ছেচল্লিশ

অনিরুদ্ধ বসু

অ্যারেস্টের পর, প্রাইজড ক্যাচ অতীনকে নিয়ে আসা হল লালবাজারে। পুলিসি দাওয়া ছাড়াই বিধ্বস্ত লালবাজারে লকআপে। ভয় মেশানো সংশয়। বুঝতে পারছে মধুসূদন চালাকি করে বোঁচকায় থাকা রেকর্ডারে বয়ান রেকর্ড করে নিয়েছে। পালাবার পথ নেই। নিজেকে দুষছে বিচারহীন বোকামির জন্য। সারা রাত ঘুমোতে পারেনি।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যখন নিয়ে আসা হল, মুখে বিধ্বস্ত উদ্বেগ প্রকট। এসি নেই। প্যাচপ্যাচে গরম। চেয়ারের চারদিকে আরও খালি চারটে চেয়ার অভিমুন্যর মতো ঘিরে নিংড়ে ক্ষতবিক্ষত করছে। পুলিস হেফাজতে থার্ড ডিগ্রি অত্যাচারের কথা শুনেছে। চারদিকে চোখ বোলাল। বইয়ে পড়া, ছবিতে দেখা, তেমন কোনও মারাত্মক অস্ত্র নজরে এল না। বসতে বলে বেরিয়ে গেল। যত সময় পার হচ্ছে, উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ঘণ্টাখানেক পরে চারজন ঢুকল। এদের মধ্যে দু-জন পূর্ব পরিচিত। স্নেহাশিস চ্যাটার্জি, মধুসূদন মুখুজ্জে ছাড়া বাকি দুজনকে চিনতে পারল না। এরা যেন ইউক্রেনিয়ান আন্ডারগ্রাউন্ডের মৃত্যুদূত। মধুসূদনের হাতে ফাইল।

“আশা করি কাল রাতে ভালো ঘুম হয়েছে” স্নেহাশিসের কথা শূলের মতো বিঁধছে।

মাথা নাড়াল। টেবিলের ওপর টেপ রেকর্ডার, যেটা মধুসূদনের বোঁচকায় ছিল।

“প্রথমেই তোমার রেকর্ড করা কথোপকথন চালিয়ে শোনাই”

কথোপকথন না স্বীকারোক্তি। উদ্বেগে শুনছে নিজের কথাগুলো। ভাবতেও পারছে না মালের ঘোরে সে এগুলো বলেছে।

“আমাদের দুজনকে তো চেন। এ মানিকতলার এএসআই পরিতোষ সেন। আর উনি ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের সনাতন মিত্র। সত্যি সত্যিই সনাতন মুখুজ্জে। মুখুজ্জেবাবু ডুন এক্সপ্রেসে ওনার নামটাই ধার করেছিল” স্নেহাশিস হাসল। অন্যরা ভাবলেশহীন “কিছু প্রশ্ন করব। সঠিক উত্তর দিলে তোমারই মঙ্গল। ইনভেস্টিগেশনের স্বার্থে আশা করব সহযোগিতা করবে। তোমায় অসুবিধায় ফেলা উদ্দেশ্য নয়। বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই”

অতীন স্বস্তির শ্বাস ফেলল। তাহলে পুলিসি দাওয়াই হজম করতে হবে না। নিমেষেই স্বস্তিতে ঘি ঢালল পরিতোষ সেন “চালাকি করার চেষ্টা করলে অন্য উপায়”

