ছয়

অনিরুদ্ধ বসু

অসিতকে স্নেহাশিস জিজ্ঞেস করল “শেষ কখন জীবিত অবস্থায় দেখেছিলে?”

“কাল রাতে” অসিতের মুখ নিচু।

“কোথায়?”

“ওনার ঘরে আমায় ডেকে পাঠিয়েছিল”

“কখন?”

“ঠিক মনে নেই। ঘড়ি তো নেই। দশটা সাড়ে-দশটা হবে”

“কেন ডেকেছিল?”

“সিগারেট আনার জন্য”

“কী সিগারেট?” স্নেহাশিসের গোল্ড ফ্লেকে সুখটান।

“ইন্ডিয়া কিংস চেয়েছিলেন। এখানে পাওয়া যায় না। তাই ক্লাসিক এনে দিলাম”

“বকশিস দিয়েছিল?”

“হ্যাঁ। দশ টাকা” মাথা নিচু, লাজুক উত্তর।

“ঘরে আর কেউ ছিল?” তাকাল অসিতের মুখে। অনেক সময় মুখের এক্সপ্রেশন দেখে কথার সত্যতা বিচার করা যায়।

“না। একাই ছিলেন” দৃঢ় নম্র উত্তর।

“ড্রিংক করছিলেন?”

“হ্যাঁ। গোলাপি নাইটি পরে খাটে শুয়ে টিভি দেখছিলেন। পাশের টেবলে আধ-ভরা গ্লাস ছিল। বোধহয় ড্রিংক হবে”

“কী করে বুঝলে?”

“মদের গন্ধটা আমার চেনা”

“তুমি ড্রিংক এনে দিয়েছিলে?”

“না। উনি রিসর্টে ড্রিংকের অর্ডার দেননি। নিজেই এনেছিলেন। পাশে বোতলও ছিল"

খটকা লাগল। গ্লাস আর নাইটিটা সুইমিং পুলের ধারে পেয়েছে। কিন্তু বোতলটা গেল কোথায়? ঘরে বা সুইমিং পুলের আশেপাশে তো পাওয়া যায়নি। প্যান্টি, ব্রা তো ঘরেই। হয়ত নাইটি পরে, গ্লাস, বোতল নিয়েই সুইমিং পুলে গেছিল। উলঙ্গ হয়ে নিশ্চয়ই নীচে যায়নি। এত রাতে সুইমিং পুলে কেন? রিসর্টে তো অন্যান্য বাসিন্দাও ছিল। নামকরা মডেল। কারও চোখে পড়তে পারে সি-থ্রু নাইটি পরা মেহুলিকে। সে হুঁশ কী ওর ছিল? ড্রিংকের মাত্রা বেশি হলে হুঁশ হারানো অস্বাভাবিক নয়। হলফ করে বলা শক্ত। সুপুরুষ স্নেহাশিস অনেক মহিলা দেখেছে। বুটিক ড্রেসে বা বিবস্ত্র। দু পেগ পেটে পড়লে, সামনে নীল জলরাশি পেলে, বস্ত্রহীন হওয়ার মাদকতা জাগা অজানা নয়। মহামূল্য সেই ওয়াইনের বোতল কোথায়? কে, কেন ওটা সরিয়ে ফেলল?

রক্ষণশীল পরিবারের শিরিনকে নগ্ন দেখেছে। অহল্যা, অর্চনাকেও। সেসব মনে করতে চায় না। কলেজের উজ্জ্বল যৌবন এখন অতীত। মনে করলেই দুর্গতি। অভ্রদিতার সাজানো সংসারে ফাটল। প্রথম যৌবনের উচ্ছ্বাসকে যেমন বাক্সবন্দি করা যায় না, পরবর্তিকালে বহিঃপ্রকাশ করলে সদ্গতির বদলে দুর্গতি যে অনিবার্য সেটুকু বোঝার বুদ্ধি আইপিএসের টপার স্নেহাশিসের আছে।

“রস্টারে দেখলাম এই ফ্লোরে আরও দুজন ছিল”

“হ্যাঁ। ২০৯ আর ২১১ নম্বর ঘরে”

“ওরা কী করছিল?”

