অগ্নিকুমার আচার্য
অটিজম!
নামটা শুনলেই যে মনটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। কেন?
শিশুদের ভয়ংকর জটিল রোগ অটিজম। মানসিক রোগ।
মাত্র দেড় বছর বয়সে রোগের লক্ষণ ফুটে ওঠে। মানসিক বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে শিশু। একাকিত্ব এসে গ্রাস করে। কিছু বোঝে না, বোঝাতেও পারে না। হাসি-কান্না জানে না। ঘর-বাইরের তফাত বোঝে না।
নাম তার স্পন্দন। মা-বাবা আদর করে নাম রেখেছেন। মানসিক স্পন্দনহীন অটিজমে আক্রান্ত।
এ যে ভয়ংকর রোগ!
শৈশবে শুরু। চলে সারাজীবন।
এ ছেলেকে কীভাবে চেতনাসম্পন্ন করবেন! ডাক্তারদের দোরে দোরে হত্যে দেন। কিন্তু আশার আলো দেখান না চিকিৎসকেরা। বলেন, ‘এ ছেলে অটিজমের শিকার। এর কিচ্ছু হবে না। পড়াশুনো তো দূরের কথা। ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারবে না। খিদে তৃষ্ণাও বোঝাতে পারবে না।
ভেঙে পড়েন না মা-বাবা। মনোবিদের কাছে যাবেন। যাঁরা মানসিক রোগের চিকিৎসা করেন।
একদিন তাঁরা এসে দেখা করেন একজন বিশিষ্ট স্নায়ু-মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। একটু আশার আলো দেখতে পেলেন মা-বাবা। ডাক্তারবাবু বলেন, ‘হতাশ হবেন না। অনেক বেশি যত্ন নিতে হবে। এর পেছনে অনেক বেশি খাটুনি দিতে হবে কম বয়স থেকেই বাড়ির সবাই মিলে। দেখবেন পড়াশুনো করতে পারবে। গান-বাজনাও করতে পারবে। ছবি আঁকতে পারবে। কিন্তু আপনাদের চাই ধৈর্য, যত্ন, পরিশ্রম। বিশেষ করে মায়ের। মা-ই পারেন অটিজমে আক্রান্ত শিশুর চেতনা ফিরিয়ে আনতে।’
মা আশায় বুক বঁাধেন। স্পন্দনের নাম তিনি সার্থক করবেন। শুরু হল ছেলেকে নিয়ে মায়ের লড়াই। সারাক্ষণ ছেলেকে নিয়ে পড়ে থাকেন মা। প্রশিক্ষণ দেন দিনরাত। একটু একটু করে যেন চেতনা ফিরছে স্পন্দনের। মা উৎসাহিত হন। ছবির বই এনে দেন। অক্ষর শেখানোর জন্য উঠে-পড়ে লাগেন।
মা রুবি মাইতির ইচ্ছে ছেলে স্কুলে ভরতি হোক। বাবা বেণুপদ মাইতি স্কুলে স্কুলে ঘুরেছেন। কিন্তু অটিজমের নাম শুনেই পত্রপাঠ বিদায়। মুষড়ে পড়েন বাবা-মা।
শেষটায় স্পন্দনের ভাগ্য খুলল। নদিয়ার কল্যাণীর স্প্রিংডেল হাই স্কুলে ভরতি হল সেস্কুলের এক শিক্ষিকার চেষ্টায়।
কিন্তু কীভাবে স্কুলের পড়া শিখবে স্পন্দন। সেতো পড়তে জানে না। মনোরোগের ডাক্তার বলেছিলেন, অটিজমের রোগীকে পড়ানো যেতে পারে। তবে পড়া শেখানোর জন্য অনেকটা সময় দিতে হবে। অন্তত ছ-টি শিশুকে পড়াতে যতটা সময় লাগবে, ঠিক ততটা সময় লাগবে স্পন্দনের পড়া তৈরির জন্যে।
মা উঠে-পড়ে লেগে পড়েন। আগে নিজে ভালো করে কয়েকবার পড়াটা বুঝে নেন। তারপর গল্প বলার ঢঙে ছেলেকে শোনান। স্পন্দন মায়ের কাছে বসে বসে পড়া শোনে। এভাবে পড়া মুখস্থ করে সে। স্কুলে যায় বাসে চড়ে। মা তার নিত্যসঙ্গী।
বাইরের জগৎটা স্পন্দনের অপরিচিত। কারণ ছোটোবেলায় পড়ার সময়টুকু বাদে বাকি সময় ঘরে তালা মেরে রেখে দেওয়া হত। কখন যে কোথায় চলে যায় কে জানে।
এভাবেই দিন কাটে স্পন্দনের। মা-র কাছে শুনে শুনে পড়া মুখস্থ করা, স্কুলে যাওয়া। পরীক্ষায়ও ভালো ফল করে উঁচু ক্লাশে ওঠা। এভাবে মাধ্যমিকের গন্ডিও পেরিয়ে গেল একদিন।
তারপর ২০১৮-র উচ্চ-মাধ্যমিক। স্পন্দন দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করল। অটিজমে শৈশব থেকে আক্রান্ত শিশুর অভাবনীয় সাফল্য। মা-বাবা, স্কুলের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সবাই দারুণ খুশি!
মা-বাবার উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। রবীন্দ্রভারতীতে ভরতি করাবেন ছেলেকে। ফর্ম জমা দিয়েছেন।
ধীরে ধীরে কারাগারের দরজা এক-এক করে খুলে গেল স্পন্দনের। ভালো গানের গলা। গিটারেও ভালো হাত। আবার ক্যারাটেতেও দক্ষ। কোনো কোনো দিন রাতভর গান করে। মা-বাবার ইচ্ছে ঢাকুরিয়ার বেঙ্গল মিউজিক কলেজেও ভরতি করিয়ে দেবেন। পড়াশুনোর সঙ্গে চলুক সংগীতসাধনা। অবরুদ্ধ মনের দুয়ার খুলে গেছে স্পন্দনের।
এই অসাধ্যসাধন কীভাবে হল!
মনোবিদরা বলেন অটিজম শিশুর একটা মারাত্মক মানসিক রোগ। সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা কোনো অনুভূতি থাকে না। মা-বাবাকেও চিনতে পারে না। চাহিদার প্রকাশ করতে পারে না। একাকিত্ব ভালোবাসে।
এমন একটা শিশুকে শুধু মা-বাবার ঐকান্তিক চেষ্টা ও পরিশ্রমই সুস্থ মনের অধিকারী করে তুলতে পারে। যা করে দেখালেন স্পন্দনের মা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন