দিলেন চাকরি।
আজ ত্রিপুরায় ‘অরণ্যের ঈশ্বর’ স্বপন দেববর্মাকে সবাই এক ডাকে চেনে।
মানুষের আসন্ন বিপদের সময় যিনি রক্ষাকর্তা হিসেবে পাশে এসে দাঁড়ালন, তিনি তো ঈশ্বরই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন