দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম

অগ্নিকুমার আচার্য

সাংঘাতিক রোগ অর্থোপ্রায়পোসিস।

রোগের পুরো নাম অর্থোপ্রায়পোসিস মাল্টিপ্লেক্স কনজাংটিয়া। এই ভয়ংকর রোগের কবলে যে পড়ে, তার জীবনে বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন।

কেন, কী হয় এই রোগে?

এই রোগে সারাশরীর অবশ হয়ে যায়। হাত-পা নাড়াচাড়া করার ক্ষমতা থাকে না। হাঁটাচলা করতে পারা যায় না। অসাড় হয় সারা দেহ।

শুধু মস্তিষ্কটি থাকে সচল-সক্রিয়।

এই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিন দে।

পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুরের ছেলে তুহিন।

জন্ম ১৯৯৯ সালে। আর জন্ম থেকেই শিকার অর্থোপ্রায়সিসের।

বাবা সমীরণ দে প্রমোটারি ব্যাবসায়ী। মা সুজাতা দেবী কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে।

একমাত্র সন্তান।

তুহিন দে

তাই চিকিৎসার ত্রুটি রাখেননি বাবা-মা। দেশের বড়ো বড়ো শহরের নামী-দামি চিকিৎসকের কাছে ছুটে গেছেন বাবা-মা, আদরের সন্তান তুহিনকে নিয়ে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কিন্তু তুহিন দমবার পাত্র নয়। না-নড়ুক হাত-পা। মাথাটা তো ঠিক কাজ করছে। বই পড়তে, পড়াশুনো করতে তো কোনো বাধা নেই।

কিন্তু হাত নড়ে না। লিখবে কেমন করে?

তুহিন বলে— ‘কেন মুখ তো সচল। মুখে কলম গুঁজে লিখব!’

মুখে কলম গুঁজে লেখা! এও কি সম্ভব?

হ্যাঁ সম্ভব। তুহিন তাই করতে লাগল।

শুরু হল তুহিনের অসাধারণ সংগ্রাম। সেপড়াশুনো করবে। পরীক্ষা দেবে। স্বপ্ন তার, আইআইটি-তে পড়বে।

মা-বাবা ধরাধরি করে চেয়ারে বসিয়ে দেন। সামনের টেবিলে বইখাতা। সারাদিন কাটে বইখাতা নিয়ে।

দেখতে দেখতে মাধ্যমিক পরীক্ষা চলে এল। তুহিন মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবে।

প্রতিবন্ধীদের আলাদা কিছু সুযোগসুবিধা দেয় মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। যেমন, পৃথক লেখক, অতিরিক্ত সময় ইত্যাদি।

কিন্তু তুহিন কোনো বাড়তি সহায়তা নিতে রাজি নয়। মুখ দিয়ে লিখেই সেপরীক্ষা দেবে। বাড়তি সময়ও তার চাই নে।

কী আত্মবিশ্বাস! কী অসাধারণ মনের জোর!

মাধ্যমিক পরীক্ষা তার খুব ভালো হয়েছে।

তুহিন খুবই আত্মবিশ্বাসী। মাধ্যমিকের রেজাল্ট অবশ্যই ভালো হবে। তাই, এখন থেকেই উচ্চ-মাধ্যমিকের পড়াশুনো শুরু করে দিয়েছে। সঙ্গে আইআইটি-র বইপত্তরও নাড়াচাড়া। লক্ষ্যে তাঁর পৌঁছোতেই হবে।

বাবা-মার সঙ্গে তুহিন

ডাক্তারবাবুরা চেষ্টার কসুর করেননি। কুড়িবার তুহিনের শরীরে অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের চিকিৎসক যশ গুলাতিও তুহিনের চিকিৎসা করেছেন। কিন্তু তুহিনের শরীর যে-কে সেই।

তুহিনের জেদ। মাথাটা সম্বল করেই সেআইআইটি-র দুয়ারে পৌঁছে যাবে।

এমন ছেলেকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে রাজস্থানের কোটার এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিনে পয়সায় পড়াশুনোর যাবতীয় ব্যবস্থা করে তুহিনের। এর মধ্যে দু-দু-টি পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছে তুহিন।

২০১২ সালে ‘জাতীয় বাল সম্মান’।

তারপরের বছরই ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে সেনিয়েছে— ‘উৎকর্ষ শিশু সম্মান’।

তুহিন দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে চলেছে।

৩৬ বছর বয়সি মা সুজাতা দেবী আর কোনো সন্তান চান না। তুহিনকে বড়ো করে তোলাই মায়ের জীবনের একমাত্র স্বপ্ন।

মাধ্যমিকের ফল এখনও বেরোয়নি। কিন্তু উচ্চ-মাধ্যমিকের কোর্স শেষ করে ফেলেছে তুহিন।

স্টিফেন হকিন্স তার প্রেরণা। তার আদর্শ। তার স্বপ্নের নায়ক।

সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%