“কী করছিল কী করে বলব? আমার ডাক পড়েনি”

রস্টারে দেখেছে ২০৯-তে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বাজোরিয়া। কার মিসেস কে জানে? জিজ্ঞাসাবাদে এসব প্রসঙ্গ না তোলাই ভালো। সমস্যা হতে পারে। বাজোরিয়া বাংলার নামি ফিল্ম প্রডিউসার। বেশি ঘাঁটাঘাটি করতে গেলে ট্র্যান্সফার কেন, চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। এদের অর্থে পার্টিগুলো রঙিন। ওপরওয়ালারা এদের কেনা গোলাম। এতদিনের চাকরিতে এটা বুঝেছে, কারণ ছাড়া, এদের ব্যক্তিগত জীবনে ছানবিন না করাই ভালো।

২১১-তে গোয়েঙ্কা নামের মারোয়ারি ছোকরা ও তার আশিকি। বাবার কাঁচা পয়সায় মেয়ে নিয়ে বিলাসবহুল রিসর্টে ফূর্তি করতে বাধা কোথায়? করবে না-ই বা কেন? এদের জন্যই তো এই বিলাসবহুল রিসর্টগুলো। দোতালার ফ্লোরটা অপেক্ষাকৃত বিত্তবানদের জন্য। তিনতলায় সস্তার ঘর। অনেক খদ্দের বাঙালি গৃহবধূ। বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে নিশিযাপন করতে উইকএন্ডে এখানে।

ম্যানেজার সত্যসুন্দর মাইতি জানে “সব বুঝতে পারি স্যার। এরাই আমাদের গ্রাহক। তাই ঘাঁটাই না”

সত্যি তো। এদের ঘাঁটালে দ্য হেভেন নরকে পরিণত হতে কতক্ষণ। এদের জন্যই এই রিসর্ট। আমোদ-আহ্লাদের উপভোগ্য উপঢৌকন না জোগাতে পারলে রিসর্ট চলবেই বা কী করে? মধ্যরাতে অনেকেরই কিন্তু সুইমিং পুলে নামার সাহস নেই। প্রয়োজনও পড়ে না। ঘরে কামসূত্র প্র্যাকটিসে ব্যস্ততার মধ্যে ফুরসত কোথায়? সেসব ভাবার বিষয় নয়। আইপিএস টপার বোতলের কথা ভাবছে। গেল কোথায়? হঠাৎ শিরিনই বা কেন এত বছর পর ফোন করল মেহুলির খবর নিতে? নিছক কলিগের জন্য উৎকণ্ঠা? না কি, পেছনে অন্য কোনও স্বার্থ? অন্য কিছু জড়িয়ে? আবেগ সরিয়ে পুলিসের দৃষ্টিতে দেখছে শিরিনকে। মেহুলি এখন বডি নাম্বার! কত সহজেই না জলজ্যন্ত তরতাজা প্রাণ একটা বডি নাম্বার হয়ে যায়। বিবস্ত্র, না নতুন রূপে সজ্জিতা সে নিয়ে এখন কারও মাথাব্যথা নেই।

নাইটি পরে স্নান করা যায় না। তাই ওটা পোলের রডে ঝুলিয়ে নগ্ন হয়ে সুইমিং পুলে স্নান। রাতে আর কে দেখবে? মেহুলি কী সাঁতার জানত? ওয়াইনের নেশায় জলে ডুব দিতে কার না ভালো লাগে? সাঁতার জানে কি জানে না নেশার ঘোরে খেয়াল করার অবস্থায় ছিল না। আত্মহত্যাও তো হতে পারে? সুদূর মুম্বাই থেকে এক নামি মডেল মেদিনীপুরের রিসর্টে আত্মহত্যা করতে আসবে কেন? শুধু নাইটি জড়িয়ে সুইমিং পুলে গেছিল, বোতল গ্লাস সমেত। তারপর? এই তারপরটাই খুনের সূত্র।

“তুমি ওনাকে সুইমিং পুলে যেতে দেখেছিলে?”

“না। বকশিশ নিয়ে ঘরে চলে আসি। ঘন্টি আছে। দরকার হলে ডাক পড়বে। যদিও সারারাত ঘন্টি বাজেনি। কেউ ডাকেনি বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম”

অসিতকে ছাড়ার আগে শেষবারের মতো বাজিয়ে নিল “এখানে থাকার সময় আর কেউ কী ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?”

“না” কী মনে হতে বলল “হ্যাঁ, একজন এসেছিলেন। ধুতি ফতুয়া পরা মাঝবয়সি লোক। মনে হল এখানকারই। বারবার ওনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিল। মেমসাহেবকে জিজ্ঞেস করতে উনি হাত নেড়ে বললেন, কারও সঙ্গে দেখা করতে চান না। একা থাকতে চান। পরে লোকটিকেও আর খুঁজে পেলাম না”

“তুমি চেন?”

“আগে কখনও দেখিনি”

“কীসে করে এসেছিলেন?”

“বলতে পারব না”

“ওই যে বাইরে গাড়িটা রাখা ওতে কে এসেছিল?”

“ওই ইন্ডিকা গাড়িটায় তো মেমসাহেব এসেছিলেন”

“ড্রাইভার?”

“নীচে আছে নিশ্চয়ই। ভাড়া গাড়ি তো”

বন্ধ ইন্ডিকা গাড়িটা আছে, ড্রাইভার বেপাত্তা। হলুদ নাম্বার প্লেট। মানে ভাড়া গাড়ি। অনেক খুঁজেও ড্রাইভারের হদিস পাওয়া গেল না। মৃত্যু দেখে পুলিসের ভয়ে কেটে পড়েছে। কিংবা ইনভলভড্ও থাকতে পারে। কে জানে? ও-ই হয়ত বোতলটা সরিয়েছে। আরেক উটকো ঝামেলা। এখন আবার মোটর ভেহিকলস থেকে গাড়ির মালিকের হদিস বার করা। কেন যে মাগিগুলো মুম্বাই থেকে এখানে মরতে আসে? অর্থ নেই তো কী? আইপিএস হয়ে কোনও ভুল করেনি। অভ্রদিতা যতই কমপ্লেন করুক না কেন, এই উজ্জ্বল, উচ্ছল জীবনের মাদকতায় শান্তি থাকত না। অভ্রদিতাও হয়ত হারিয়ে যেত। ঋজু এ পৃথিবীর মুখও দেখত না। ঈশ্বর যা করেন, মঙ্গলের জন্যেই।

বাজোরিয়া আর মারোয়ারি ছোকরাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তেমন কিছু মেলেনি। বিবস্ত্র মডেল। মুম্বাই থেকে এসে খুন। পুলিস ছানবিন করছে। ওপরে তিনটি বাঙালি যুগল মুখ ঢাকতে স্বাভাবিকভাবে ব্যস্ত। এই চত্রেু পুলিসের জেরায় জড়িয়ে পড়লে বাড়িতে জানাজানি, কেলেঙ্কারি।

সবারই একটা কথা “আমরা কিছু জানি না। উনি যে এখানে ছিলেন, তা-ই জানতাম না”

সুন্দরী বিবস্ত্র মেয়ে মডেল মেহুলি। রিসর্টের সুইমিং পুলে মৃত। আগে বুক না করে হঠাৎ এসেছে। স্নেহাশিস ঠিক বুঝতে পারছিল না, কোন দিক দিয়ে শুরু করবে। শিরিনের কাছ থেকে মুম্বাইতে? না ক্লুগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করবে? তবু তো শিরিন একটা লিঙ্ক। চাইলে হার্টথ্রব স্নেহাশিসকে অনেক কথাই বলে দিতে পারে। ফোনে তার প্রতি টান এখনও প্রকট। শিরিনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

বডি ততক্ষণে পোস্ট মর্টেমে চলে গেছে। মিডিয়ার ভিড়ও ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করেছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে যার মতো করে রং চড়াবে। যত রং, যত ড্রামা, তত খাবে। এ নিয়ে মিলেনিয়াম পার্কে একটা লাইভ অনুষ্ঠানও হতে পারে। কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক। কী হওয়া উচিত ছিল, কী হয়নি, সমাজ কোন দিকে এগোচ্ছে। মতামতের ফুলঝুরি। এসএমএস পোল নিয়ে মিডিয়া বেশ কিছু কামাবে। হতভাগ্য স্নেহাশিস। মাস মাইনেয় সেই মেদিনীপুরে। শেষমেশ এই মৃত্যুর কোনও কূলকিনারা হবে না। একদিন বিগত অনেক ইতিহাসের মতো এটাও স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নেবে। কিংবা কিছুদিন পর তাও হয়ত আর থাকবে না। যদি না কেস কোনও নতুন বাঁক নেয়। তখনও তাকে এই কেস নিয়ে লড়ে যেতে হবে, পাবলিক প্রসিকিউটারের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে।

“হ্যালো শিরিন, ব্যস্ত?”

“না ফ্রি। এই মাত্র শুট থেকে ফিরলাম”

“কোথায় আছ?”

