পঁয়তাল্লিশ

অনিরুদ্ধ বসু

“বৈঁঠিয়ে চতুর্বেদী সাব” রোশন চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করল।

“হাঁ বলিয়ে শেঠজি” চতুর্বেদী দৃঢ় অবিচল।

“রেকর্ডিং শুনিয়ে...” রোশন টেবেলের টেপরেকর্ডার চালিয়ে দিল।

শুনতেই চতুর্বেদীর রং ও ভঙ্গিমার পরিবর্তন। চালাক চতুর্বেদীর বুঝতে অসুবিধা হল না, রোশন তাকে ফাঁসাতে চাইছে। এমনি শূন্য থেকে ক্রিমিন্যাল জগতে বড় হয়ে আজ মুম্বাইয়ের সো-বিজ সাম্রাজ্যের অলিখিত ডন হয়নি।

“কিসকা আওয়াজ হ্যায়” সরল প্রশ্ন।

“পহেচান নেহি রহে? অতীন রায়”

“ইয়াদ আয়া। ইয়ে আদমি মেহুলিকা সেক্রেটারি থা”

“ইয়ে আদমি খুনকে চক্কর মে ফসা। টেপ মে আপকা নাম লে রহা হ্যায়”

“সাহাব, ইয়ে বকয়াস আদমি। রূপয়ে বিনা কুছ নেহি জানতা। মেহুলি উসে ভগায়া। ম্যায় ছোটামোটা কাম দিয়া” চতুর্বেদী হাল ছাড়তে নারাজ।

“খুন ভি?” রোশন অধৈর্য হয়ে পড়ছে।

“সাব, আপকো ইজ্জত করতা হু। মুঝে দোষ কেও দে রহে? ইয়া আদমিকে সাথ মেরা কোই তালুক নেহি”

“ঔর ফিরসে সোচ লিজিয়ে”

“কিসিকে বোলনে মে তো ম্যায় ক্রিমিন্যাল নেহি হো জায়ুঙ্গা। সবুদ চাহিয়ে”

রোশন বুঝতে পারছে, এ গভীর জলের মাছ, সহজে বাগে আসবে না। কোথাও এগোচ্ছে না। বরং অ্যারেস্ট করে চিরায়িত পুলিসি দাওয়াই দিলে, ঝেড়ে কাশত। তাতে ঝামেলায় পড়ার আশংকা ষোলো আনা। মিডিয়া ওত পেতে বসে আছে পুলিস কাস্টডিতে অত্যাচার নিয়ে স্টোরি করতে। অনেক পুলিসই ফেঁসেছে।

“ঠিক হ্যায়। মুম্বাই সে বাহার মত যাইয়ে। জরুরত পড়ে তো বুলা লুঙ্গা” রোশন নরম অথচ দৃঢ়ভাবে বলল।

চতুর্বেদী ভাবছে পুলিসের যখন একবার সন্দেহ হয়েছে, ছাড়বে না। ভওয়ানিশঙ্করের সঙ্গে কথা বলতে হবে। চিন্তায় রোশনের অফিস থেকে বেরিয়ে এল। কী করা যায়? বানচোত অতীন রায় হাটে হাড়ি ভেঙে দিয়েছে। বারবার না করা সত্ত্বেও শোনেনি। রাজেন্দ্র চতুর্বেদী সোজা বাড়ি। অফিসে যাওয়ার মুড নেই। ভডকা-লাইমে চুমুক দিয়ে ভাবতে বসল।

তারপর মোবাইলে ফোন “চতুর্বেদী বোল রহা হু”

“সমঝ গেয়া। বাত কেয়া?” ভওয়ানিশঙ্করের গলা ভেসে এল সুদূর ম্যাথেরন থেকে।

ডিসকোর্সের পর, সবে এক কচি মেয়েকে ‘আতিথিয়তার’ জন্য ঠিক করেছে প্রতিদিনের মতো বাহারি কামসূত্রের আশায়, এই সময় চতুর্বেদীর ফোন অবাঞ্ছিত।

“মহারাজ, মুসিবত হো গেয়া। রোশন শেঠ উসকে অফিস মে মুঝে বুলায়া ঔর এক টেপ শুনায়া” ওদের কথোপকথন আওড়ে গেল। ভওয়ানিশঙ্কর বাধা না দিয়ে শুনল।

“দেখো চতুর্বেদী, ইয়ে চিন্তা কা বিষয়। তুমহে হি ইসে মিটানা হোগা। মেরে নাম কাহি না আয়ে। ইন দিনও মে ধরম লে কর জাদা হি ব্যস্ত হু” ঠান্ডা স্বরে জবাব।

কমবক্ত কাহি কা। অচ্ছা সে জানতা হু, তেরা ধরম কা চক্কর। চতুর্বেদী খেপে বোম।

“মহারাজ, আপ তো পুরা কাহানি জানতে” চতুর্বেদীর অনুনয়।

“ওহ তো সহি। ইস মে ম্যায় কাঁহা সে? ম্যায় তুমহে কুছ নেহি বোলা, সামঝা” ভওয়ানিশঙ্করের চিৎকার।

যন্ত্রণায় চতুর্বেদীর মাথা দপদপ করছে। ধূর্ত বাবা সময়মতো হাত গুটিয়ে নিয়েছে। মারমুখি রাগে মাথা ঘুরছে। বাবা চতুর্বেদীকে এখনও চেনে না। এবার হিসেব চোকাতে হবে। আগের বার ছেড়ে দিলেও, এবার আর নয়...

