এক

অনিরুদ্ধ বসু

সুইমিং পুল থেকে সুন্দরীর বিবস্ত্র দেহ তুলতে দেখে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে অসিত। সুন্দরী অনেক দেখেছে। কিন্তু বিবস্ত্র দেখার সুযোগ বড় একটা হয়নি। এর আগে তো কোনও যুবতীকে এভাবে নগ্ন অবস্থায় দেখেনি। এই পনেরো বছরের জীবনে কত বাবু-মেমসাহেবেদের জন্য চা এনে দিয়েছে, ফাই-ফরমাশও খেটে দিয়েছে। তার জন্য ভালো বকশিশও পেয়েছে।

ছেলেবেলায় ড্যাবড্যাব করে টেপ স্কার্ট পরা পুটিকে কলতলায় বালতি দিয়ে স্নান করা দেখতে গিয়ে, পুটির মায়ের মুখ-ঝামটা খেয়েছিল, সে কথা এখনও ভোলেনি। তারপর আর সাহস পায়নি। তাই ওই দূর থেকে মেমসাহেবদের জন্য চা, বরফ, ভডকা, সিগারেট এনে দেওয়ার ফাঁকে যেটুকু। একটু নেশাগ্রস্ত থাকলে, শিথিল হয়ে যাওয়া নাইটির ফাঁক দিয়ে, এক ঝলক...

ব্যস। তারপর বকসিশ নিয়ে খালাস।

সকালের সোনালি রোদের ঝলকানি উপেক্ষা করে, সাদা কাপড়ে ঢাকা নিথর দেহটা কোন এক বেসুরো রাগ বাজাচ্ছে। ছুটে এসেছে পুলিস। ছুটে এসেছে রিসর্টের বাসিন্দা, কর্মী, কিছু অবস্থাপন্ন কপোত-কপোতী।

হাজার হোক, নামকরা সুন্দরী মডেল বলে কথা। মৃত্যুটা যতই দুঃখদায়ক হোক না কেন, তার খবরটা, জীবিত মানুষের থেকেও অনেক বেশি চনমনে। আর ৫’ ৮” তন্বী বস্ত্রহীন হোর্ডিংয়ে দেখা সুন্দরীকে যদি সুইমিং পুল থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় বার করে আনা হয়, তার চেয়ে বেশি রোমহর্ষক আর কী থাকতে পারে?

স্নেহাশিস চ্যাটার্জি দেহটাকে সাদা কাপড়ে ঢাকার ইঙ্গিত দিয়ে সহকারী শুভাশিসের দিকে তাকিয়ে বলল “ইট লুকস লাইক হোমিসাইড”

মাথা নাড়ল শুভাশিস “স্যার এ তো মুম্বাইয়ের নামকরা মডেল মেহুলি”

“মুম্বাইয়ের মডেল আমাদের মেদিনীপুরের রিসর্টে কী করতে এসেছিল?”

কাপড় দিয়ে দেহটাকে ঢেকে শুভাশিস বলল “দৃষ্টিলোকে ওর অনেক ছবি বেরয়। শাড়ির অ্যাডগুলো দেখেছেন না, ওগুলোতে তো ওরই মুখ”

মুখটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে স্নেহাশিসের। নামকরা মডেল। এখানে-ওখানে দেখে থাকতেই পারে। কাজের মাঝে এসব স্বপ্নসুন্দরীদের পেছনে নষ্ট করার সময় খুব একটা মেলে না। ক্লান্ত দেহে যখন বাড়ি ফেরে, তখন বাচ্চাকে পড়াতে গিয়ে খাওয়ার সময় হয়ে যায়। তারপর রাতে বিছানায় গিন্নির আক্ষেপ।

“তোমার মতো হনেস্ট অফিসার, এই ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরেই পড়ে থাকবে। তোমার আর কলকাতায় পোস্টিং হবে না। ঋজুরও আর ভালো স্কুলে পড়া হবে না। দেখ না, এখন কথায় কেমন উড়িয়া টান এসে যাচ্ছে”

কোথায় বউ জড়িয়ে ধরে একটু আদর-আহ্লাদ করবে, তা না, নিত্যনৈমিত্তিক প্যানপ্যানানি। কেন ঘুষ খায় না? কেন আমলাদের তেল দেয় না? একটা বৈচিত্রহীন পুরনো প্যানাসোনিক টিভির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখদুটো বুজে যায়, বুঝতে পারে না।

মেয়েটি বেঁচে থাকলে, দু-বার ফিরে তাকাবার স্পৃহা একটু-বা থাকত, কিন্তু এখন মৃত মেয়েটিকে নিয়ে আরেক সমস্যা। তদন্ত কর, কেস রুজু কর, পোস্ট-মর্টেম কর। আর শুভাশিসের কথা যদি ঠিক হয়, ফোনে ফোনে ছয়লাপ হয়ে যাবে। মাইনে তো একটুও বাড়বে না, উলটে একগাদা ঝক্কি।

রথী-মহারথীদের ফোন আসবে। কেউ জানতে চাইবে, কেউ চাইবে ধামাচাপা দিতে। আর মিডিয়ারা তো বেলা গড়াতেই ছেঁকে ধরবে। এখন এতগুলো সারাদিনের চ্যানেল। একে অপরের সঙ্গে প্রতিনিয়ত টেক্কা দিচ্ছে। কোনও খবর নেই, তবুও সারাদিন ধরে খবর তৈরি করে যেতে হবে। অগত্যা... বন্ধের দিনে কোনও সুন্দরীকে দিয়ে দেশের ইকনমিক্স সম্বন্ধে আলোচনার আসর বসিয়ে দেওয়া... পেটে বিদ্যে যাই থাক না কেন? তাতে কী? খায় তো। কে একজন কিংবদন্তি বুড়োর ইকনমিক কচকচানি শুনতে চায়? তার থেকে একটা সুন্দরীকে টিভির সামনে বসিয়ে দিলে, টি আর পি তো বাড়বে। অ্যাড আসবে। ব্যবসা রমরম করে চলবে।

খবর না থাকতেও যখন খবর তৈরি করে ফেলা যায়, সেখানে মুম্বাইয়ের নামকরা সুন্দরী মডেলের মৃতদেহ নিয়ে যে ছোটপর্দা ব্রেক করে ফেলা যায়, সেটা মিডিয়ার থেকে আর কে ভালো জানে? তাও আবার বিবস্ত্র অবস্থায়, সুইমিং পুল থেকে দেহ উদ্ধার। সেও আবার মুম্বাই থেকে বহুদূরে। মেদিনীপুরের রিসর্টে। রমরম করে চলবে। যে যত বেশি খবর বার করতে পারবে, তার তত। ফ্যাসাদ শুধু স্নেহাশিস চ্যাটার্জির। হিসেব করে, মেপে কথা বলতে হবে। পান থেকে চুন খসলেই কেলেঙ্কারি। একটা ছোটখাটো বিপ্লব হয়ে যেতে পারে...

আজকাল তো আন্দোলনের হাত ধরে বিপ্লব আসে না। সংজ্ঞাটাই পালটে গেছে। কে কী বলল, কী ভাবে কার কী বলা উচিত ছিল, কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক, এসবই এখন মিডিয়া-বিপ্লবের মাপকাঠি। মরালিটির ঠিকেদার প্রচুর। জ্ঞান দেওয়ার লোকের অভাব নেই। সবাই কিছু বলতে চায়। কেউ শুনতে চায় না। যেন সবাই দেশ ও সমাজের ত্রাণকর্তা, ঠিকাদারি নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছে। ত্রাণের ব্যাপারে কারও আগ্রহ নেই। শুধু ফ্রি জ্ঞানের ব্যাপারে সবাই যেন একটু বেশি রকমের তৎপর।

স্নেহাশিস কারও ঠিকাদার নয়। সে কর্তব্যের দাস। তার এখন মেহুলিকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। অনেক কাজ।

সেও তো শাহরুখ বা অমিতাভ হতে পারত। চেহারাটা তো নেহাৎ খারাপ ছিল না। স্কুলে সবাই তাকে উত্তমকুমারের সঙ্গে তুলনা করত। কলেজ জীবনেও সুপুরুষ এই বলিষ্ঠ ছ-ফিট দেহটা অনেক যুবতীর হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছিল। প্রেম না চাইতেও দোরগোড়ায় বারবার এসে ধাক্কা মেরেছে। সাহানা তো তাকে না পেয়ে হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করতেও চেয়েছিল। সে তো সব পুরনো দিনের কথা। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস না দিয়ে, আইপিএস না হলে, হয়ত দু-পয়সা রোজগারের তাগিদে মুম্বাই পাড়ি দিত। নাম, গ্ল্যামার, টাকা - ওসব তার কপালে লেখা ছিল কি না, সেটা পরের ব্যাপার। এখন মাস-মাইনেতে চোর-গুন্ডা-খুনি-বদমাশদের নিয়ে কারবার। দিনান্তে মফসসলের ছোট্ট বাংলোয় শুয়ে কলকাতায় ফেরার স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

শুভাশিসের দিকে তাকিয়ে বলল “এসওসিকে কর্ডন করে ফেল। স্নিফার ডগ আনাও। ফিঙ্গার-প্রিন্ট এক্সপার্টকে খবর দাও। পোস্ট মর্টেমের বন্দোবস্ত কর। কোনও ক্যাচ পড়ার আগেই যাতে জেনুইন পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা চলে আসে। না হলে, এ কেসটাও আবার ধামাচাপা পড়ে যাবে। আমাকে একটু একা থাকতে দাও তো”

চলে গেল মেহুলি রায়ের দেহ ছাড়িয়ে, সুইমিং পুলের ও-প্রান্তে। একদৃষ্টে চেয়ে রইল পুলের নীলাভ জলরাশির দিকে। কিছুটা অন্যমনস্কভাবে শিথিল পায়ে গিয়ে দাঁড়াল জলে নামার রডটার পাশে।

রিসর্টের বিশাল পাথরবাটির অখণ্ড নীল। সত্যি মধুময়। চারদিক ঘিরে রেখেছে নানা ফুলগাছের সমারোহ। ডালিয়া, ক্রিস্যানথিমাম, জুঁই, চাপা। কী নেই সেখানে? ওপাশে কোনও ঘেরা বেড়া নেই। হারিয়ে গেছে অখণ্ডবিস্তৃত সবুজ মাঠে। আম-জাম-কাঁঠাল গাছের ওপারে। দূরে বট, অশ্বত্থ, দেবদারুর ভিড়।

শুনেছে, এই পুরো এলাকাটা এক-সময় রায়বাহাদুর কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায়ের ছিল। দাপট যেরকম ছিল, ইংরেজ শাসকদের সঙ্গেও তেমনি গলায় গলায় বন্ধুত্ব। পার্টি, বাইজি নাচানো থেকে সাহেবদের আদর-আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি ছিল না। তাই রায়বাহাদুর খেতাব পেতে অসুবিধাই হয়নি। দেহাবসানের সঙ্গে বাইজিও গেল, রাজকোষেও টান পড়ল। ছেলেগুলো কেউ তেমন কিছু হতে পারেনি। বাবার টাকা ভাগাভাগি করে ভোগ করে সারা জীবন দিব্যি চলে যেত। তাতে কী আর জমিদার বাপের-ব্যাটাদের মন ভরে? নিজেদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে গোলযোগ পাকিয়ে শেষমেশ প্রোমোটারের হাতে জমিদারি বিত্রিু করে, ভাগের টাকা পকেটে গুনে হারিয়ে গেল।

গড়ে উঠল রিসর্ট। গড়ে উঠল উঠতি বাবুদের আমোদ আহ্লাদ করার নতুন এক মজলিশ ‘দ্য হেভেন’

সত্যি স্বর্গই বটে!