“আন্ধেরিতে। ফ্ল্যাটে। সারাদিনের ধকল। কী আর করা যাবে? যতদিন বয়েস আছে কিছু কামিয়ে নিচ্ছি। বয়েস চলে গেলে তো কেউ পুঁছবে না”

রোম্যান্টিক স্বরে বলল “তুমি চিরযৌবনা। তোমার বয়েস কে কেড়ে নেবে?”

ব্রা-টা ড্রেসিং টেবলের স্টুলে ফেলে, প্যান্টি পরা শিরিন খাটে বসে সিগারেট ধরাল “ফুল চন্দন পড়ুক তোমার মুখে”

“আমার কপালে ফুল-চন্দন নেই। মুখঝামটা আছে”

“কেন?” সিগারেটের ধোঁয়া শূন্যে।

“মেহুলির মৃত্যুর কূল-কিনারা করতে না পারলে এ ছাড়া আর কী জুটবে? কোত্থেকে যে শুরু করি... তুমি যদি মুম্বাই চত্রু সম্বন্ধে না কিছু জানাও”

“ফোনে এসব সম্ভব? মুম্বাই চলে এস”

শুধুই কী নিছক ইনভেস্টিগেশনের জন্য ডাকা? না পেছনে অন্য কোনও অভিসন্ধি? বুঝতে পারল না। মন বলছিল, কোথাও পৌঁছতে হলে মেহুলির রণক্ষেত্র মুম্বাইতে যেতে হবে। পশ্চিম বাংলায় বসে আধখ্যাঁচড়া তদন্ত করা যেতে পারে, কিন্তু আসল যোগসূত্র কোনওভাবেই পাওয়া সম্ভব নয়।

“মেহুলি কী কলকাতার মেয়ে?”

“ওর অরিজিন্যাল বাড়ি কাঁথিতে। যদিও কর্নফিল্ড রোডে থাকত। এখন অবশ্য ওরা মুম্বাইতে সেটেল্ড”

“ওরা?”

“মা আর ও। বাবা গত বছর মারা গেছেন। এক ভাই। শুনেছি দিল্লিতে থাকে”

“কতটা চেন ওদেরকে?”

“প্রফেশনালি এ লাইনে যতটুকু”

শিরিনকে না ধরলে হবে লিঙ্কস পাওয়া যাবে না। তবু যখন বলেছে কাঁথিতে বাড়ি, ওখানে একটু ছানবিন দরকার। যদি কোনও সূত্র পাওয়া যায়। বিশেষ করে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা আগন্তুকের।

“কাঁথিতে কোথায়?”

সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে নিভিয়ে বুকে হাত বুলিয়ে বলল “অতশত জানি না। শুনেছিলাম ওদের দেশের বাড়ি কাঁথি। তুমি কী মুম্বাই আসবে?”

“তুমি ডাকলে না এসে পারি”

এতদিনের লুকোনো ইচ্ছেটা একদিনের জন্য হলেও বাস্তবে। এই আশায় বলল “কবে আসবে?”

“নেক্সট উইক। ফ্রি আছ?”

“তুমি এলে অ্যাসাইনমেন্ট নেব না। ফোন করে দিও। এয়ারপোর্টে রিসিভ করব”

“দরকার হবে না। মুম্বাই পুলিসের গাড়ি আছে। ফোনে জানাব কবে যাচ্ছি”

স্নেহাশিস অভ্রদিতার কথা ভাবছিল। মুম্বাই যাবে শুনলেই অভ্রদিতা বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা বলবে। সে যাক। অনেকদিন যায় না। ঋজুকে নিয়ে নয় কয়েকদিন কাটিয়ে আসুক।

ট্র্যান্সফার পেতে গেলে তো কিছু করে দেখাতে হবে। মেহুলি থাকুক চাই না থাকুক, সেটা বড় নয়। মেহুলির হাত ধরে উত্তরণটা পাকা করলে, মন্দ কী?

কাঁথিতে গিয়ে অনেক ছানবিন করে একটা সূত্র পাওয়া গেল। মেহুলিদের আদি বাড়ি নিউ বাস স্ট্যান্ড এলাকায়। চাকরি সূত্রে বাবা কলকাতায় থাকতেন। মাঝেমধ্যে পুরনো বাড়িতে আসতেন। পুরনো বাড়িটা প্রায় ভেঙে পড়ছে। ইটগুলো খসে খসে পড়েছে। কবে রং করা হয়েছিল বোধহয় বাড়ির বাসিন্দারাও ভুলে গেছেন।

কড়া নাড়তেই দরজা খুলল এক বৃদ্ধা। সত্তরোর্ধ্ব তো বটেই। স্নেহাশিসের মনে হল আশি ছুঁয়েছে। পরনে সাদা থান। বিধবা।

“তুমি কে বাবা?” চশমাটা ঠিক করে বৃদ্ধা ওকে দেখল।

আইডি কার্ড দেখিয়ে ভেতরে ঢুকে বলল “আপনি এখানে একাই থাকেন?”