আগেরদিন চারজনেই নিজেদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছে। যেমন করেই হোক কেসটা ঠিকভাবে সাজাতে হবে। যথাযথ প্রমাণের অভাবে যাতে ছাড়া না পেয়ে যায়। ডিজি স্বয়ং ব্যক্তিগতভাবে কেসটা নিয়ে ইন্টারেস্টেড। পুলিসের ট্রেনিং-এ অভিনব এ কেসের জিজ্ঞাসাবাদ লিপিবদ্ধ থাকবে। ‘মাট অ্যান্ড জেফ’ পদ্ধতিতেই প্রশ্নোত্তর পর্বে এগোতে হবে। থাকবে। ‘মাট অ্যান্ড জেফ’ দুজন হাইপথেটিক্যাল চরিত্র। মাট নরম, ক্রিমিন্যালের সঙ্গে সহানুভূতিশীল। জেফ ঠিক উলটো। কঠোর জিজ্ঞাসবাদে ক্রিমিন্যালকে নারকীয় পরিস্থিতিতে ফেলতে খড়গহস্ত। অল্টারেনেট প্রসেসে দীর্ঘক্ষণ প্রশ্নোত্তরে ক্রিমিন্যাল মাটকে বিশ্বাস করে তার কাহিনি বলে দেয়। অ্যামেরিকায় হাসির প্রোগ্রাম থাকলেও, ব্যাবহারিক জীবনে এ জিজ্ঞাসাবাদ অন্য। দাগি আসামির ক্ষেত্রে অবশ্য এ পদ্ধতি অকার্যকর। অতীন যেহেতু দাগি আসামি নয়, তাই ওর জন্যে ‘মাট অ্যান্ড জেফ’-ই কাফি। স্নেহাশিস মাট। পরিতোষ জেফ। ভালো-খারাপ পুলিস।

টেপ রেকর্ডার অন রেখে প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু “কোয়েশ্চেনিং অফ অতীন রায় ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ১১ ২০” পরিতোষ রেকর্ড করল। স্নেহাশিসের দিকে ইঙ্গিত।

“তুমিই শুরু কর অতীন” স্নেহাশিস বলল।

“স্যার, আমি নির্দোষ। ওরা আমায় এ কাজে বাধ্য করেছে”

নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি। নটা খুন, তাও বলছে নির্দোষ!

“কারা?”

“স্যার, ওরা আমায় শেষ করে দেবে”

“আবার প্রথম থেকে শুরু করা যাক। আমরা জানি তুমি মেহুলি রায়, সোহম সান্যাল, অঙ্কুর জয়সওয়াল, সফি চৌধুরী, শিবানী করঞ্জওয়ালা, সুনেত্রা আগারওয়াল, নীলকান্থ রঙ্গনাথন, পৌরভি কান্নান আর লোকেশ চাঢার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে” স্নেহাশিস লিস্টটা পড়ে তাকাল “মেহুলির মৃত্যুতে তোমার কী ভূমিকা”

“স্যার মেহুলি আমার ভাইঝি। আমার একটুও ইচ্ছে ছিল না। ওরা শুধু আমায় ওয়াইনের বোতল দিঘায় পৌঁছে দিতে বলেছিল।

“কে দিয়েছিল?”

“চতুর্বেদী”

মধুসূদন বাধা দিয়ে বলল “বাবা ভওয়ানিশঙ্করও রিসর্টে এসেছিল। নিজের নামেই অনেকগুলো রুম বুক করেছিল। কারা ওখানে ছিল?”

“সবার নাম জানি না। ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা থেকে একদিনের জন্য এসেছিল”

“চতুর্বেদীও ছিল?”

“না। সকালে বাবার সঙ্গে মিটিং করতে গেছিল”

“কারা মিটিঙে ছিল?”

“জানি না”

“কথা ঘুরিও না। অত ধৈর্য নেই” পরিতোষ খেঁকিয়ে উঠল। অতীন ভয়ে জড়সড়। পুলিসটাকে একেবারেই পছন্দ নয়।

“আন্দাজ করতে পারি চতুর্বেদী আর ডাক্তার ছিল”

“তুমি কী করে বোতলটা সরালে?” পরিতোষের সোজা প্রশ্ন। জেনে গেছে ওই সরিয়েছে।

সত্যি বলাই ভালো। খাজা পুলিসটা প্রশ্ন করছে “পরের দিন সকালে রিসর্টে ঢুকে ডামাডোলের ফাঁকে পুলিস আসার আগে সরিয়েছিলাম”

“সোহমের কেসে কী হয়েছিল?” স্নেহাশিসের প্রশ্ন।

“কী হয়েছিল বলতে পারব না, কারণ আমি ওখানে ছিলাম না। আমাকে চতুর্বেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডে এরকম অনেক সুপারি কিলার চেনা”

স্নেহাশিস পরিতোষের দিকে তাকাল। প্রফেশন্যাল কিলার সম্বন্ধে আগেই আলোচনা হয়ে গেছে। অতীন হতে পারে না। দক্ষতার সঙ্গে এক কোপে গলার আর্টরি কেটে খুনের পরেই বুঝতে পারে প্রফেশন্যাল লোকের কাজ। অতীন বিশাল চক্রে চুনোপুঁটি। মাস্টারমাইন্ড নিয়েই সন্দেহ, দাঁড়িপাল্লার ভার কোন দিকে হেলে।

“ম্যাথেরনের অ্যাকসিডেন্ট প্ল্যান্ড?”

