অগ্নিকুমার আচার্য
ভয়ংকর দুঘর্টনা।
২০১৮র ৫ জনের বিকাল।
রাজপথে পড়ে একজন মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। কালো পিচের রাস্তায় লাল রক্তের ধারা এপাশ থেকে ওপাশে গড়িয়ে যাচ্ছে। মাঝবয়সি ভদ্রলোক হেঁটে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একটা গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে এসে ভদ্রলোককে ধাক্কা মেরে ছুটে পালিয়ে যায়।
মাথায় দারুণ চোট লেগেছে। শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।
ঘটনা আগরতলা শহরের ‘সোনার তরী’ সরকারি অতিথিশালার লাগোয়া। তখন অফিস ছুটির বিকাল। ব্যস্ততম রাজপথ।
দেখতে দেখতে ভিড় জমে গেল।
কেউ বলছেন, ‘আহা লোকটা বোধহয় আর বঁাচবে না। কেউ-বা একটু উঁকি মেরে ‘আহা’ ‘হু হু’ করে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু কেউ যে একটু ভদ্রলোককে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন— এমন কোনো উদ্যোগ নেই।
রাস্তা দিয়ে গাড়ির পর গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না।
কী অদ্ভুত মানসিকতা! ভিড় জমানো লোকগুলো যেন তামাসা দেখছে।
ওদিকে হতভাগ্যের শরীর থেকে রক্তের ধারা বেয়েই চলেছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর প্রাণবায়ু নি:শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না। সবাই মোবাইলে ছবি তুলতে ব্যস্ত। এমনই অমানবিক কান্ড!

দুর্ঘটনা
একটু বাদেই একটা বাইক এসে থামল ঘটনাস্থলে। দু-জন মানুষ তড়িঘড়ি বাইক থেকে নামলেন। তারপর উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বললেন, আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আহা-হা করছেন। কেউ একটু এগিয়ে রক্তাক্ত মানুষটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলেন না? আশ্চর্য!
মানুষ দু-জন ছিলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক। কলেজ থেকে ফিরছিলেন। একজন— অর্জুন দে। অন্যজন তাঁর অধ্যাপক বন্ধু!
দেরি না-করে চটপট দু-জনে মিলে পকেট থেকে রুমাল বের করে রক্ত মোছাতে লাগলেন। তারপর মারাত্মক আহত লোকটিকে হাসপাতালে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলেন। রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, অটো যাচ্ছে।
অর্জুনবাবু গাড়ি-অটো থামিয়ে মৃতপ্রায় লোকটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্যে কাতর অনুরোধ করলেন।
কিন্তু কেউ কর্ণপাত না করে ছুটে বেরিয়ে গেল। কী নিষ্ঠুর গাড়ির চালকগুলি!
হঠাৎ আধাসেনাবাহিনীর একটি বড়ো গাড়ি এল। অর্জুনবাবু হাত দেখিয়ে গাড়িটিকে থামালেন। দু-তিনজন জওয়ান গাড়ি থেকে ঝটপট নামলেন।
কিন্তু এত বড়ো গাড়ি তো হাসপাতাল চত্বরে যেতে পারবে না। অর্জুনবাবু ওঁদের অনুরোধ করলেন অন্তত একটি অটো থামিয়ে দিতে।
জওয়ানরা একটা অটো থামিয়ে বললেন আহতকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। অটোচালক অগত্যা আর না-করতে পারলেন না।
অর্জুনবাবু ও তাঁর বন্ধু মিলে সংজ্ঞাহীন ব্যক্তিটিকে অটোতে তুলে কাছেই জিবি হাসপাতালে এলেন। সোজাসুজি ট্রমা সেন্টারে ভরতি করালেন ভয়ংকর ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লোকটিকে।
সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু হল। কিছুক্ষণের মধ্যে রোগীর জ্ঞান ফিরল।
অর্জুনবাবুরা কিছুক্ষণ থেকে, তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন।
অর্জুনবাবু ও তাঁর বন্ধু যে মানবিক দৃষ্টান্ত রাখলেন, তা যদি ভিড় জমানো লোকগুলির মধ্যে থাকত, তবে দুঘর্টনাগ্রস্ত লোকটির এত রক্তপাত হত না।
অর্জুনবাবুরা প্রমাণ রাখলেন—‘মানুষ মানুষেরই জন্য’।
ঘটনাটি ঘটেছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন