পলাতক

খগেন্দ্রনাথ মিত্র

অনেকদিন আগের কথা- আশ্বিনের মাঝামাঝি একদিন, ছেলেদের নিয়ে পাড়ায় মহা হৈ-চৈ পড়ে গেল। কথাটা যে শোনে সে-ই প্রথমে অবাক হয়, তারপর ভয়ংকর রেগে ওঠে; বলে “—ছেলেগুলোর কঠিন শাস্তির দরকার; দেশসুদ্ধ, জ্বালালে।”

কর্তারা তাই ছেলেদের বিচারে বসেছেন। বিচার-সভা বসেছে, পাড়ার নিধু চক্রবর্তীমশাইয়ের কাছারি ঘরের বারান্দায়।

মস্ত খড়ের ঘর; সামনে ফাঁকা উঠোন। তার ও-দিকে বেলতলা, এ-দিকে সজনে গাছ, রাংচিত্রার বেড়ার কোলে কোলে সুপুরি-গাছের সারি। তার মধ্যে একটা গাছ ন্যাড়া। টানা বাতাসে সেও অন্যগুলোর সঙ্গে এক-একবার মাথা দোলাচ্ছে।

চক্রবর্তীমশাই পাড়ার মোড়ল। সকলে তাঁকে সমীহ করে। গোল ভুঁড়িটি বার করে একখানা বড় জলচৌকি জুড়ে তিনি বসে আছেন। —হাতে হুঁকো। তাঁর পাশে তক্তাপোষে মাদুরের ওপর পাড়ার ভদ্ররা সকলে বসেছেন। আর তাঁদের সামনে বারান্দার নিচে, উঠোনে, বাদী ও আসামী দুই-ই হাজির। কেবল আসামীদের সর্দার ভোম্বল পলাতক। বাদী হলো বাজারের কাঠগোলার মজুরেরা।

এমনিতেই চক্রবতীমশাইয়ের গলার স্বর মোটা। তা আরও মোটা করে ছেলেদের মধ্যে একজনকে তিনি বললেন, “—এই টগরা, ইদিকে আয়।”

সকলেই জানে টগরা ভাল ছেলে, দৌড়-ঝাপ করতে পারে না; এক জায়গায় বসে থাকতে ভালোবাসে। সে চক্রবর্তীমশাইয়ের কাছে ভয়ে ভরে সরে এলো। চক্রবর্তীমশাইয়ের ঠিক পাশটিতে বসেছিলেন, টগরার বাবা। তিনি বাঘের মতো রুক্ষ চোখে তার দিকে তাকালেন।

মজুরদের দেখিয়ে চক্রবর্তীমশাই জিজ্ঞেস করলেন—“ঠিক করে বল, তোরা ওদের একখানা ডিঙি ডুবিয়ে দিয়েছিস?”

টগরা একবার আড়চোখে তার বাবার দিকে তাকালে। তারপর ঢোক গিলে বললে, “—না—হাঁ—মানে ডিঙিখান আপনিই ডুবে গেছে—”

চক্রবর্তীমশাই একটু রসিকতার সুরে জিজ্ঞেস করলেন,—“ডিঙি কুমীর না কচ্ছপ যে কূল থেকে মাঝ গাঙে সাঁতরে গিয়ে ভুস করে ডুবে গেল?”

টগরার বাবা ধমক দিলেন,—“মিছে কথা বলা হচ্ছে? ভোমলার সঙ্গে মিশে একেবারে গোল্লায় গেছ!”

চক্রবর্তীমশাই বললেন, —“আচ্ছা, কথাটা বার করছি।” তারপর বড় বড় চোখ করে ডাকলেন, —“এই ফেকু, ইদিকে আয়।”

ফেকু তাঁর ভাগ্নে। একরত্তি ছেলে সে। তাঁর গলার আওয়াজ এক পয়সার মটরা বাঁশির মতো। সেও ভোম্বলদের দলে ছিল। চক্রবর্তীমশাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই সে পিঁক করে কেঁদে ফেললে, কাঁদতে কাঁদতে বললে, —“আর করবো না মামা।”

চক্রবর্তীমশাই বললেন—“সে তো পরের কথা। কী হয়েছে বল দেখি।”

—“কী হয়েছে? ডিঙি ডুবে গেছে।”

—“কী করে?”