“আমিই করিয়েছি। আমায় বাধ্য করা হয়েছিল। শাসানো হয়েছিল, না করলে শেষ করে দেওয়া হবে। মুম্বাই থেকে লরি ভাড়া করি ম্যাথেরনে সিফটের আছিলায়।

“লরি কিংবা ড্রাইভারের ইতিবৃত্ত আছে?” স্নেহাশিস প্রশ্ন করল।

“মনে নেই। নির্দিষ্ট জায়গায় দেখা করে কী করতে হবে বলি”

“কে ধমকেছিল?”

“ভওয়ানিশঙ্কর বাবা। সাংঘাতিক লোক”

সবাইয়ের ভোল ফাঁস করে দেবে। কী আসে যায়? ওরাই ঘোল খাইয়ে ওকে ফাঁসিয়েছে। থোরাই আসে যায়। মনে মনে অতীনের প্রতিজ্ঞা।

“কী করে ম্যাথেরনে রাতে ওদের গতিবিধি জানলে?” পরিতোষ কঠোর।

“স্যার, চতুর্বেদীর মুম্বাইয়ের মৌসিকে আগে থেকেই চিনত। ওর কাছ থেকেই খবর পেয়েছিল। বাবাও জানত” রোশনের রিপোর্টেও এর উল্লেখ আছে “অঙ্কুরকে মারার জন্য অন্য তিনজনকে মারা ওদের কাছে কোনও বড় ব্যাপার নয়। খালি সন্নিধি বেঁচে গেল, একটুর জন্য”

“মৌসির নাম কী শিবানী করঞ্জওয়ালা?”

“হ্যাঁ”

“লরিতে কারা ছিল? কোথায় থাকে?”

“জানি না। চতুর্বেদী বলেছিল আগের দিন ওদের সঙ্গে দেখা করে বুঝিয়ে দিতে”

“আমরা জানি তুমি ম্যাগনাম টাওয়ার্সে গেছিলে যেদিন সুনেত্রা ঝাঁপ দেয়”

অতীন ঘামছে। এটাও!

“ভিজিটার্স রসটারে শিরিনের নাম নিয়ে ঢুকেছিলে কেন? ওকে চিনতে?”

“চিনতাম না। চতুর্বেদী বলেছিল। হয়ত ওকে চেনে”

“ওখানে কী হয়েছিল?”

অতীন চুপ। ইতস্তত করছে। পরিতোষকে উঠে এগিয়ে আসতে দেখে অতীনের হার্টবিট বেড়ে গেল। যদিও ভয় দেখানো ছাড়া কোনও অভিপ্রায় ছিল না।

“বলছি। সব বলছি। উনি যেন হাত না দেন” পরিতোষের দিকে ইঙ্গিত।

স্নেহাশিস ওর দিকে ফিরে বলল “ঠিক আছে। অতীন বলবে বলেছে। তাই না?” পরিতোষ বসে পড়ল।

“গাড়ি করে গেলাম...”

“কালো স্যানট্রো?” মধুসূদন বাধা দিয়ে প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ। গাড়ি পার্ক করে সুনেত্রার ফ্ল্যাটের বেল বাজাই। বাবা আগেই বলে রেখছিল। সুনেত্রার জন্য বাবার পাঠানো প্রসাদ আর বই নিয়ে ঢুকি। কোকাকোলা খেতে চাই। দুটো গ্লাস আর বোতল নিয়ে আসে। খাওয়ার সময় চতুর্বেদীর দেওয়া পাউডার ওর গ্লাসে মিশিয়ে দিই”

“কীসের পাউডার? নাম জানো?” এএসআই ফরেনসিক সনাতন মিত্রের প্রশ্ন।

“না স্যার” জানার কথা নয়। নিশ্চয়ই ওকে বলেনি।

“তারপর?”

“কিছুক্ষণ পরেই সুনেত্রা অদ্ভুত ব্যবহার করতে লাগল। ঘরে ছোটাছুটি থেকে বারান্দায়...”

“তারপর?” পরিতোষ জিজ্ঞেস করল।

কেঁপে উঠে দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকল। কাঁদছে “আমি করতে চাইনি স্যার”

“একটা ব্রেক নেওয়া যাক” স্নেহাশিস মাইকে রেকর্ড করল “কোয়েশ্চেনিং ইন্টারাপ্টেড ফর লাঞ্চ ব্রেক”

লাঞ্চে স্নেহাশিস রোশনকে ফোন করল “চতুর্বেদী কো অন্দর করো। বড়ি মছলি”

“অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বিনা কেইসে?”

“অ্যারেস্ট কেও? অফিস মে বুলা লো। মিঠে সে বাতচিত করো। ম্যায় অভি তক অতীনকে কোয়েশ্চেনিং ডিটেলস ভেজতা হু”

“মুঝে পহেলে টেপ শুননা হ্যায়। ফির চতুর্বেদী সে বাত”

“চলো সহি। আজকে কোয়েশ্চেনিংকে কপি সামকে ব্লু ডার্ট মে ভেজ রহা হু। চতুর্বেদীকো অন্দর করনে কে লিয়ে কাফি। সময় বহত কম” সনাতন মিত্রকে কোয়েশ্চেনিং-এর কপি কুরিয়ার করতে বলল।

“কোয়েশ্চেনিং অফ অতীন রায় ২১ সেপ্টেম্বর দুপুর ৩ ৩০” পরিতোষ রেকর্ড করল।

“নীলকান্থর মৃত্যু। শঙ্খমালা মুখার্জির কাছে ব্যঙ্গালুরুতে প্রেসক্রিপশন কে নিয়েছিল?” স্নেহাশিস প্রশ্ন করল।

“শঙ্খমালা মুখার্জি! আমি তো ঐত্রেয়ী মুখার্জির কাছে নিয়েছিলাম। কে শঙ্খমালা মুখার্জি?”

তাহলে ঐত্রেয়ী মুখার্জিই শঙ্খমালা মুখার্জি সেজে চেন্নাইতে ইনসুলিন নিয়ে গেছিল।

“ঐত্রেয়ী কেন নেবে?” মধুসূদনের হিসেব মিলছে না।

“আমরা ওকে ব্ল্যাকমেল করেছি। শহরের বাইরে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ইন্টারকোর্সের ভিডিও তুলে”

“গুডনেস!” স্নেহাশিস আঁতকে উঠল। নিশ্চয় কম্পালসিভ কারণ আছে।

“ঐত্রেয়ী কোথায়?”

“বিয়ে করে অ্যামেরিকায়” অতীনের জবাব। মধুসূদন স্নেহাশিসকে পাশে নিয়ে বলল “জানলাম ইউএস সিটিজেনকে বিয়ে করে দেশের বাইরে। ওকে ধরা মুস্কিল”

স্নেহাশিস মাথা নাড়ল, বুঝেছে। কে ইনসুলিন পুশ করেছিল জানা যাবে না। ঐত্রেয়ীও হতে পারে, কিংবা অন্য কেউ। কাল্পেবিলিটি থেকেই যায়।

“কে প্রেসক্রিপশন দিয়েছিল?”

“ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়” অতীনের তো হারাবার আর কিছু নেই।

“ভওয়ানিশঙ্কর আর চতুর্বেদী কী করে?”

“একে অপরের বহুদিনের চেনা। স্মাগলিং, ড্রাগস, প্রস্টিটিউশন সব কিছুর প্রমোটার। ম্যাথেরনের আশ্রম দিখাওয়া”

“খুন?”

“তাও”

“তুমি এদের সঙ্গে কী করে জড়ালে? তুমি তো মেহুলির সঙ্গে কাজ করতে”

“যদ্দিন বিপিনদা বেঁচে ছিল মেহুলির থ্রু দিয়ে মডেলিং এজেন্সি দ্য নিউ এজের সঙ্গে পরিচয়। ও তো সামান্য মাইনে দিত। কদ্দিন ওর খিদমত করব? আমার তো ইজ্জত আছে”

অতীনের ইজ্জত! স্নেহাশিস হাসল।

“তারপর?”

