দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই

অগ্নিকুমার আচার্য

সাহসী মানুষের জয় যে অবধারিত, তার সম্প্রতি এক বিস্ময়কর প্রমাণ রাখলেন, পঁচিশ বছরের এক নারী।

কে তিনি? কী প্রমাণ রাখলেন?

তাঁর নাম— নাদিয়া মুরাদ। তিনি পেলেন নোবেল পুরস্কার। শান্তির জন্য।

নাদিয়ার নোবেল পুরস্কার জয়ের পেছনে যেমন রয়েছে তাঁর দুর্দমনীয় সাহস, তেমনি রয়েছে কঠোর নির্যাতনের করুণ কাহিনি।

নাদিয়া ইরাকের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মানুষ। ইয়াজিদিরা মুসলিম হলেও, তাঁরা সবসময় আই এস জঙ্গিদের দ্বারা লাঞ্ছিত, নির্যাতিত, নৃশংসভাবে অত্যাচারিত।

দুঃসাহসী নাদিয়া বুঝতে পারলেন, এই ভয়ংকর অত্যাচারের হাত থেকে বঁাচতে হলে চাই ইয়াজিদি নারীদের শিক্ষা। শিক্ষাই এনে দেয় সাহস। জোগায় শক্তি।

চার বছর আগে পাকিস্তানের ইউসুফজাই মালালা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁর অসীম সাহসিকতার সঙ্গে মুসলিম মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য।

নাদিয়াও ইয়াজিদি মেয়েদের শিক্ষার জন্য গোপনে একে একে ৮০টি স্কুল খুলেছিলেন।

কিন্তু গোপনে কেন?

নাদিয়া মুরাদ

কারণ, তালিবানি আই এস জঙ্গিরা ছিল মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার বিরুদ্ধে। তাদের ফতোয়া— মুসলিম মেয়েরা স্কুলে যেতে পারবে না, লেখাপড়া করতে পারবে না। স্কুলের পথে পা বাড়ালে চরম শাস্তি— মৃত্যুদন্ড।

নাদিয়া একদিকে ইয়াজিদি অন্যদিকে গোপনে স্কুল চালাচ্ছেন; জঙ্গিদের কানে কথাটা পৌঁছোতেই, তারা ক্রোধে ফেটে পড়ল।

২০১৪ সালে আই এস জঙ্গিরা উত্তর ইরাকের দখল নিয়ে নেয়। উত্তর ইরাকেই ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের বাস। জঙ্গিরা হাজার হাজার ইয়াজিদি মেয়েদের অপহরণ করে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন ও দৈহিক অত্যাচার চালায়। নাদিয়াকেও অপহরণ করা হয়। তাঁর ওপর জঙ্গি পশুরা চালাতে থাকে অকথ্য যৌন নির্যাতন ও নৃশংস অত্যাচার। নাদিয়া দেখতে পান, নয় বছরের শিশু মেয়েরাও জঙ্গিদের দ্বারা অপহৃত ও নির্যাতিত। শুধু তাই নয়, জঙ্গিরা ইয়াজিদি নারীদের যৌনদাসী হিসেবে বিক্রিও করে দেয়, আবার নির্বিচারে অকথ্য অত্যাচারের পর হত্যাও করে।

নাদিয়াকেও কয়েকবারে যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করা হয়। এত নৃশংস নির্যাতন সহ্য করে, নাদিয়া পালাবার পথ খুঁজছিলেন।

অবশেষে ক্রমাগত তিনমাস জঙ্গিদের কবলে থাকার পর, নাদিয়ার অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে আলোর রেখা ফুটে উঠল। তিনি কৌশলে পালাতে সক্ষম হলেন এবং জার্মানির শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় পেলেন। তারপরই শুরু হল নাদিয়ার জীবন সংগ্রাম। ইয়াজিদি নারীদের শিক্ষা ও মুক্তির সংগ্রাম।

যেকোনো মুহূর্তে জঙ্গিদের হাতে নাদিয়ার জীবনাবসানের আশঙ্কা ছিল, কিন্তু নাদিয়া ‘জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য’ করে তাঁর লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন। ইয়াজিদিদের জঙ্গিকবল থেকে মুক্তি, তাঁদের শিক্ষা ও যৌনদাসী হিসেবে বিক্রির বিরুদ্ধে জার্মানিতে থেকে জোরদার আন্দোলন শুরু করলেন।

শুরু হল এক দুঃসাহসিক লড়াই। তিনি বিশ্ববাসীকে জানাতে চান ইরাকে সংঘটিত ইয়াজিদি নারীদের ওপর জঙ্গিদের নির্যাতনের কথা। তিনি গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে, গেলেন ইংল্যাণ্ডের হাউস অব কমনস-এ, গেলেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। সর্বত্র তিনি তাঁর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের কথা সোচ্চারে জানালেন। সারা বিশ্বে সাড়া জাগালেন নাদিয়া মুরাদ।

তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া নৃশংস অত্যাচার ও যৌন নির্যাতনের রোমহর্ষক কাহিনি নিয়ে একটি বই লেখেন নাদিয়া। ‘দি লাস্ট গার্ল’। ২০১৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। তিনি লেখেন, তাঁর লড়াইয়ের কথা। নারী ও শিশুদের মুক্তির কথা। এই মহনীয় কাজই এখন তাঁর জীবনের ধ্যানজ্ঞান ও একমাত্র লক্ষ্য।

এই সাহসী তরুণীর জীবন-কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। সারা বিশ্ব চমৎকৃত।

অসম সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দূত হিসেবে, ২০১৮ সালে নাদিয়া ভূষিত হলেন নোবেল পুরস্কারে। ইয়াজিদিদের মুক্তির প্রতীক নাদিয়াকে রাষ্ট্রসংঘ ‘শুভেচ্ছা দূত’ হিসেবে নিয়োগ করে তাঁকে সম্মানিত করলেন। তাঁর লড়াইকে কুর্নিশ জানালেন।

ইউসুফজাই মালালার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির চার বছর পর আরেক নির্যাতিতা নারী পেলেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার।

এরপরেও কি মুসলিম নারীরা তালিবানিদের ভয়ে শিক্ষা থেকে বিরত থাকবেন?

