সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি

অগ্নিকুমার আচার্য

সাপ! ওরে বাপরে! নাম শুনলেই ভয়ে গায়ে কাঁটা দেয়। তাই সাপ দেখলেই লাঠিসাঁেটা নিয়ে সব্বাই বেরিয়ে পড়ে। সাপকে মেরে তবে শান্তি! সাপ যে ভয়ংকর প্রাণী!

কিন্তু সাপ দেখলেই কি মেরে ফেলা উচিত! পরিবেশবিদরা বা যাঁরা বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য আন্দোলন করেন— তাঁরা বলেন, সাপও বন্যপ্রাণী। সাপকে মারা অন্যায়। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হয়।

জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক দীনবন্ধু বিশ্বাস। ক্লাসে ছাত্রদের বলেন, কখনো সাপকে মারবে না। মারা উচিত নয়।

স্যারের কথা খুব মন দিয়ে শোনে হাফিজুল। দীনবন্ধুবাবুর ছাত্র। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার অজয়পুর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে পড়ে হাফিজুল। দীনবন্ধুবাবুর কথা সেমনে গেঁথে রাখে।

ডিম ফুটিয়ে সাপ সংরক্ষণ

মাস কয়েক পরের ঘটনা। একদিন হাফিজুল দেখে কী, একটা মা-সাপ কুন্ডলী পাকিয়ে বসে অনেকগুলি ডিমকে তা দিচ্ছে। সাপটি ডিম পেড়েছিল হাফিজুলদের খড়ের গাদায়। বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে। হাফিজুল এসে মাকে বলে ঘটনাটা।

কথাটা চাউর হয়ে যায় গাঁয়ে। আর যায় কোথা? গাঁয়ের লোকজন লাঠিসাঁেটা নিয়ে হাজির! ডিমসুদ্ধু সাপটাকে এখনই খতম করতে হবে।

হাফিজুল বাধা দেয়। কিছুতেই ডিমগুলি নষ্ট হতে দেবে না সে। স্যার যে বলে দিয়েছেন, বন্যপ্রাণী মারতে নেই!

— আরে! ছোঁড়া বলে কী? ডিমগুলি ফুটে সাপে কিলবিল করবে। সারা গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়বে! কতজনকে কাটবে জানিস তুই!

— দোহাই তোমাদের! আমি স্যারকে ডেকে আনছি গে। তারপর তোমরা যা-খুশি করো— হাফিজুল কাতর প্রার্থনা জানায়।

— ঠিক আছে। যা, এত করে যখন বলছিস! মাস্টারমশাইকে ডেকে আন গে! দেখি তোর মাস্টার কী বলেন! গাঁয়ের জমায়েত থেকে কেউ একজন বলে।

এক দৌড়ে দীনবন্ধু স্যারের বাড়ি। হাফিজুল সব ঘটনা স্যারকে জানায়। সঙ্গে সঙ্গে হাফিজুলকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন মাস্টারমশাই। যেখানে সাপ মারার জন্য লোকজন প্রস্তুত হয়ে আছে।

মাস্টারমশাই উপস্থিত লোকজনদের বলেন, ‘একটা মাকে আপনারা মেরে ফেলবেন? কেন? এই মা-সাপটি কি আপনাদের কোনো ক্ষতি করেছে?’

— বলেন কী মশাই! এখন ক্ষতি করছে না, তবে ডিমগুলি ফুটে বাচ্চা-সাপ বেরোলে ছেড়ে দেবে আমাদের? একজন গ্রামবাসী বলে ওঠে।

মাস্টারমশাই শান্তকন্ঠে বলেন, ‘শুনুন, আপনারা হয়তো জানেন না, বন্যপ্রাণী আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই বন্যপ্রাণী হত্যা করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। আমি ডিমগুলি জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছি। দেখবেন মা-সাপও তখন জঙ্গলে চলে যাবে।’

মাস্টারমশাইয়ের দৃঢ়তা দেখে গাঁয়ের মানুষরা আর কথা বাড়াল না। দীনবন্ধু স্যার খুব সযত্নে একটা একটা করে সবগুলি ডিম নিয়ে চলে গেলেন। তারপর, বাড়িতে একটা পিচবোর্ডের বড়ো বাক্সে খড়বিচালি পেতে, ডিমগুলিকে লুকিয়ে রাখলেন।

একে একে কেটে গেল বাহান্নটি দিন। তিপ্পান্ন দিনে দীনবন্ধুবাবুর চোখ আনন্দে উজ্জ্বল। একের পর এক ডিম ফুটে ছোটো ছোটো সাপের ছানা বেরিয়ে এসেছে। দীনবন্ধুবাবুর খুশি আর ধরে না। তিনি সোজা এসে হাজির হলেন বীরভূমের জেলা বন-আধিকারিকের অফিসে। সব বৃত্তান্ত খুলে বললেন। বনদপ্তরের কর্মীরা অজয়পুরে দীনবন্ধু মাস্টারের বাড়িতে এলেন। সাপের ছানাগুলিকে তুলে নিয়ে গেলেন। তারপর কাছাকাছি কোনো জলাশয়ে বাচ্চাগুলিকে ছেড়ে দিলেন।

বনবিভাগের অধিকর্তা হরিকৃষ্ণাণবাবুর কানে কথাটা গেল। তিনি মাস্টারমশাইয়ের কাজের খুব প্রশংসা করলেন। তিনি বললেন, সাপ দেখলেই মানুষ যেমন লাঠিসাঁেটা নিয়ে মারতে ছুটে আসে, সেখানে মাস্টারমশাই সাপের ডিম ফুটিয়ে বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করার যে দৃষ্টান্ত রাখলেন তার তুলনা নেই।

দীনবন্ধুবাবু শুধু বন্যপ্রাণী দরদিই ছিলেন না, তিনি ক্লাসে ছাত্রদের বলতেন, সাপে কাটলে কখনো ওঝার কাছে যেতে নেই। ওঝারা ঝাড়ফুঁক করে কখনো সাপে-কাটা রোগীকে বঁাচাতে পারে না। সাপে কাটলে হাসপাতালে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। ওঝার শরণাপন্ন হয়ে কত সাপে-কাটা রোগী যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তার লেখাজোখা নেই।

একদিন হয়েছিল কী, হাফিজুলের বাবাকেই সাপে কেটেছিল। গ্রামের লোকেরা পরামর্শ দিল ওঝা ডেকে আনতে। কিন্তু হাফিজুলের মনে পড়ল স্যারের কথা। গ্রামের কারও কথায় কান না-দিয়ে সেবাবাকে নিয়ে চলে এল সিউড়ি হাসপাতালে। বাবা বেঁচে গেলেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

তাই বলি, আসলে, সাপে-কাটা রোগীদের ওঝার কাছে চিকিৎসা করানো মানুষের একটা অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার। ওঝারা কোনোদিন বিষাক্ত সাপে-কাটা রোগীকে বঁাচাতে পারে না। এজন্য এখনও গ্রামেগঞ্জে বহু মানুষ প্রাণ হারায়।

হাফিজুল, স্যারের কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিল বলে তার বাবাকে ফিরে পেয়েছিল। তাই সকলেরই জেনে রাখা দরকার, সাপে কাটলেই রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ওঝা ডাকলে রোগীর নির্ঘাত মৃত্যু!

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%