পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক

অগ্নিকুমার আচার্য

দুর্দমনীয় প্রয়াসই বটে।

৬৩ বছর বয়সে ২৫০০ কিমি পথ পেরোলেন পায়ে হেঁটে।

কে তিনি? কেনই-বা তাঁর এই পদযাত্রা?

সেই অসাধ্যসাধনের কাহিনিই বলছি শোনো।

নাম তাঁর প্যাট্রিক ব্যাডলে। ভারতীয় নন। ব্রিটিশ আইনজীবী।

ভারতের অসংখ্য পথশিশুদের অবস্থা সরেজমিনে দেখা ও এই অভাগাদের জন্য কিছু করাই ছিল তাঁর এই দুঃসাধ্য পদযাত্রার উদ্দেশ্য।

১৯৭৩ সালে প্রথমবার কলকাতায় আসেন প্যাট্রিক। তখনই তাঁর চোখে পড়ে কলকাতার অসংখ্য পথশিশু কী দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছে! তাঁর মন কেঁদে ওঠে। মনে মনে ঠিক করেন, এই অবাঞ্ছিতভাবে বেড়ে ওঠা শিশুদের যথাসাধ্য সাহায্য করবেন। তবে, এর জন্যে চাই প্রচুর অর্থ। দেশে ফিরে গেলেন প্যাট্রিক। অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। আইনের ব্যাবসাও চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ভোলেননি তিনি পথশিশুদের কথা।

এরই মধ্যে ২০১০ সালে তাঁর অতি আদরের একমাত্র কন্যাকে প্যাট্রিক হারিয়েছেন। বেদনায় তিনি কাতর হয়ে পড়লেন। একই সঙ্গে চোখে ভেসে উঠল তাঁর পথশিশুদের দুঃখ দুর্দশার চিত্র। তিনি স্থির করলেন, আর দেরি নয়। মেয়ের স্মৃতিকে বুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে পথশিশুদের দুঃখ দূর করতে।

প্যাট্রিক ব্যাডলে

প্যাট্রিক এলেন ভারতে। তিনি ঠিক করলেন পদযাত্রা করবেন। পায়ে হেঁটেই ঘুরবেন ভারতের বিভিন্ন নগরে বন্দরে বস্তিতে। পায়ে হেঁটে না-ঘুরলে যে পথশিশুদের কাছে পৌঁছোনো যাবে না।

প্যাট্রিক শুনেছেন, ভারতের অবিসংবাদিত স্বাধীনতা সংগ্রামের জননেতা মহাত্মা গান্ধীর কথা। তাঁর ডান্ডি অভিযানের কথা। কীভাবে সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে তিনি পরিক্রমা করেছেন। দেশবাসীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপন করেছেন।

প্যাট্রিক মহাত্মা গান্ধীর পথই অনুসরণ করলেন। শুরু হল তাঁর পদযাত্রা। একে একে চার-পাঁচটি রাজ্য পরিক্রমা করলেন। পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, ওড়িশা পাড়ি দিলেন। একদিকে পথশিশুদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন, অন্যদিকে চলল তাঁর অর্থসংগ্রহ। তহবিল গঠন। পদযাত্রার মধ্য দিয়ে ভারতকে আরও নিবিড়ভাবে জানলেন। পথশিশুদের দুঃখদুর্দশার কথা পৌঁছে দিলেন সহৃদয় ভারতবাসীদের কাছে।

ভোর ছ-টায় পদযাত্রার শুরু। অবিরাম প্রতিদিন একটানা ছ-ঘণ্টা হাঁটা। তারপর বিরতি। সপ্তাহে ছ-দিন চলল তাঁর পদযাত্রা। এই ৬৩ বছর বয়সে কী অদম্য অভিযান! সুদূর ইংল্যাণ্ড থেকে এসে ভারতের দুঃস্থ পথশিশুদের জন্য প্যাট্রিকের এই অসম্ভব পরিশ্রম দেখে ভারতবাসীরাও মুগ্ধ।

তাঁর পদযাত্রাকালে প্যাট্রিক উপলব্ধি করলেন ভারতবাসীরা বড়োই অতিথিপরায়ণ ও সহৃদয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যেখানেই গেছেন হোটেলে রেস্তোঁরার মালিকরা আদর করে তাঁকে খাইয়েছেন। কেউ কেউ কোনো পয়সাও নেননি। এমন আতিথেয়তার কথা তিনি জীবনেও ভুলবেন না।

অনেক বাইক আরোহী তাঁকে লিফট দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এভাবে ১৪৭ দিন ক্রমান্বয়ে পদযাত্রা করে ২৫০০ কিলোমিটার পথ তিনি অতিক্রম করলেন। কী অনমনীয় ইচ্ছাশক্তি!

পদযাত্রা করে প্যাট্রিক সংগ্রহ করেছেন দশ লক্ষ টাকা। কিন্তু আরও অর্থ চাই যে! কারণ তাঁর উদ্দেশ্য— কলকাতার পথশিশুদের কল্যাণে কর্মরত ‘ফিউচার হোপ’ নামক এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাতে অন্তত ১৫/২০ লক্ষ টাকা তুলে দেওয়া। তাই প্যাট্রিক সিদ্ধান্ত নিলেন বাকি টাকা নিজের দেশ থেকে সংগ্রহ করে অচিরেই আবার ভারতে ফিরে আসবেন এবং তাঁর সংগৃহীত সম্যক অর্থ পথশিশুদের উন্নয়নের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাতে তুলে দেবেন।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%