পঁচিশ

অনিরুদ্ধ বসু

“আবার খুন?” নস্যি শুঁকে শঙ্করদয়াল বলল।

“হওয়ারই তো ছিল। নয় কী?” মধুসূদনের নির্বিকার জবাব।

“মানে?”

“নইলে অঙ্ক মেলে না”

“অঙ্কটা কী?” তড়িৎ অন্য কিছু ভাবছিল। মধুসূদনের দিকে ফিরল।

“মৃত্যুটা উপলক্ষ। কেন খুন, কোথায়, কীভাবে সেটা পুলিসের ব্যাপার। আমাদের আড্ডার নয়। কিন্তু মৃত্যু হয়েছে, আরও হবে। কেন হচ্ছে সেটাই বোঝার”

“বুঝব কী পল্টুর চায়ের দোকানে বসে?” শুভঙ্কর ব্যঙ্গ করল।

মধুসূদন কথাটা ঘোরাতে বলল “আজ সিঙারার বদলে মোগলাই পরোটা অর্ডার দিলে হয় না?”

এতদিন মধুসূদনকে দেখছে। সাহেবরা যেমন সেলিব্রেশনের সময় শ্যাম্পেন খোলে, মধুসূদন চাঞ্চল্যকর কিছু উন্মোচনের সময় মোগলাই অর্ডার দেয়।

তাপস হাঁকল “পল্টু চার প্লেট মোগলাই। টুকরো টুকরো করে কেটে দিস। মনে হচ্ছে একটা দিশা খুঁজে পাচ্ছ?”

“ঠিক দিশা নয়। একটা ধোঁয়াটে হিসেব মেলাবার চেষ্টা করছি। এই খুনগুলো নিয়ে যদি ভাব, কীভাবে হয়েছে ভুলে যাও, দেখবে যারা খুন হয়েছে তাদের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য আছে”

“কী সামঞ্জস্য?”

“বিদ্বান ছেলে, সুন্দরী মেয়ে”

এতক্ষণ ওরা খুনের উপায় আলোচনায় ব্যস্ত ছিল, লিঙ্ক খোঁজার চেষ্টায়। লিঙ্কটা যে কোথায়, ঠিক ঠাহর করতে পারছিল না। কারা খুন করছে স্বতন্ত্র। কীভাবে করছে আরও স্বতন্ত্র।

কুঞ্জবিহারী বলল “এতক্ষণ আলোচনা করছিলাম কোনও ডাক্তার ইনভলভড কি না। দক্ষিণের হিরোইনটা তো বোমা ফেটে মারা গেছে। তাই ডাক্তারি থিওরিটাও ভুল। হয়ত মেন ইস্যু নয়”

“ভুল বলা ঠিক হবে না। বলা যেতে পারে, শুধু ডাক্তার নয়, আরও অন্য কেউ আছে”

মধুসূদন বলল “ঠিক বলেছ। একজনের কাজ নয়। পেছনে বিরাট চত্রু”

“কীসের চত্রু? কেনই বা খুন?”

“সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তোমরা বলতে পারবে?”

শঙ্করদয়াল মোগলাইতে কামড় দিল “মনে হচ্ছে মানসিক ভারসাম্যহীন লোকের কীর্তিকলাপ”

“মানসিক ভারসাম্যহীন লোক এত নিখুতভাবে খুনগুলো করবে? বিশ্বাস হয় না” তাপস বাধা দিল।

“তাহলে কে বা কারা?” তড়িতের প্রশ্ন।

“ঠিক উলটো। বুদ্ধিমান লোকের কাজ। কিন্তু কেন?” শুভঙ্কর বলল।

“ওই কেনটাই তো আসল প্রশ্ন। উত্তর পেলে খুনের ঠিকানাও পাবে”

“গণিততত্ত্ববিদ খুনগুলো পাটিগণিতের অঙ্কের মতো খেলছে”

“কী গণিত?”

“দুটো খুন বাংলায়। দুটো মহারাষ্ট্রে...”

“দুটো নয় চারটে”

“বেশ মানলাম চারটে। এর মধ্যে কয়েকটা আনুষঙ্গিকও হতে পারে। সে প্রশ্নে যাচ্ছি না। দুটো দক্ষিণে”

“তুমি কি বলতে চাও এর পরের দুটো উত্তরে হবে?”

“হওয়াটাই স্বাভাবিক। নয় কি?” মধুসূদন ভাবছে।

তড়িৎ সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বললঃ

“কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, গুজরাট থেকে মণিপুর, বঙ্গোপসাগর থেকে আরবসাগর আমি ঘুরছি, শুধু ঘুরছি। ব্রেনের চাকা ঘুরছে না কেন?”

তাপস ঠাট্টা করল “পাখাটা এখনও ঘুরছে। ঠিক কুড়ি বছর আগের স্পিডে। যথেষ্ট হাওয়া খেলছে। মাথা ঠান্ডা রাখার পক্ষে কাফি। কিন্তু ব্রেন ওয়েভটা ঠিক খেলছে না”

শঙ্করদয়াল মাঝখানে টিপ্পনী কাটল “ব্রেন ওয়েভটা খেলতে শুরু করেছে”

“কী?” একসঙ্গে সকলের প্রশ্ন।

“একটা জিনিস কমন, সবাই উচ্চবিত্ত কিংবা বড়লোক। অথবা বড়লোকের ছেলে বা মেয়ে”

“সোহম মধ্যবিত্ত ঘরের” মাথা নাড়ল সবাই।

মধুসূদন শুনছে। ভাবছে মোগলাই পরোটা বেশি না খেয়ে ফেলে। রাতে অম্বল হলে গিন্নির কাছে ধাতানি। যদিও কাল রবিবার।

“র‍্যান্সমের ব্যাপার থাকতেও পারে। যারা মারা গেছে তাদের বাবার কাছে র‍্যান্সম কী দাবি করা হয়েছিল। সেটা তো আমরা জানি না। নন পেমেন্টে খুন”

“এরাই শুধু?”

“শুধু এরা নয়, আরও অনেকের কাছেও এই র‍্যান্সম দাবি করা হয়েছে। তারা হয়ত দিয়ে দিয়েছে। তাই বেঁচে গেছে। তাদের কথা আমরা জানি না”

কুঞ্জবিহারী বলল “হতে পারে। পেছনে টাকা লেনদেনের ব্যাপার। কারণ যাই হোক না কেন, এটা একজনের কাজ নয়। এর পেছনে গোষ্ঠী থাকাই স্বাভাবিক” মাথা নাড়ল মধুসূদন।

“দেখ তো মধুসূদন রিপোর্টের মধ্যে গোষ্ঠীর ইঙ্গিত পাও কি না? যদি পাও, তবে এই গোষ্ঠী চত্রেু জড়িয়ে”

ততক্ষণে মধুসূদন চার টুকরো মোগলাই শেষ করে ফেলেছে। পেট ভরে গেছে। বাড়ি গিয়ে খেতে হবে। না খেলেই গিন্নির গঞ্জনা “সারাদিন এত কষ্টে রান্না করি। শেষে কি না বাবু বাইরে মোগলাই সাঁটিয়ে ফিরলেন। বাসি খাবারগুলো একাই খাব? বলি, বয়স হচ্ছে। সে ব্যাপারে বাবুর হুঁশ নেই। তোমার কিছু হলে, আমায় দেখবে কে?”

শুধু গিন্নির আশঙ্কা নয়, প্রত্যেকেরই মৃত্যু নিয়ে ভয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%