“হ্যাঁ বাবা। বস” চৌকির ওপর বসল।

বৃদ্ধা ঘরের কোণ থেকে একটা পিঁড়ি টেনে বলল “কী হয়ছে বাবা?”

“আপনি মেহুলির কে হন?”

“মেহুলি!?” ভ্রু কোঁচকাল বৃদ্ধা “বিপিনের মেয়ে? ওকে আমরা কেল্টুস বলি। বিপিন আমার পরের ভাই। ও তো গত বছর মারা গেছে”

“জানি” যেন অনেক কিছুই জানে বিপিনের সম্বন্ধে “বিপিন তো ছেলে-মেয়ে-বউ নিয়ে কলকাতায় থাকত। এখানে আসত?”

“দু-মাসে একবার। ওরা যখন কলকাতায় ছিল। তারপর বম্বে চলে যাওয়ার পর চিঠিপত্রে যেটুকু যোগাযোগ”

“মেহুলি মানে কেল্টুস আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বাবা মারা যাওয়ার পর?”

মাথা নাড়ল “নাঃ। ওরা বম্বেতে বড় হালে থাকে। এই বুড়ি পিসিমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে কেন? ক’দিন বসে এই যক্ষের ধন সামলাব? আমারও তো দিন হয়ে এসেছে” হতাশার সুর।

“এখানে একাই থাকেন?”

“সেই তিরিশ বছর বয়েসে বিধবা হলাম। তারপর থেকেই তো একা। তখন অবশ্য বিপিনরা এখানে থাকত। বিয়ে করল। কেল্টুস হল। তারপর চাকরি নিয়ে কলকাতা চলে গেল”

“আপনি গেলেন না?”

“এই ভিটে ছেড়ে কোথাও যে মন টেঁকে না। বাকি যে কটা দিন আছি, এখানেই কাটিয়ে মরতে চাই”

“আর কেউ নেই?” স্নেহাশিস হাঁটুর ওপর পা তুলল।

“বিপিনের ছোট ভাই নীতিন বরাবরই ডিব্রুগড়ে থাকে। এখানে কোনওদিন আসত না। এখন তো বয়েস হয়েছে। আসতে চাইলেও আর বোধহয় পারবে না”

“মেহুলি মানে কেল্টুসের সঙ্গে আপনার শেষ কবে কথা হয়ছে?”

“বিপিন যখন মারা গেল তখন ফোন করেছিল”

“ধুতি ফতুয়া পরা কোনও প্রৌঢ়কে চেনেন?”

“এখানে ক’জন প্যান্ট-সার্ট পরে বাবা? সবাই তো ধুতি কিংবা লুঙ্গিই পরে। কেন বাবা?”

“একটু মনে করুন তো। যদি ওরকম কেউ চেনা থাকে?”

“অতীন নয় তো?”

“সে কে?”

“আমার ছোট ভাই। নীতিনের পরে”

“ঠিকানা জানেন?”

“কেন জানব না? ওই তো নিউ বাস স্ট্যান্ডে থাকে। যদিও আমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। একবার টাকা চাইতে এসেছিল। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছি। আর এমুখো হয়নি। আরে, সারা জীবন যে দিদিকে একবারও দেখলি না, খালি টাকার সময় তার কথা মনে পড়ে? শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনও সাহায্যই পাইনি। বাপের বাড়ি থেকেও সেভাবে নয়। যেটুকু বা আমাকে একটু করেছে, সে একমাত্র বিপিনই। শেষকালে, মরার আগে এই আত্মীয়-কুটুম্বদের নিয়ে থাকার চেয়ে একা থাকা অনেক ভালো” শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন বৃদ্ধা। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন “আজকাল দয়া-মায়া কমে গেছে। তুমি এসব প্রশ্ন করছ কেন বাবা?”

একটু গুছিয়ে স্নেহাশিস বলল “মেহুলি মানে কেল্টুস আর নেই”

“কী বলছ বাবা! জানতাম এটা হবে। আমি জানতাম। কী হয়েছে?”