“বাবা, ম্যায় আপকা সেবক হু। মেরে পাস আপ নেহি ঠহেরে তো বরবাদ হো জায়ুঙ্গা” অনুনয় করল।

“ম্যায় হর ওয়াক্ত তুমহারে পাস হু। দুনিয়াদারি কা হিসাব তো তুমহে হি চুকানা পড়েগা। ম্যায় সাধাসিধা ঈশ্বরভক্ত হু। ম্যায় কেয়া করু?”

রাগে অজ্ঞান হওয়ার জোগাড়। বনবন করে মাথা ঘুরছে। আরকেটা ভডকা ঢেলে এক চুমুকে শেষ। কোনও মতেই বরদাস্ত করবে। ভগবানের চেলা! দেখিয়ে দেবে কে আগে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছয়।

মোবাইলে ফোন।

“নমস্কার সাহাব... বোলা... কায়ে পাইজে”দিলীপ‘ধমাকা’ কাম্বলে অন্যদিকে।

সকাল এগারোটা। রাজু চতুর্বেদী ইচ্ছে ব্যক্ত করল।

দুটি অবয়ব, রাতের অন্ধকারে শিথিল পায়ে ঝরা পাতা মাড়িয়ে দস্তুরি নাকা থেকে ম্যাথেরনের আশ্রমের পথে এগোল হুকুম তামিল করতে। ভালো সুপারি। ম্যাথেরনের বাইরে আশ্রমের নির্জন পরিবেশও উপযোগী। যখন আশ্রমের গেটে, আশ্রমের সারাদিনের ডিসকোর্সের পর মহিলা ভক্তবৃন্দ গভীর ঘুমে। অমাবস্যার অন্ধকারে তাদের কালো স্কার্ফে মুখ ঢাকা অবয়ব চেনার উপায় নেই। একমাত্র গার্ডকে কাবু করে অজ্ঞান করতে সময় লাগল না। আশ্রমের মানচিত্র তাদের অজানা নয়। সোজা শয়নকক্ষে। লাথি মেরে দরজা ভাঙল।

চার পোস্টার অলংকৃত শয্যা জেগে উঠল ক্লান্ত ভওয়ানিশঙ্করের ঘুমের ব্যাঘাতে। পাশে সকালের সেই বিবস্ত্র তরুণী, বাবার ফুলের আশীর্বাদে ধন্য রাতের রাসলীলায়। ভয় কেঁপে উঠে স্যাটিন চাদর দিয়ে নগ্নতাকে আড়াল করার চেষ্টা। মুখ ঢাকা লোক দুটি ইঙ্গিতে মেয়েটিকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলল। প্রফেসান্যাল সুপারি কিলার। কারণ ছাড়া তরুণীদের আক্রমণ করে না। সাইলেন্সার লাগানো দোনলা অস্ট্রিয়ান জি-লক ২২ এর দিকে বাবা ভওয়ানিশঙ্কর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে। সব থেকে খতরনাখ অস্ত্র - হাল্কা, ছোট, শব্দ বিহীন। আতঙ্কিত তরুণী ঘর থেকে ছুটে পালাল। একজন মুখোশধারী টেলিফোনের তার ছিঁড়ে ভারী জুতো দিয়ে গুঁড়িয়ে দিল। অন্যজন পিস্তল দিয়ে বাবাকে খাটে দাঁড়াতে নিঃশব্দে ইঙ্গিত করল।

“তুমলোগ কৌন? কাঁহা সে আয়ে?” বাবা নগ্নতা আড়াল করে দাঁড়াল।

শেষ কথা। সামনের মুখোশধারী জি-লকের ট্রিগারে চাপ দিল। বুলেট ছিটকে লাগল বাবার অণ্ডকোষে। অবাক, কিংকর্তব্যবিমূঢ় শরীর খাটে ছিটকে পড়ল। সারাজীবন ধরে কুকর্মের পৈতৃক অলংকার রক্তাক্ত মাংসপিণ্ড। গণ্ডগোল আঁচ করে, অনুস্কা আর রম্ভা বেডরুমে ঢুকল। দ্বিতীয় জন তাদের ঠেলে বাইরে পাঠিয়ে সঙ্গের ব্যাকপ্যাক থেকে দড়ি বার করল। বাবা আধা ঘোরে তাকাল তার ওপর দাঁড়ানো আততায়ীর দিকে। দ্বিতীয় বুলেট কপালের মাঝে। মৃত্যু যাতে কষ্টকর না হয়, এতটা মনুষ্যত্বহীন নয়। ঠিক যেমন মানিকতলার খালধারে সোহমের মৃত্যু।

মিশন শেষে মেয়েগুলোর মুখে রুমাল গুঁজে বাঁধল। ম্যাথেরন থেকে বেরবার আগে যাতে পুলিসকে খবর দিতে না পারে। আশ্রম থেকে যাওয়ার আগে যতটা সম্ভব সব টেলিফোন লাইন ছিঁড়ে ফেলল। কেউ মোবাইল ব্যাবহার করতেই পারে। এটুকু রিস্ক তো নিতেই হয়। দশ মিনিটে কাম খতম।

দিলিপ ‘ধমাকা’ কাম্বলের সাগরেদরা ম্যাথেরনের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, দস্তুরি নাকার পথে। হাউস খাসে ঘুমন্ত ইন্দ্রাক্ষি জানতেও পারল না, সুদূর ম্যাথেরনে, তার প্রধান সেনাপতি শেষবারের মতো, জিলক ২২-এর নলের সামনে দাঁড়িয়ে, শেষবারের মতো প্রাণভিক্ষা করেছে।

“সাহেব, কাম ঝলেল আহে” ফোনে আততায়ীরা জানিয়ে, দস্তুরি নাকা থেকে মুম্বাইয়ের পথে রওনা হয়ে গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%