মালালা, নাদিয়া প্রমাণ করে দিলেন, সাহসের জয় অবধারিত। জানান দিয়ে গেলেন, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষকে সাহসের সঙ্গে লড়তে হবে। মৃত্যুভয় করলে চলবে না। তবেই সমাজ থেকে অত্যাচারী দস্যুরা নিশ্চিহ্ন হবে।

মেয়েরাও যে সমাজের কদর্য চেহারাটা বদলে দিতে পারে, সেদৃষ্টান্তই স্থাপন করেছেন— নোবেলজয়ী নাদিয়া মুরাদ।

ধন্য নাদিয়া! ধন্য তোমার জীবনপণ লড়াই।

অধ্যায় ১ / ৫০
সকল অধ্যায়
১.
দুঃসাহসী নাদিয়ার বিস্ময়কর লড়াই
২.
অদম্য দিব্যাঙ্গ অরুণিমা
৩.
ক্ষুধার্তের সেবক
৪.
শিক্ষার প্রেরণা তুরতুকের রহিমা
৫.
জঙ্গিদের যম এক মেয়ে: সুহাই আজিজ
৬.
প্রতিবন্ধীদের মরমী বন্ধু
৭.
অর্জুন-এর মানবিক মুখ
৮.
পুষ্পাকুমারীর দুঃসাহস
৯.
ছোট্ট ক্রাশনার বিস্ময়কর সৃষ্টি
১০.
সাপ সংরক্ষণের এক আশ্চর্য কাহিনি
১১.
ক্ষুধার্তের ত্রাতা: ভিশভ মেহতা
১২.
সততার জয়: বিশাল উপাধ্যায়
১৩.
অর্পণের ক্যান্সার জয়
১৪.
ভূতের বিরুদ্ধে অভিযান: রামা নায়ডু
১৫.
প্রযুক্তিবিদ: ব্যাকবেঞ্চার প্রমিত
১৬.
মেধাবী স্পন্দনের দুরারোগ্য ব্যাধি জয়
১৭.
আলিশার সার্থক নামকরণ উৎসব
১৮.
দিনমজুরের এক আশ্চর্য কাহিনি: দিলীপ সাহানি
১৯.
দলিত মনোজকুমারের অসাধারণ কৃতিত্ব
২০.
শিশু পক্ষীবিজ্ঞানী জোসুয়া বসকো
২১.
দিব্যাঙ্গ রোহিতের অসাধারণ সাফল্য
২২.
বাড়ির আয়ার ভুজিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার লড়াই
২৩.
ছাত্র চন্দ্রপ্রসাদ-এর নাসা পুরস্কার
২৪.
বাইক-অ্যাম্বুল্যান্স দাদা
২৫.
ঠিকে-ঝি আফসানের উচ্চশিক্ষালাভ
২৬.
শান্তির দূত মালালা-র লড়াই
২৭.
আইপিএস মঞ্জিতার স্বপ্ন পূরণ
২৮.
খুদে মহাকাশবিজ্ঞানী রিফাৎ
২৯.
তিন কিশোরের নতুন ঠান্ডা পানীয় আবিষ্কার
৩০.
তরুণী মাইলসের লিভারদান
৩১.
তিন বছরের তিরন্দাজ সঞ্জনা
৩২.
শিশু ব্ল্যাক বেল্ট ফ্লোরা
৩৩.
সাহসিনী ছাত্রী সুস্মিতা
৩৪.
অবিস্মরণীয় ঈশ্বর
৩৫.
দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত তুহিনের সংগ্রাম
৩৬.
বিস্ময় বালক নির্ভয়
৩৭.
ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকা-র আবিষ্কার
৩৮.
সায়নীর বিশ্ববিজয়
৩৯.
আটবার এভারেস্টের মাথায় পা: লাখপা শেরপা
৪০.
৯৭ বছরে এমএ পাশ
৪১.
পণের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াই
৪২.
ছোট্ট মেয়ের স্বচ্ছতা অভিযান
৪৩.
সবুজ যোদ্ধা যোগানাথন
৪৪.
অভিজিৎ-এর ভয়ংকর মারণ রোগ জয়
৪৫.
পথশিশুদের ত্রাতা প্যাট্রিক
৪৬.
সর্ব কনিষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানী
৪৭.
নাচের ছন্দে দিব্যাঙ্গ গেইজেল
৪৮.
ভিক্ষুক জালালউদ্দিনের ফ্রি স্কুল গড়ার লড়াই
৪৯.
দৃষ্টিহীন প্রাঞ্জল-এর অসাধারণ সাফল্য
৫০.
অরণ্যের ঈশ্বর: স্বপন দেববর্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%