“যদ্দিন বিপিনদা বেঁচে ছিল, ওই ছত্রছায়া থেকে বেরোইনি। মারা যাওয়ার পর ভওয়ানিশঙ্কর ভালো চাকরির অফার দেয়। তখন দ্য নিউ এজে জয়েন করি। ভাবিওনি কোনও অসামাজিক কিছু করছি। তারপর ওরা হুমকি দিয়ে কাজ করাতে শুরু করে। অনেক টাকা। যদিও ওদের সঙ্গে লিখিতপড়িত কিছু হয়নি”

“ভওয়ানিশঙ্কর আর চতুর্বেদী কী ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেনে?”

“অবশ্যই। দ্য হেভেনে তো ওদের মিটিং হয় সেদিন”

“তাদের কী কোম্পানির সঙ্গে কোনও চুক্তি আছে?”

“বলতে পারব না”

“আজকের দিনের মতো এখানেই। কালকে আবার। আশা করি সদুত্তর দেবেন” সেদিনের মতো স্নেহাশিস যবনিকা টানল।

“আরও প্রশ্ন?”

পরিতোষ রক্তচক্ষু “হাজারটা। যতক্ষণ না সব সত্যি বেরয়। বুঝলে?”

অতীন চুপ।

“কোয়েশ্চেনিং অফ অতীন রায় ক্লোজড ফর ২১ সেপ্টেম্বর ৬ ৩০ পিএম” পরিতোষ রেকর্ড করল।

নেক্সট সকাল ১০-৩০ আবার চারজনের সঙ্গে সেশন।

“একটাও মিথ্যে নয়, বুঝলে” স্নেহাশিস মনে করিয়ে দিল। অতীন মাথা নাড়ল।

“পৌরভির খুন কী করে?”

“আমার ওখান থেকে গোবিন্দকে ডাক্তারবাবুর কাছে আনি। একদিন ডাক্তার সাহেব আমায় এমপিথ্রি প্লেয়ার দিয়ে বললেন চেন্নাইয়ের কাছে একজন অ্যাকট্রেসকে দিয়ে আসতে। সিল্ড প্যাকেজ, খোলা বারণ। ডাক্তারই মহাবালিপুরমের ওই ফিল্ম ইউনিটে গোবিন্দর চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়। ওকে দিয়েই ওটা পাঠিয়ে দিই। আমাকে শুধু গোবিন্দর বন্ধু কেষ্টর দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছিল”

“তুমি কী জানতে ওতে বোমা আছে, যা পৌরভির মৃত্যুর কারণ?” মধুসূদন জিজ্ঞেস করল।

“তখন জানতাম না। পৌরভির মৃত্যুর পর জানলাম”

“কোত্থেকে এক্সপ্লসিভ পেয়েছিল?”

“চতুর্বেদী। ওদের কথায় জানতে পারি, চতুর্বেদী মুম্বাইয়ের বম্ব এক্সপার্ট দিলীপ কাম্বলের কাছ থেকে, ওরা ডাকত ধমাকা”

“ধমাকা মুম্বাইতে কোথায় থাকে?”

“জানি না। চতুর্বেদী নিশ্চয়ই জানে”

লোকেশ চাডার মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন করার দরকার নেই। মধুসূদনের কাছে নেশার ঘোরে নিজেই সব আওড়ে দিয়েছে। যদিও রেকর্ডের জন্য অতীনকে আবার বলতে বলল। তাও রেকর্ড করা হল।

সকাল ১১-৩০ । স্নেহাশিস বাইরে বেরিয়ে রোশনকে ফোন করল “কুরিয়ার মিলা?”

“ফোন কিয়া। ভেজ রহে হ্যায়”

ফিরতে বলল “সব তো রেকর্ড করা হল”

আনন্দিত অতীন। এবার ওরা ফাঁসুক। ভেবেছে ওকে ফাঁসিয়ে পার পেয়ে যাবে? দেখিয়ে দিয়েছে কী করতে পারে।

“কতক্ষণ থাকতে হবে স্যার?”

