অগ্নিকুমার আচার্য
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী! হ্যাঁ, অনেকটাই তাই।
জোসুয়া বসকো। বয়েস মাত্র এগারো। ক্লাশ ফাইভে পড়ে।
টিভি— না! মোবাইল ফোন— না! কম্পিউটার— না। কোনো কিছুতে মন নেই জোসুয়ার। অন্য ছেলে-মেয়েদের মতো নয় সে।
কেবল একটা নেশা ওর। পাখির ছবি তোলা। পাখিকে বড়ো ভালোবাসে জোসুয়া। পাখির ডাক শুনলেই হল। ছুটে যাবে জোসুয়া। তার ছোট্ট ক্যামেরাতে বন্দি করে রাখবে পাখিটাকে।
শুনে তোমাদের চোখ কপালে উঠবে! তখন তার বয়েস কত জানো? মাত্র চার। এই চার বছর বয়স থেকেই পাখির ছবি তোলার নেশায় পেয়েছিল জোসুয়াকে। পাখির খোঁজে বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা। হাতে ক্যামেরা। চোখ গাছগাছালিতে। কখনো-বা ঘরের জানলা দিয়ে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে সে। কী খুশি! লাল রঙের বুলবুল। রঙিন কপার স্মিথ বার্বেট। আহাহা চোখ জুড়িয়ে যায়! মন ভরে যায় ওদের বিচিত্র ডাক শুনে। চঞ্চল হয়ে ওঠে জোসুয়া। ছুটে যায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে। ওরা কীভাবে ডানা মেলে উড়ে যায়। কীভাবে খাবার খায়। কীভাবে বাচ্চাদের মুখে খাবার জোগায়। পাখি ধ্যান। পাখি জ্ঞান।

জোসুয়া বসকো
জোসুয়ার এই দারুণ পাখি প্রেমের কথা ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল। মা শিল্পা বসকো ছেলেকে উৎসাহ দেন। কাকাও ভাইপোকে প্রেরণা দেন। ছোট্ট ক্যামেরাটি জোসুয়ার হাতে তুলে দেন। বলেন, ‘পাখিগুলির ছবি তুলে রাখ। আমরা দেখতে পারব। যারা পাখি ভালোবাসে সবাই দেখতে পাবে।’ জোসুয়ার উৎসাহ বেড়ে যায়।
তোমরা জেনে অবাক হবে— মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই জোসুয়া ‘প্যান ইন্ডিয়া ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চ অর্গানাইজেশন’-এর সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হয়ে যায়।
জোসুয়া কি বলে শোনা যাক।
সেবলে, ‘ছোটোবেলা থেকেই নানা পাখির ডাক শুনতাম। খুব ভালো লাগত। কিচিরমিচির তো নয়! যেন মিষ্টি গান। ঘরে বসে তো আর সব পাখিকে দেখতে পেতাম না! তাই ছুটে ঘরের বাইরে আর গাছে গাছে তাকানো। পাখির ডাকে যে এত নেশা, এত আকর্ষণ, তা শৈশবেই মনকে কেমন পাগল করে তুলত!’
২০১৫ সাল। জোসুয়ার বয়েস সাত। প্লেনে চড়ে জামসেদপুর যাচ্ছে কাকার হাত ধরে। ওখানে নানা ধরনের কত পাখি! জোসুয়া আনন্দে অধীর! কত নাম-না-জানা পাখি! কত বিচিত্র কলকাকলি! জোসুয়া কাকার সঙ্গে পথে-প্রান্তরে, বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় আর পাখিদের ছবি ক্যামেরায় ধরে রাখে। শুধু কি ছবি তোলা? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা আর নোট বইয়ে সব টুকে নেওয়া। ধীরে ধীরে তার ‘বার্ড-বুক’টি হয়ে উঠতে থাকে এক অমূল্য সম্পদ। রকমারি পাখির ছবি, তাদের শরীরের খুঁটিনাটি বর্ণনা, বাসা তৈরি, খাদ্যসংগ্রহ, সন্তান পালন, আত্মরক্ষার উপায়— কী নেই সেই বইয়ে। কাকাও নানা তথ্য দিয়ে ভাইপোকে সহায়তা করেন।
স্কুলে যখন ছুটি পড়ে— সঙ্গে সঙ্গে কাকাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে জোসুয়া। দেশের নানা অভয়ারণ্যে, পাখিরালয়ে, বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় সে। লক্ষ্য তার একই। পাখির ছবি তোলা। পাখির সুলুকসন্ধান করা। সেএক মাতাল করা নেশা। লেকে, বড়ো জলাশয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে পরিযায়ী পাখিরা উড়ে এসে জুড়ে বসে কিছুদিনের জন্যে। জোসুয়া ছুটে যায় সেসব জলাশয়ের ধারে।
মুম্বাই শহরের চেম্বুর এলাকায় বাড়ি জোসুয়ার। মাত্র এগারো বছর বয়সেই সেহয়ে উঠেছে পক্ষী বিশারদ। বর্তমানে সেমুম্বাই ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির খুদে সদস্য। ভাবা যায়!
কত সংখ্যক পাখির ছবি তার সংগ্রহে জানো? পঁচাত্তর রকমের। সংখ্যাটা বাড়তেই থাকবে।
সহপাঠীরা ছেঁকে ধরে জোসুয়াকে। সব পাখির ছবি দেখাতে হবে তাদের। খুশি স্কুলের মাস্টারমশাইরা। অধ্যক্ষ প্রবীণ শেখ উৎসাহ দেন জোসুয়াকে। কারণ, প্রকৃতি ও প্রাণীজগৎ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। ছাত্রজীবন থেকে যদি প্রকৃতিকে ভালোবাসা যায়, বন্যপ্রাণীকে ভালোবাসা যায় তাহলে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। পরিবেশ দূষণের হাত থেকে আমরা বেঁচে যাব।
এগারো বছরের জোসুয়া আমাদের সেই পথই দেখিয়েছে। ধন্য জোসুয়া! ধন্য তোমার পক্ষীবিজ্ঞানী হয়ে ওঠা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন