অনিরুদ্ধ বসু
আগের চেয়ে এখন কাজ বেড়ে গেছে মধুসূদনের। আগে কাজ ছিল রিপোর্টগুলো পড়ে, নোট রেখে, অনাদিকে দিয়ে তাকে তুলে রাখা। এখন ঠিক উলটো। রিপোর্টগুলো তাক থেকে বারবার খুঁজে বার করতে হচ্ছে। খুন-রাহাজানি-রেপ-ছিনতাই তো লেগেই। এতদিন লাইনে থেকে বুঝেছে পৃথিবী যতদিন, মানুষের লোভ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অতৃপ্ত বাসনা থাকবে, ততদিন এ চলতেই থাকবে। মধুসূদন রিটায়ারের পর কোনও অপদার্থ পুলিস অফিসারের ঘাড়ে দায়িত্ব পড়বে। এর আগেও তো কত খুন হয়েছে। কিছুর কিনারা হয়েছে, অনেকের হয়ওনি। চাঞ্চল্যকর খুনের সমাধান উত্তেজনাময় খবর হয়ে বেড়িয়ে মাতিয়েছে মিডিয়ার অনেক খবরের মতো, চাঞ্চল্যপূর্ণ যুগান্তকারী সব নৃসংশতাকে। কিছু মহলে এই রিসেন্ট খুনগুলো সাময়িক আলোড়ন তুললেও, খবরের ঘনঘটায় শেষ পর্যন্ত হারিয়ে গেছে ফাইলের পাতায়।
ফোন বেজে উঠল। ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিস। চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল “ইয়েস স্যার”। নাম শুনেছে বটে। চাক্ষুষ করেনি। ফোন তো দূরের কথা।
“ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধায় সম্বন্ধে কোনও রেকর্ডস আছে কি না। দেখ তো। চেন্নাইয়ের হোম সেত্রেুটারি আমাদের হোম সেত্রেুটারিকে ফোন করেছিল। ওখানকার চিফ সেত্রেুটারির ছেলে ইনসুলিন দিয়ে খুন হয়েছে। ওরা ইনভেস্টিগেশনে জেনেছে কোনও এক মহিলা ব্যাঙ্গালুরুর ক্যাশ ফার্মেসি থেকে ইনসুলিন কিনে চেন্নাইতে গিয়ে খুন করে এসেছে। প্রেসক্রিপশনটা ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের, কলকাতা থেকে। আমি ডিসিডিডি ইন্দ্রজিৎ কর পুরকায়স্থকে ইনভেস্টিগেট করতে বলেছি। ওকে ডিটেলসগুলো দিয়ে দিও”
“নিশ্চয়ই স্যার। কোনও ডাক্তারের এরকম রিপোর্ট পড়িনি। তবুও আবার খুঁজে দেখব স্যার”
“ওহঃ আরেকটা কথা। ওরা বলছে মেহুলি রায় নামে মুম্বাইর মেয়ের ত্রেুডিট কার্ড দিয়ে ওই মহিলার ফ্লাইট টিকিট কাটা হয়েছিল দিল্লি থেকে। এই কী সেই মেহুলি রায় যে মেদিনীপুরের রিসর্টে খুন হয়েছিল?”
“সেটা তো জানি না। মেহুলি রায়ের সব রিপোর্ট এখানে”
“কে ইনভেস্টিগেট করছে?”
“মেদিনীপুরের এসপি স্নেহাশিস চ্যাটার্জি”
“সব কেমন গোলমেলে। মৃত মানুষের ত্রেুডিট কার্ড দিয়ে টিকিট কাটা হল কী করে? তাও আবার দিল্লি থেকে। ডিসিডিডি এসপিকে ডেকে পাঠাই। চেন্নাইয়ের হোম মিনিস্ট্রির চাপ...” ফোন কেটে দিল।
মধুসূদন অবাক। ভাবতেও পারেনি লিঙ্কের চিন্তাধারা এভাবে মিলে যাবে। আন্দাজ করেছিল লিঙ্ক আছে। ডিজির কথায় এখন স্পষ্ট। এখন সে ইনডিভিজুয়াল খুনের কথা ভাবছে না। যারা তদন্ত করছে, করুক। যদি কিছু মিস হয়ে যায়, বড়জোর মনে করিয়ে দিতে পারে। জানতে হবে মোটিভ কী? কোনও মানসিক বিকৃতি না গণিত তত্ত্ব? ওরা থাকুক ইনভেস্টিগেশনে। সে ছা-পোষা এসি, মাস-মাইনের কেরানি। রিপোর্টগুলোকে গুছিয়ে রাখা কাজ। এই রিপোর্টগুলোর সার আত্মস্থ করে একটা চত্রেু গেঁথে ফেলতে পারলে, সারা জীবনের ব্যর্থতা ভুলে, রিটেয়ারমেন্টে আত্মতুষ্টির অবকাশ। ব্যর্থতাই স্পৃহা জাগাচ্ছে, কিছু করে দেখানোর। নইলে বাকি জীবন ব্যর্থ পুলিস অফিসারের তকমা নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে, যার রেশ আছড়াবে গিন্নির গঞ্জনায়।
পল্টুর গরম চায়ের সঙ্গে আজকের আড্ডা বেশ গরমা-গরম। চায়ের বিত্রিুও বেড়ে গেছে। বোনাস মোগলাই পরোটা, মটন কবিরাজি।
শঙ্করদয়াল কুঞ্জবিহারীকে বলল “এতদিনে ব্যাপারটা পরিষ্কার”
“কী?” কুঞ্জবিহারীর প্রশ্ন।
“ভওয়ানিশঙ্করই এসব খুনের হোতা”
“তাই তো মনে হচ্ছে”
মাঝ থেকে মধুসূদন টিপ্পনি কাটল “তর্কের ক্ষেত্রে মানাই যেতে পারে ভওয়ানিশঙ্কর পান্ডা। মোটিভ কিন্তু এখনও পরিষ্কার নয়”
কুঞ্জবিহারী শঙ্করদয়ালের দিকে চাইল। উত্তর আশা করছে। শঙ্করদয়াল মোগলাই পরোটাতে কামড় দিল। মিথ্যে বলেনি মধুসূদন। খুনি তো, বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কোনও এভিডেন্স নেই। মোটিভও ধোঁয়াশা। হিসেবটা মিলেও মিলতে চাইছে না। চত্রেুর পান্ডাকে শনাক্ত করা গেলেও, কারণ অথৈ জলে।
“কোনও স্ক্যামে নিশ্চয়ই জড়িয়ে”
“মানতে পারলাম না। একটা ওয়ান অফ ইনসিডেন্ট হলে, স্ক্যাম বলা যেতে পারে। এতগুলো খুন স্ক্যাম নয়, অন্যকিছু”
মধুসূদন চুপচাপ শুনছিল। উপভোগ করছিল ওদের যুক্তি-তক্ক। এবার থাকতে না পেরে বোমা ফাটাল “আজ ডিজি ফোন করেছিলেন। ইনসুলিনের প্রেসক্রিপশন কলকাতা থেকে লিখেছিলেন একজন প্লাস্টিক সার্জেন। নাম ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়”
“অ্যাঁ!!!” সবার মুখ থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে এল। ওদের সশব্দ জাসুসিতে হঠাৎ মধুসূদন জল ঢেলে দিল।
“ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ভওয়ানিশঙ্করের যোগটা কোথায়?”
সবাই চুপ। কারও মুখে কথা নেই। অনেকক্ষণ কেটে গেল নীরবতায়। সবাই মোগলাই পরটা পেটে পুরে ঠান্ডা মগজকে সতেজ করতে চাইছে।
তাপস মিনমিন করে বলল “প্লাস্টিক সার্জেন। থাকতেই পারে”
শঙ্করদয়াল প্রতিবাদ করল “আর ডাক্তার পেল না? মুম্বাইতে এত ডাক্তার থাকতে ইনসুলিন লেখার জন্য কলকাতা থেকে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লিখিয়ে, ব্যাঙ্গালুরু থেকে ওষুধ কিনিয়ে, চেন্নাইতে খুন। ব্যাপারটা গাঁজাখুরি হয়ে যাচ্ছে না?”
