অগ্নিকুমার আচার্য
বয়স তাঁর ৬৫। হাতে ভিক্ষার ঝুলি কেন?
অনাথ শিশু— যারা লেখাপড়া করার সুযোগ পায় না তাদের শিক্ষার জন্য।
কী নাম তাঁর? কী করেন তিনি?
নাম তাঁর গাজি জালাল উদ্দিন। বর্তমানে, পেশায় কলকাতার একজন ট্যাক্সি চালক।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক গাজি পরিবারে জন্ম তাঁর। খুবই গরিব পরিবার। লেখাপড়া করাবার কোনো সুযোগ ছিল না গাজির অভিভাবকদের। কিন্তু জালাউদ্দিনের পড়ার খুব ইচ্ছে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও সবসময় উপায় হয় না। কোনোক্রমে ক্লাশ টু পর্যন্ত পড়েই ইতি। বাল্যেই লেগে পড়তে হল অর্থোপার্জনে। বয়েস তখন তার মাত্র সাত।
চলে এলেন কলকাতায়। শুনেছেন, বড়ো শহরে শিশুশ্রমিকদেরও কাজ জুটে যায়। থাকার জন্য ঘরবাড়ি না থাকলেও ফুটপাতে থাকা যায়।
প্রথমে গাজি হাতে নিল ভিক্ষাপাত্র। শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা মাগা। শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে মৌলালি, এন্টালি ইত্যাদি স্থানে ভিক্ষা করেই চলল গাজির জীবন। তবে ভিক্ষাবৃত্তি গাজির অপছন্দ। গায়ে খেটে কাজ করা ঢের ভালো। যেমন ভাবা, তেমনি গাজি ছেড়ে দিলেন ভিক্ষাবৃত্তি। এখন কী করবেন?

গাজি জালাল উদ্দিন
একটা চায়ের দোকানে ‘বয়’-এর কাজ নিলেন। তারপর চায়ের দোকান ছেড়ে যোগ দিলেন হোটেল বয়-এর কাজে। খাওয়া ফ্রি। দুটো পয়সাও জমানো যায়।
পয়সা জমিয়ে জমিয়ে এবার একটা রিকশা কিনে নিলেন গাজি। এবার স্বাধীন কাজ। রিকশা চালানো।
কৈশোরে চলল একটানা রিকশা চালানোর কাজ। কিন্তু লক্ষ্য তাঁর ট্যাক্সির দিকে। ট্যাক্সি চালাতে পারলে পয়সা বেশি আসবে। বেশ দু-পয়সা আয় হবে। রিকশা চালিয়ে মোটামুটি ভালোই টাকা জমিয়েছে সে। হয়তো একটা সেকেণ্ড-হ্যাণ্ড ট্যাক্সি কিনেও ফেলতে পারবে। কিন্তু ট্যাক্সি কিনলেই তো হবে না, ট্যাক্সি চালানো তো জানতে হবে!
গাজি রিকশা ছেড়ে, যোগ দিল ট্যাক্সির হেল্পার-এর কাজে। কলকাতা শহরে এ কাজ সহজেই জুটে গেল। হেল্পার-এর কাজ করতে করতে ট্যাক্সি চালানোও কিছুদিনের মধ্যে শিখে নিলেন।
এবার আর অন্যের গাড়ির হেল্পার নয়। নিজেই ট্যাক্সি কিনে নিজের গাড়ি নিজে চালাবেন।
কেনা হয়ে গেল একটা ট্যাক্সি। এবার গাজি নিজের গাড়ির ট্যাক্সি ড্রাইভার। আয়ও জমে উঠল। যখন একটা বাড়ি করার মতো টাকা জমল, তখন গাজি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের উত্তর ঠাকুরচকে জমি কিনে দু-কামরার একটা বাড়িও বানিয়ে ফেললেন। গাজি এখন গাড়ি-বাড়ির মালিক।
যেন এক রূপকথার গল্প!
কিন্তু গাড়ি-বাড়ি হলে কি হবে? গাজি মনে মনে বয়ে বেড়াচ্ছে একটা গভীর বেদনা।
কীসের বেদনা?
ছোটোবেলায় লেখাপড়া না-করতে পারার বেদনা। তা ছাড়া রোজ গাজি দেখেন অসংখ্য অনাথ শিশু, তাঁরই ছোটোবেলার মতো, ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। গাজির মনের বেদনা গভীরতর হয়।
তিনি স্থির করেন— স্কুল খুলবেন। অনাথ শিশুদের পড়ার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু অনেক টাকা যে চাই।
গাজি আবার ভিক্ষাপাত্র নিলেন হাতে। গাড়ি চালান, আর পথচারী বাবুদের কাছে ভিক্ষা মাগেন। বলেন, অনাথদের জন্য স্কুল খুলবেন। কেউ বলে, লোকটা পাগল। ভিক্ষে করে স্কুল খুলবে? মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। আবার সমাজে সহৃদয় লোকেরও তো অভাব নেই। তাঁরা বিমুখ করেন না গাজিকে। কাঠফাটা রোদেও ভিক্ষাপাত্র হাতে ঘোরেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধ।
গাজির স্বপ্ন এবার সার্থক হতে চলল। প্রথমে নিজের বাড়িতেই খুললেন পাঠশালা। পাড়ার গুটিকয় অনাথ ছাত্রদের নিয়ে। রেখে দিলেন একজন মাস্টার।
নতুন পথ চলা শুরু হল গাজির। দীর্ঘকালের স্বপ্নপূরণের পথ। নিজের জীবনে লেখাপড়ার কোনো সুযোগ মেলেনি। তাই গাজির স্বপ্ন অনেক বড়ো। আরও স্কুল স্থাপন করতে হবে। আরও অর্থ চাই। তাই ভিক্ষে আর ড্রাইভারির টাকা জমতে লাগল।
এবং সঙ্গে চলল একের পর এক স্কুল স্থাপন।
ক-টি স্কুল গাজি স্থাপন করলেন জানো? অবাক হবে! তিন-তিনটে স্কুল পরপর খুলে ফেললেন।
একটা স্কুলের নাম— ইসমাইল ইসরাফিল ফ্রি প্রাইমারি স্কুল। এই স্কুলের ছাত্রসংখ্যাও কিন্তু কম নয়— ২০০। আরও দুটো স্কুল খুলেছেন তিনি সুন্দরবন অঞ্চলে। ‘সুন্দরবন শিক্ষায়তন মিশন’। এই স্কুলেও ২০০ ছাত্র এখন পড়াশুনো করছে। আর তৃতীয়টি হল— ‘সুন্দরবন অরফানেজ মিশন’। এখানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ২৫।
গাজি দেখেছিলেন সুন্দরবন অঞ্চলের শিশুরা বড়োই অবহেলিত। লেখাপড়ার বিশেষ সুযোগ নেই এই অঞ্চলে। গাজি তাই তাঁর স্বপ্নপূরণের জন্য বেছে নিয়েছেন সুন্দরবন অঞ্চলকে। বর্তমানে তিনটি স্কুলই ‘সুন্দরবন অরফ্যানেজ অ্যাণ্ড সোস্যাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর আওতাভুক্ত।
যদিও সরকারি স্তরে এখনও স্কুলগুলির অনুমোদন পাওয়া যায়নি, গাজির আশা অচিরেই সরকারি স্বীকৃতি মিলে যাবে। ততদিন ভিক্ষেও চলবে। স্কুল চালাবার খরচ তো আর কম নয়!
গাজি সাহেব যে ট্যাক্সিটি চালান, তার গায়ে লিখে রেখেছেন—‘এই ট্যাক্সির পুরো আয় সুন্দরবনের গরিব, অনাথ শিশুদের শিক্ষার জন্য ব্যয়িত হবে।’
শুধু লেখাপড়া নয়, গাজি সাহেব শিশুদের জন্যে মিড-ডে মিলেরও বন্দোবস্ত করেছেন। গাজি সাহেবের স্কুলে পড়া জনা পাঁচেক ছাত্র প্রতিবছর মাধ্যমিক পরীক্ষাও দিচ্ছে।
গাজির কী আনন্দ! কী তৃপ্তি!
যে মানুষটি একদিন নিজের বঁাচার জন্য ভিক্ষা করেছেন, চায়ের দোকানে কাজ করেছেন, রিকশা টেনেছেন, আজও সেই মানুষটি ভিক্ষে করে চলেছেন, তবে নিজের জন্য নয়, গরিব ও অনাথ শিশুদের শিক্ষার জন্য।
এ যেন এক রূপকথার গল্প! তাই না?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন