অনিরুদ্ধ বসু
স্নেহাশিস মধুসূদনের ঘরে ঢুকে বলল “সিন অফ ত্রুাইমে মেহুলির ঘরে যে ছেঁড়া ছবিটা পাওয়া গেছিল, সুনেত্রার কম্পিউটারেও। কম্পিউটার এক্সপার্টের রিপোর্টটা দিতে পারবেন? আমারটা আর মেহুলির পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট”
ফাইল বার করে মধুসূদন বলল “এগুলো রেকর্ড ডকুমেন্টস। একটু বসুন, আমি কালার জেরক্স করিয়ে আনাচ্ছি” অনাদিকে জেরক্স করতে পাঠিয়ে দিল।
“চা খাবেন?”
“হলে মন্দ হয় না” বসে স্নেহাশিস বলল।
মধুসূদন কাউকে চা আনার কথা বলতে গেছে। ঘরের চারদিকে দেখল। ফাইল, ফাইল আর ফাইল। লোকটা এই ফাইলের মধ্যে বাঁচে কী করে? এটাই ওর চাকরি। এছাড়া ওর কীই বা করার আছে? ফাইলের স্তূপের দিকে চেয়ে। কত কেস ঝুলে। কটা কেসের কিনারা হয়েছে? আরও কুড়িটা বছর ঝুলে থাকবে। অনেক কেসের কিনারাও হবে না। কোর্টের নাগপাশে এ বেঞ্চ থেকে ও বেঞ্চ, লোয়ার কোর্ট থেকে হাই কোর্ট সেখান থেকে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছতে গোটা জীবন পার হয়ে যাবে। বিচারের বাণী নিভৃতে বসে কাঁদবে এই ফাইলের অন্তরালে।
মধুসূদন ফিরে বসে বলল “ছবি নিয়ে আপনারা যে মানুষটিকে খুঁজছেন, ডিসিডিডি ইন্দ্রজিৎ কর পুরকায়স্থও চেন্নাইয়ের খুনের কেসে এমনই একজনকে খুঁজছে। এই লোকটি সেই লোকটিও হতে পারে। একটু কথা বলে নেবেন”
“নিশ্চয়ই। আপনার কী মনে হয় একই মানুষ?”
“কী করে বলব? আপনারা ইনভেস্টিগেশন করেন। আপনারাই উত্তর দিতে পারেন। তবে রিপোর্টগুলো এখানে আসে। লিঙ্ক থাকলেও থাকতে পারে। আমি শুধু ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাটি করি। যে নম্বরটা ট্রেনের টিকিটে মেহুলির সিন অফ ত্রুাইম থেকে পেয়েছিলেন, ওটা একজন মৃত ছেলে সোহম সান্যালের নম্বর। পরিতোষ সেনের ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টে উল্লেখ আছে। রিপোর্টটা পড়ে দেখবেন?”
“দিন” চায়ে চুমুক দিয়ে রিপোর্ট পড়ছিল। ডায়রিতে নম্বরটা লিখল, ৯৪৩২২ ৫১২৬০। এই নম্বরই তো পেয়েছিল মেহুলির ইনভেস্টিগেশন করতে গিয়ে ট্রেনের টিকিটে। রিপোর্ট পড়া শেষ হওয়ার আগে চা শেষ “রিপোর্টে তো বলছে ওই মোবাইলের ট্রেস পাওয়া যায়নি”
“মোবাইল নম্বরটা ট্র্যাক করলে হদিস পেতে পারেন”
“বিএসএনএল থেকে কল রেকর্ডসের কপি জোগাড় করতে হবে। সঙ্গে লিঙ্কড ল্যান্ডলাইন নম্বরও”
মধুসূদন তার ডায়রি থেকে বলল “যদি সেই সঙ্গে আরেকটা নম্বরের একটু খোঁজ দিতে পারেন...” নম্বরটা চিরকূটে লিখে দিল স্নেহাশিসকে।
“এটা কার নম্বর?”