—“কী করে? ভুস করে।”

—“বটে-এ! তার আগে কী হয়েছিল?”

—“তার আগে কী হয়েছিল?” সে কাপড় চিবুতে চিবুতে একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললে,—“এই, ভোম্বলদা— না, ভোমলা— সিদিন আমরা বাজারে বায়স্কোপে রুশ-জাপানের জলযুদ্ধের ছবি দেখে এলে, সকলকে বললে, ‘কাল আমরাও ঐ রকম জলযুদ্ধ করবো।’


রাখাল বললে, ‘জাহাজ পাবে কোথা?’

ভোম্বলদা বললে, ‘জাহাজের আবার ভাবনা? কাঠগোলার মজুরদের ডিঙি চড়ে যুদ্ধ হবে।’ - তাই আজ সকালে মজুরদের দু'খানা ডিঙি খুলে নিয়ে তাতে চড়ে মাঝগাঙে গিয়ে আমরা দু’দলে যুদ্ধ করছিলাম। যুদ্ধ করতে করতে—” বলেই ফেকু ফিক করে হেসে ফেললো। ছেলের দলও খুক-খুক করে হাসতে লাগলো।

তাদের হাসিতে চক্রবর্ত্তীমশাইরা আরও গম্ভীর। দত্তমশাই লাঠি উঁচিয়ে ভাঙা গলায় হুঙ্কার দিলেন—“সব চুপ। জানো, কত বড় অপকম্ম করেছো?”

চক্রবর্তীমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর?”

ফেকু বললে,—“তারপর? ভোম্বলদা—না, ভোমলা –আমাদের ডিঙি থেকে টগরাদের ডিঙিতে মানকেকে লগি দিয়ে খোঁচা দিতেই বোদে লগি ধরে একটানে ডিঙিসুদ্ধ কাত করে দিলে। ডিঙিখানা অমনি উল্টে গিয়ে স্রোতের টানে ভেসে গেল।”

—“সেই ডিঙিতে যারা ছিল, তাদের কী হলো?”

—“তারা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডিঙির চারধারে সাঁতার কাটতে লাগলো—! কেউ কেউ সাঁতরে মানকেদের ডিঙিতে উঠলাম।”

—“ভোমলা?”

—“সে উঠলো না। চেঁচিয়ে বললে, ‘আমি সেনাপতি। আমার দলের সকলে রক্ষা না পেলে আমি উঠবো না।’
সে লালু আর মোংলার সঙ্গে সাঁতরে গিয়ে মালোপাড়ার ঘাটে উঠলো—”

হারান চাকীমশাই বলে উঠলেন—“এঃ। ব্যাটা একেবারে জাপানী অ্যাডমিরাল তোগো। উঠবেন না! বর্ষার জল থৈ থৈ ভরা নদী। কুমীর-বেঁশেলে নদীটা এখন বোঝাই—তিনি উঠবেন না! কী ভয়ানক পাজী! আজ আসুক একবার বাড়ি। মেরে—” বলেই তিনি ভোম্বলের উদ্দেশ্যে হাওয়ায় খুব জোরে এক চড় মারলেন।

ভোম্বল তাঁর ভাইপো। তার মা-বাবা কেউ নেই।

সেদিন বিচার আর এগোলো না। চক্রবতীমশাই মজুরদের বললেন, —“তোরা কাল আসিস রে। আসল দোষী যে সে-ই পালিয়েছে। তাকে ধরি আগে।” তারপর ছেলেদের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে বললেন, —“যা সব অঙ্ক কষ গে। প্রত্যেকে দেড়শ'টা করে বুদ্ধির অঙ্ক কষবি।”

বেলা তখন চারটে। রেললাইনের ধারে যুগীপাড়ার মাঠে সেদিন তাদের বড় এক ফুটবল ম্যাচ হবার কথা। প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে, থানা-পাড়ার টিম। কসাই-বাড়ি থেকে খাসির চর্বি কিনে বলটাতে বেশ করে মাখানো হয়েছে; ব্লাডারের ‘লিক’ তিনটেও ‘সলিউসান’ দিয়ে সারা গেছে—এখন সব মাটি!