“যাবে কোথায়? এখনও আমার শেষ হয়নি। আমাদের আতিথিয়তা পুরো হজম না করে মুক্তি নেই। ভেবে দেখ, সাহায্য করবে” পরিতোষের ধমকানিতে অতীন উঠতে গিয়ে বসে পড়ল “মাস্টার ব্রেন কার?” অতীনকে চুপ করে থাকতে দেখে হুংকার “উত্তর দেবে, না দাওয়াই শুরু করব?”

“বলে দেওয়াই ভালো” স্নেহাশিস মাটের ভূমিকায়।

“আর বললে ওরা খতম করে দেবে”

“খতম তো হয়েই গেছ। তবে আর কেন?” পরিতোষ রণমূর্তি।

“এতসব যখন বললে, বাঁচার একটাই উপায়। অ্যাপ্রুভার হয়ে যাও। শাস্তি কম হবে” স্নেহাশিস বোঝাবার চেষ্টা করল।

“অ্যাপ্রুভার কী?”

স্নেহাশিস বোঝাল। অতীনের চোখ চকচক করছে। ওরা ফাঁসিকাঠে ঝুলবে। নিজে বেরিয়ে যাবে “ছেড়ে দেবে?”

“বলতে পারব না। শাস্তি কম হবে। বিবেকের থেকেও মুক্তি পাবে”

“কী জানতে চান?” স্নেহাশিসকে জিজ্ঞেস করল।

“মাস্টারমাইন্ড কে? ভওয়ানিশঙ্কর?”

অনেকক্ষণ মেঝেতে তাকিয়ে চুপ। ভেতরে উথাল পাথাল ভৌতিক সাম্ভা নাচছে। তাকিয়ে গভীর শ্বাস নিল।

“ভওয়ানিশঙ্কর তো চতুর্বেদীর মতো এই চক্রের...” নামটা শোনার জন্য উদগ্রীব। সব উপখ্যানের গানা যখন শুরু করেছে, শেষটাও করবে। আর লুকাবার কী আছে? তার তো কিছু হারাবার নেই।

নাম শুনে সবাই স্তম্ভিত, নির্বাক। ভাবতেও পারছে না। একমাত্র মধুসূদন ছাড়া।

“ফাইন্যাল কোয়েশ্চেনিং অফ অতীন রায় ক্লোজড ফর ২২ সেপ্টেম্বর ২ পিএম” স্নেহাশিস ফিসফিস করে মাইকে...

রোশন বাড়িতে রবিবার সকালে বসে স্নেহাশিসের পাঠানো টেপটা শুনছিল। কাল পাওয়ার পর থেকেই বেশ কয়েকবার শুনেছে। হতবাক বিস্ময়ে।

ফোনে স্নেহাশিসকে প্রশ্ন “ঔর কেয়া ইনফরমেশন অতীন রায় দিয়া?”

“জো ভেজা ওহ শুনা?”

“বহতবার”

“ইয়ে তো সিরফ এক ঝলক। পুরা কাহানি শুন” অতীনের বয়ান যতটা সম্ভব বলে গেল “পুরা রেকর্ডিং ভেজতা হু”

“বিসওয়াস নেহি হোতা”

টেপের কপি রোশন ছাড়া দিলওয়ান সিং, বিনোদ রাঠোডকে পাঠিয়ে দিল।

রোশন চতুর্বেদীকে ফোন করল “রোশন শেঠ”

আধা চিকেন তন্দুরি আর দু-বোতল বিয়ার খেয়ে ঝিমুনি এসে গেছিল। বিরক্ত হল। ইয়ে কমবক্ত পোলিসওয়ালেকো কেয়া হুয়া। ইতবার কে দিন ভি শোনে নেহি দেগা।

“হাঁ সাহাব। কেয়া কর সকু?”

“সহায়তা চাহিয়ে”

“আপকে সেবা মে ইয়ে বন্দা হর ওয়াক্ত মজুত”

“ফোন মে সব বাত হো নেহি সকতা। কল মেরে অফিস মে আয়েঙ্গে?”

চমকে উঠল! কী হতে পারে, ডেকে পাঠাচ্ছে “তকলিফ কেয়া সাব?”

“জাদা নেহি। ভওয়ানিশঙ্করকে বারে মে কুছ পুছতাছ”

অসুবিধে নেই। আগের গল্পটাই আবার আওড়াবে।

“কব?”

“দশ বজে”

“ঠিক হ্যায়”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%