“সব ডাক্তার তো নাও লিখতে পারে?” কুঞ্জবিহারী বলল।
“ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ই বা লিখবে কেন?”
“নিশ্চয়ই চত্রেু জড়িয়ে”
শুভঙ্কর চুপচাপ কথা শোনে। বড় কিছু বলে না। এবার না বলে পারল না “শুনেছি ওনার পসার রমরমে। এত টাকা থাকতে, উনি কেন ভওয়ানিশঙ্করের সঙ্গে জড়াবেন?”
“লোভ ভায়া, লোভ। লোভ মানুষকে কোথায় নিতে পারে জান না। স্বর্গ থেকে নরকে”
“ধরা পরলে তো ইহলোক থেকে পরলোকে যেতে বেশি সময় লাগবে না। তোমার থেকে উনি বেশি জানেন” শঙ্করদয়াল গম্ভীর।
তড়িৎ হেসে বলল “কেন লিখেছেন, কাকে লিখেছেন, সেই প্রেসক্রিপশন দিয়ে কী করা হবে, নাও জানতে পারেন। আমার মনে হচ্ছে অযথা তোমরা একজনকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করছ। ছাড় তো। কালকে পুলিস নিশ্চয়ই ওনাকে জেরা করবে। নিঃসন্দেহে সদুত্তর মজুত”
মধুসূদন চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে “কে কাকে খুন করছে কীভাবে, এ সবের মধ্যে না গিয়ে, কেন খুন করেছে সেটা ভাবলেই সদুত্তর পাওয়া যাবে। দুটো ব্যাপার পরিষ্কার। খুনগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িত। খুনগুলোর পেছনে একটা আলটিমেট মোটিভ আছে। যেটা আমাদের এখনও অজানা”
“এই খুনগুলো থেকে জানব কী করে?”
“কতগুলো অবভিয়াস জিনিস উঠে আসছে। এক খুনগুলো ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হচ্ছে”
তাপস বাধা দিল “সাউথ ইন্ডিয়ান অ্যাকট্রেসের বোমা ফেটে মরা, ওই খুনটাও কী এর মধ্যে?”
সায় দিল মধুসূদন “হ্যাঁ, ওটাও। যদিও এখনও কোনও এভিডেন্স নেই। মনে হচ্ছে এখানেও যোগসূত্র আছে”
“কী যোগসূত্র?”
“জানি না। আমার ধারণা” মটন কবিরাজির টুকরো মুখে পুরল “যা বলছিলাম, কে খুন করেছে তা নিয়ে না ভেবে, কারা খুন হয়েছে নিয়ে ভাব। মনে হচ্ছে না একজনের কাজ”
ওরা হিসেব করল “মেহুলি, সোহম, অঙ্কুর, সোফি, সুনেত্রা, নীলকান্থ। এখন বলছ সাউথের হিরোইনটাও”
মধুসূদন চেয়ারে দেহটা এলিয়ে দিল “তোমারা তো খুনিকে ধরেই ফেললে। আমি বলছি, এখনও খুন শেষ হয়নি”
“মানে?” শঙ্করদয়াল অবাক।
“অঙ্কটা কষে দিলে। আমিও বলে দিচ্ছি, অঙ্ক এখনও শেষ হয়নি। আরও খুন হবে”
“কী করে বুঝলে?”
মুচকি হাসল মধুসূদন “এবারে নর্থ ইন্ডিয়ায়। দেখ, আমার কথা মেলে কি না?”
খুনের উপায় নিয়ে সময় নষ্ট না করে মধুসূদন ভাবছিল খুনের অঙ্ক। অস্পষ্ট আকার নিচ্ছে। যদিও পরিপূর্ণ অবয়বে রূপায়িত হচ্ছে না। অবয়বের পেছনের ধোঁয়াশা মানসিক অঙ্কের বীজ। নিরন্তর খুঁজে চলেছে। ধোঁয়ার আকাশে নয়, বাস্তবের গণিত তত্ত্বে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।