ছেলের দল শান্ত সুবোধের মতো যে যার বাড়ি চলে গেল। এক রক্ষা যে, অঙ্কের বইয়ে দেড়শ'টা বুদ্ধির অঙ্ক নেই! তাদের রাগ হলো সর্দারের ওপর। তিনি বেশ মজা করে সরে পড়েছেন! তার জন্যেই সকলের এমন শাস্তি।

কিন্তু দোষ করলে শাস্তি ভোগ করতেই হবে।

জায়গাটি ছোট শহর —উত্তরে নদী, দক্ষিণে রেল-লাইন। কিন্তু শহরের মধ্যে গ্রামের মতো এখানে-সেখানে ঝোপ-ঝাড়, বাঁশবন ও বড় বড় গাছ। সন্ধ্যা হলেই এদিক-ওদিক থেকে শিয়ালের পাল হেঁকে ওঠে, ঝিঁ ঝিঁ গুলো ঝাঁ ঝাঁ করে, জোনাকির ঝাঁক পিটপিটে লন্ঠন জ্বেলে অন্ধকারে চারধারে গাছের ডালে ডালে, পাতায় পাতায় চলে-ফিরে বেড়ায়।

তবে বাজারটা বেশ বড়। সেখানে মাড়োয়াড়ীদের কাপড়ের দোকান ও বড় বড় কাঠগোলা আছে। নদী-পারে গ্রামগুলো থেকে মজুরেরা রোজ ডিঙিতে চড়ে কাঠগোলায় কাজ করতে আসে। তাদের ডিঙিগুলো তখন থাকে ঘাটে বাঁধা। আবার সন্ধ্যায় কাজ সেরে ডিঙিগুলোতে চড়ে সারি গেয়ে তারা নদীপারে ঘরে ফিরে যায়। তারা গায়— “কেঁদে গৌরীকয়, মাগো। শঙ্খো প-অ-রি-ই-তে ইচ্ছা হয়—”

আর, বৈঠা পড়ে তালে তালে ঝপ ঝপ ঝপ।

অধ্যায় ১ / ৫০
সকল অধ্যায়
১.
পলাতক
২.
অন্ধকারে
৩.
পথে
৪.
দেশছাড়া
৫.
শালুকডাঙায়
৬.
অদ্ভুত কীর্তি
৭.
বুড়ীর বাড়ি
৮.
যুদ্ধ
৯.
পাঠশালায়
১০.
কাছিমদহর হাটে
১১.
পুঁটিমারীর পথ
১২.
ভোজ
১৩.
যাত্রা
১৪.
পদ্মদিদির শ্বশুরবাড়ি
১৫.
কান্তিনগরে
১৬.
চরমাদারিপুরের বারোয়ারিতলায়
১৭.
নায়েব মশাইয়ের কাছারি বাড়ি
১৮.
চরমাদারীপুরের বাজারে
১৯.
জুতোর কারখানায় ও কাপড়ের দোকানে
২০.
বাদলার মেঘ ও সোনালী রোদ
২১.
নাটকের মহড়া ও পরের ঘটনা
২২.
পাগলাপাড়া ও দরগাবাড়ি
২৩.
দুই যোদ্ধা
২৪.
রাখাল ও ভোম্বলের স্বপ্ন
২৫.
গোরুর গাড়িতে
২৬.
নৌকো চলে
২৭.
ভাঙা হাটে
২৮.
কৃষ্ণপুরে নদীর কূলে
২৯.
সাতগেছে জোড়াবটতোলে
৩০.
দুর্গাপুরের পথে
৩১.
ঘরে ফেরার পরে
৩২.
পল্লীতে বন্ধুমহলে
৩৩.
কুলচারা গাঁয়ের পথে
৩৪.
কুলচারা গাঁ
৩৫.
নতুন কথা
৩৬.
আব্দুলপুরের মেলার পথে
৩৭.
নতুন পথ ধরে আগের লক্ষ্যে চলা
৩৮.
খোলসাপুরের পথে ও বন্ধুর বাড়ি
৩৯.
পথের শেষে
৪০.
মালঞ্চ গাঁয়ে
৪১.
জটা গাঁয়ের পথে
৪২.
চাটুয্যে বাড়ি
৪৩.
স্টেশনের পথে
৪৪.
স্টেশনে দুই আলাপি
৪৫.
হঠাৎ দেখা পথের মাঝে
৪৬.
বন্ধুর বাড়ি
৪৭.
চলার পথে
৪৮.
শুধু পথ আর পথ
৪৯.
টাটা নগরের পথে
৫০.
যাত্রা শেষ

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%