“জানি না। সোহমের পকেট থেকে এএসআই পরিতোষ সেন পেয়েছিল। রিপোর্টে মেনশন করা আছে। মৃত্যুগুলোর সঙ্গে লিঙ্ক থাকতেও পারে”
জেরক্স এসে গেছে। নিয়ে, চিরকূট পকেটে পুরে উঠে পড়ল স্নেহাশিস।
শের-ই-পাঞ্জাবের রিসিটটা ৯ নভেম্বরের। অথচ মেহুলি ‘দ্য হেভেনে’ চেক-ইন করেছিল ১১ নভেম্বর। বাকি দুদিন কোথায় ছিল? মেদিনীপুরের সব হোটেলের বুকিং রস্টার চেক করে কপি জোগাড় করতে শুভাশিসকে লাগিয়ে দিয়েছে। মেহুলি রায়ের নামে বুকিং ছিল কি না? কোর্টে কেস উঠলে এভিডেন্সের প্রয়োজন।
ইন্দ্রজিৎ কর পুরকায়স্থকে লালাবাজারেই পাওয়া গেল। স্নেহাশিস তার থেকে অনেক জুনিয়র “একটু বিরক্ত করলাম স্যার”
“আইপিএসের পর আমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট মেদিনীপুরে। আপনার জন্য কী করতে পারি?”
“আমি মুম্বাইয়ের মডেল মেহুলির মার্ডার কেস ইনভেস্টিগেট করছি। সিন অফ ত্রুাইমে একটা ছেঁড়া ছবি পাই। পরে আমাদের মুম্বাইয়ের কাউন্টারপার্ট রোশন ওখানে একজন সুনেত্রা আগারওয়ালের ডেথ ইনভেস্টিগেট করতে গিয়ে ওই মেয়েটির কম্পিউটারে একজনের ছবি পায়। কম্পিউটার এক্সপার্টরা সুপার-ইমপোস করে কনফার্ম করে দুটো ছবি একই লোকের”
“আমার কাছে কেন?”
“রেকর্ড সেকশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার মধুসূদন মুখার্জির কাছে ওই ছবি আর রিপোর্ট কালেক্ট করতে গিয়েছিলাম। উনি বললেন, চেন্নাইয়ের কোনও মার্ডারের ব্যাপারে আপনি একজনকে খুঁজছেন। হয়ত এই সে হতে পারে”
“হতে পারে। ওখানকার চিফ সেত্রেুটারির ছেলে খুন হওয়ায় ওরা ইনভেস্টিগেট করে পায় ইনসুলিন দিয়ে তাকে খুন করা হয়েছে। ব্যাঙ্গালুরুর ক্যাশ ফার্মেসি থেকে কেনা। ক্যাশ ফার্মেসি থেকে জানা যায় প্রেসক্রিপশনটা একজন কলকাতার প্লাস্টিক সার্জেন ইসু করেছিল। থিয়েটার রোডে ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেম্বার। খুন হয় ১৩ মার্চ। প্রেসক্রিপশন ১১ মার্চের। দ্যাট মিনস দ্য হোল থিং ওয়াজ প্ল্যান্ড। কুরিয়ারে চেক করেছি। কুরিয়ারে পাঠানো হয়নি। ইট মাস্ট হ্যাভ বিন বাই হ্যান্ড, ক্যারেড বাই সাম ওয়ান”
মেহুলিও থিয়েটার রোডের ক্যাশ টিল থেকে টাকা তুলেছিল। তবে কী সে ডাক্তার দেখাতে কলকাতায় এসেছিল? মেহুলির ভিসেরা রিপোর্টে তিনটে ড্রাগ পাওয়া গেছে - টলবিউটামাইড, গ্লেনেসারাইড আর অ্যালজোলাম। এখন ইন্দ্রজিৎ স্যার বলছেন, চেন্নাই মার্ডারও ইনসুলিন দিয়ে। ডাক্তারি মগজ না থাকলে এভাবে মেডিক্যালি মার্ডার সম্ভব? ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ক্রসচেক করতে হবে।
“ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় তো নিজেই ব্যাঙ্গালুরুতে দিয়ে আসতে পারতেন”
“পারতেন। বাট হি ওয়াজ ইন ডেলহি। ওনার ফ্লাইট ডিটেলস চেক করেছি। মানে অন্য কেউ ডেলিভার করেছিল। আপনার কী মনে হয়, দুজন একই লোক?”
“হতে পারে স্যার। ইনভেস্টিগেট করছি”
“পজিটিভ কিছু পেলে জানাবেন”
“থ্যংক ইউ স্যার” স্নেহাশিস উঠে পড়ল। আজকে আর সময় হবে না। মেদিনীপুর ফিরতে হবে।
শনিবারে ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়ের থিয়েটার রোডের চেম্বারে যখন স্নেহাশিস পৌঁছল, রিসেপশনিস্ট জানাল “উইক এন্ডে চেম্বার করেন না”
“রস্টার দেখে বলতে পারেন ৮ কিংবা ৯ নভেম্বর মেহুলি রায় নামে কেউ দেখাতে এসেছিল?”
“কফিডেনশিয়াল ইনফরমেশন। দেওয়া যাবে না” কাট কাট উত্তর রিসেপশনিস্ট রচয়িতার। আইডি কার্ড দেখাতেই স্বর পালটে গেল “দেখছি স্যার। ৮ বা ৯ নভেম্বর?... হ্যাঁ, ৯ সকাল দশটায়”
“ওই পেজের জেরক্স কপি দিতে পারবেন?”
“দিচ্ছি স্যার। আপনি বসুন”
জেরক্স কপি নিয়ে বেলতলা মোটর ভেহিকেলসে। জানতে হবে ওই ভাড়া ইন্ডিকা গাড়ির মালিক কে? খোঁজ মিলল, পাইকপাড়ার বাসিন্দা জনৈক অমিত কিরণ দেব মালিক। গাড়ির নম্বর বলতেই খাতা দেখে অমিত কিরণ দেব বললেন “গাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন মুম্বাইয়ের একজন মিঃ চতুর্বেদী”
চমকে উঠল স্নেহাশিস! এখানেও চতুর্বেদী!
“ক’দিনের জন্য?”
“সাত দিনের বুকিং। পুরো অ্যাডভান্স পেমেন্ট করেছিলেন”
“গাড়িটা ফেরত পেয়েছিলেন?”
“এখনও পাইনি। সাতদিন পরে চতুর্বেদীর নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। নট অ্যাভেলেবল। পাইকপাড়া থানায় ডায়রি করি। অনেকবার গেছি। হদিস দিতে পারছে না”
“নিজে খোঁজার চেষ্টা করেননি?”
“অনেকবার করেছি। ড্রাইভারেরও পাত্তা নেই। বিহার থেকে এসেছিল। মনে হয় গাড়ি নিয়ে বিহারে ভেগেছে”
“না যায়নি। গাড়িটা দ্য হেভেন রিসর্ট থেকে উদ্ধার করি। ওটা এখন আমাদের থানায়”
অমিত কিরণ দেবের মুখে হাসি “তাহলে গাড়িটা শেষ পর্যন্ত পাব? আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম”
“রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেখালে নিশ্চয়ই পাবেন। চতুর্বেদীর মোবাইল আর ড্রাইভারের নাম-ঠিকানা-লাইসেন্স নম্বর দিতে হবে”
ড্রয়ার খুলে বলল “বসুন স্যার। এখনি দিচ্ছি”
নাম-ঠিকানা-নম্বর নিয়ে ফিরে এল ডিসিডিডির কাছে “স্যার আবার একটু বিরক্ত করছি”
“বিরক্ত কীসের?”
“বিহারে একজন ড্রাইভারের হদিস লাগাতে হবে” নাম-ঠিকানা-ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর দিয়ে বলল “এই লোকটির”
“ঠিক আছে। আমি পাটনার আইজি পাবলিক ট্র্যান্সপোর্টকে ফ্যাক্স করছি”
ইতিমধ্যে শুভাশিস মোবাইলের হদিস জোগাড় করেছে “স্যার ওই প্রি-পেড কার্ডটা দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ৯ নভেম্বর সকালে কেনা। কিনেছিলেন মুম্বাইয়ের এক বিজনেসম্যান চতুর্বেদী। এর বেশি ওরা বলতে পারল না”
“লোকাল অ্যাড্রেস দিয়েছিল?”