“এই মেদিনীপুরেই একটা রিসর্টে খুন হয়েছে। মারা যাওয়ার চারদিন আগে ও মেদিনীপুরে এসেছিল। ভাবলাম হয়ত আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে”

“না তো। করলে তো এখানে এসেই থাকতে বলতাম। ওদেরই তো বাড়ি। এখন ওরা বম্বের ডাকসাইটে লোক। এই পোড়ো বাড়িতে থাকবে কেন?”

“যদি আপনার ছোটভাই অতীনের ঠিকানা আর নম্বরটা দেন”

বৃদ্ধা পিঁড়ি ছেড়ে উঠল “দাঁড়াও দেখি কোথায় আছে” ভেতরের ঘরে এগোতে গিয়ে বলল “পইপই করে বিপিনকে বলেছিলাম মেয়েটাকে বম্বেতে নাচানাচি করতে দিস না। লোভ। বুঝলে বাবা, লোভ। লোভে পাপ। পাপে মৃত্যু” বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

স্নেহাশিস ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সিলিংয়ে প্রাগৈতিহাসিক ফ্যানের দিকে। খসে পড়া প্লাস্টারের ওপাশে ইটের কয়েকটা তাক। তার ওপর সাদা-কালো কয়েকটা ছবি। বোধহয় বৃদ্ধার কম বয়েসের। সঙ্গে যে দুটি লোক তারা বোধহয় ভাই। পাশের বিবাহিতা ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই বিপিনের স্ত্রী। সামনে ফ্রক পরা ছোট শিশুটি সম্ভবত মেহুলি। যখন ছোট ছিল ওরা তো এখানেই থাকত। হয়ত সেই সময়কার ছবি। আজ সেই স্মৃতি ছবি হয়েছে। সম্পর্কটা পুরনো দিনের ছবির মধ্যেই।

মাঝে মাঝে স্নেহাশিসের মনে হয় সম্পর্ক কত ক্ষণস্থায়ী। সব কিছুই প্রয়োজনের হিসেবে বাঁধা। প্রয়োজনের মাপকাঠিতে কখনও তৈরি হয়, কখনও হারিয়ে যায়। পড়ে থাকে স্মৃতি। কেটে যায় জীবন। কিছুই থাকে না। শুধু পড়ে থাকে বস্তাপচা অতীতের পাণ্ডুলিপি। কেউ সেই স্মৃতি রোমন্থন করে জীবনের অর্থ খোঁজে। কেউ তাকে দূরে ঠেলে নিঃসঙ্গ জীবনের বোঝা শুধুমাত্র নিজের বাঁচার তাগিদে টেনে নিয়ে যায়। মানুষের সঙ্গে জীবনের যোগসূত্রটা বড়ই ক্ষীণ।

বৃদ্ধা যখন ঘরে ঢুকছে, স্নেহাশিস তখন চৌকি ছেড়ে উঠে পড়েছে।

বৃদ্ধা ছোট ডায়রি খুলল “দেখ তো বাবা অতীনের নম্বর আর ঠিকানাটা আছে কি না? বুড়ো হয়ে গেছি। আজকাল চোখে ভালোভাবে দেখতেও পারি না। ছানি পড়েছে তো”

স্নেহাশিস ডায়রি থেকে অতীনের ঠিকানা ফোন নোটবুকে লিখল। বৃদ্ধার দিকে বিনম্র হাসি ছুড়ে বলল “অনেক জ্বালাতন করলাম। কিছু মনে করবেন না। আশীর্বাদ করবেন মেহুলি মানে আপনাদের কেল্টুসের মৃত্যুর যদি কূল-কিনারা করতে পারি”

বৃদ্ধা শাড়ি দিয়ে চোখের জল মুছে দরজাটা ভেজাবার আগে বলল “সম্পর্ক না রাখলেও তো রক্তের একটা সম্পর্ক আছে। কেল্টুসের মরার কথা শুনে মনটা ভারী হয়ে গেল। পারবে বাবা, নিশ্চয়ই পারবে। আজকাল তো কোনও খুনের কূল-কিনারা হয় না। দেখ, যদি এই বৃদ্ধার আশীর্বাদ লাগে। আমার তো এ ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই”

“সেই আশীর্বাদটুকুই আপনার ছেলেকে দিন” বেরবার আগে বলল।

ওর দিকে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল “আমার আর্শীবাদ সব সময় তোমার সঙ্গে থাকবে। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন”

লাল বাতি গাড়ির দিকে এগোল। গাড়িটা মিলিয়ে যাওয়ার দিকে চেয়ে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিল বৃদ্ধা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%