“না স্যার। মুম্বাইয়ের অ্যাড্রেস-পাসপোর্ট নম্বর-বাড়ির ঠিকানা-ছবির জেরক্স এনেছি”
“ওয়েল ডান” সাধুবাদ জানাল।
ফ্যাক্স করতে রোশন জানাল চতুর্বেদীর সব ডিটেলস ঠিক। কোনও গড়বড় নেই যে চতুর্বেদী কলকাতায় এসেছিল, কেন? তবে কী চতুর্বেদী আর মেহুলি এক সঙ্গেই এসেছিল? তাই তো মনে হচ্ছে। গাড়িও ভাড়া করে চতুর্বেদী। ওরা কী একসঙ্গেই মেদিনীপুর গিয়েছিল? কোথায় ছিল? মেহুলি ১১ নভেম্বর ওই গাড়ি নিয়ে দ্য হেভেনে একলাই চেক-ইন করে। চতুর্বেদী তো মেহুলির সঙ্গে তখন ছিল না। সে কোথায় গেল?
অফিসে বসে স্নেহাশিস হোটেলের লিস্টগুলো দেখছিল।
শুভাশিস পাশ থেকে বলল “স্যার পুরো চেক করেছি। মেহুলি রায় নামে কোনও হোটেলে কেউ চেক-ইন করেনি। দীঘা, শঙ্করপুর, মন্দারমণি, তাজপুর কোথাও নেই স্যার”
ডবল ভেরিফাই করতে চোখ বোলাচ্ছে। বিশেষ করে দামি হোটেলের রস্টারে। এক জায়গায় থেমে গেল “এই তো মেহুলি রায়। তিনবার দেখেছি”
"না না, চতুর্বেদী। নিউ দীঘার হোটেল অঞ্জলি রিসর্টে চতুর্বেদীর নাম। চেক-ইন করেছে ৯ নভেম্বর। ওই শের-ই-পাঞ্জাবের রিসিটটা যেদিনের। দেখ, লেখা আছে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চতুর্বেদী। নিশ্চয়ই মেহুলি ওখানে ওর সঙ্গে ছিল”
হোটেল অঞ্জলি রিসর্টের ম্যানেজার বলল “মনে আছে স্যার। এত দামি সুটে তো এখানে কেউ সচরাচর বুক করে না। তাই ওনাকে মনে আছে। সঙ্গে ছিলেন এক সুন্দরী মহিলা। কোথায় যেন আগে দেখেছি। সিনেমা বা টেলিভিশনে হবে”
“ক’দিন ছিলেন?”
“দু-দিন স্যার”
“কীসে করে এসেছিলেন?”
“বলতে পারব না। রিসেপশনে খোঁজ নিয়ে বলছি”
রিসেপশনিস্ট অবন্তিকা বলল “মনে আছে স্যার। নামকরা মডেল মেহুলি রায়। টিভিতে প্রায়ই অ্যাড দেখি। চিনতে অসুবিধা হয়নি”
“কীসে করে এসেছিলেন?”
“গ্রে রঙের টাটা ইন্ডিকা। ভাড়া গাড়ি। হলুদ নম্বর প্লেট ছিল”
ছবিটা এখন পরিষ্কার। চতুর্বেদী আর মেহুলি ৯ নভেম্বর সকালের ফ্লাইটে কলকাতায় আসে। এয়ারপোর্ট থেকে একটা প্রি-পেড মোবাইলের সিম কার্ড কেনে। তারপর অমিত কিরণ দেবের কোম্পানি থেকে ইন্ডিকা ভাড়া নেয়। ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে মেহুলি কনসাল্ট করে। পরে শের-ই-পাঞ্জাবে দুপুরে খেয়ে বিকেলে নিউ দীঘার হোটেল অঞ্জলি রিসর্টে চেক-ইন করে।
তারপর?
এই তারপরটাই ধোঁয়াশায়। চতুর্বেদী কোথায় যায়? কেনই বা মেহুলি দ্য হেভেনে একা চেক-ইন করে?
এখনও অনেক কিছুই অজানা। তবুও তো কিছু জানা গেল। তবে কী মেহুলি হত্যার সঙ্গে চতুর্বেদী জড়িত? চতুর্বেদী আগে থেকে মেহুলিকে একলা ছেড়ে সিন থেকে সরে যায়!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।