এখানে কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায়ের বাইজি নেই। বিদেশি সাহেবদের রং-বিলাসের ফুলঝুরি নেই। এখানে বাগান আছে, সে যুগের পুকুর আজকের আধুনিক সুসজ্জিত সুইমিং পুল। আর সেই যুগের মতো পুকুরে অর্ধ বিবস্ত্র জলসিক্ত শাড়ি পরা নারীদেহ শোভা না পেলেও, সুইমিং পুলের পাশের লাউঞ্জারের সারিতে রং-বেরঙের বিকিনির ঝলসানির ফাঁকে, বিভিন্ন আকারের দেহসৌষ্ঠব। এখন সম্ভোগের পীঠস্থান। বাসনার খিদে মেটাবার দ্য হেভেন। প্রাকৃতিক পরিবেশে বাধা-বন্ধনহীন রিপুতাড়না নিরসনের জন্য গ্রাম বাংলায় মোহময় সুসজ্জিত আয়োজন।

কিন্তু সুদূর মুম্বাই থেকে মেহুলি রায় এখানে কেন?

শুভাশিসের গলা পেছন থেকে শুনতে পেল “স্যার খবর দেওয়া হয়ে গেছে। বলল এখনই আসছে। স্যার, এই কাগজের টুকরোটা পেলাম, আমাদের লোকাল বাসের টিকিট। এটা কি কোনও কাজের?”

হাত বাড়িয়ে স্নেহাশিস বলল “কই? দাও দেখি”

এসপ্ল্যানেড-মেদিনীপুরের দূরপাল্লার সাধারণ বাসের টিকিট। উলটে পালটে দেখল। খুব চলতি হরফে লেখা মোবাইল নম্বর ৯৪৩২২ ৫১২৬০। বিএসএনএল-এর মানিকজোড় স্কিমের নম্বর। ডেফিনিটলি গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে একটা ল্যান্ডলাইনের হদিসও পাওয়া যাবে। কিন্তু হাতের লেখাটা কেমন খসখসে, যেন চলন্ত বাসে কেউ নম্বরটা লিখেছে।

“কোথায় পেলে?”

“সুইমিং পুলের ওধারে। ঘাসের ওপর পড়ে ছিল”

এতক্ষণ সব কিছু ধোঁয়াশায় ভরা ছিল। তবু তো একটা ট্র্যাক পাওয়া গেল। দেখা যাক, এর মধ্যে থেকে কিছু পাওয়া যায় কি না?

“খোঁজো, আরও খোঁজো। যদি কিছু পাওয়া যায়”

শুভাশিস চলে যেতেই ঘুরতে গিয়ে নীচের দিকে চোখ পড়ল। সুইমিং পুলের রডের পাশে একটা গ্লাস আর গোলাপি নাইটি। নাইটিটার দিকে এক পলক তাকিয়ে হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে বসল। শূন্য গ্লাসের মধ্যে হলুদ তরল কিছুটা। শুঁকতেই বুঝতে পারল, যা ভেবেছিল, তাই। হোয়াইট ওয়াইন। গ্লাসে হাত দিল না। আগে ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট আসুক। তারপর...

প্রথম যখন চাকরিতে এসেছিল, তখন এরকম অনেক ক্লুতে দুমদাম হাত দিয়ে ফেলত। এখন বুঝেছে, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। শুধু দেখে যাও। অবজার্ভেশন ইস দ্য ফার্স্ট এসেন্স অফ ইনভেস্টিগেশন। প্রত্যেকটা ক্লু কথা বলে। শুধু ভাবতে হবে। ভাবতে হবে, কেন এই সুন্দরী সুদূর মুম্বাই থেকে এই রিসর্টে এসেছিল? কার সঙ্গে এসেছিল?

এই সাত-আট বছরে কত কিছু পালটে গেছে। আগেকার বাবা-মায়েরা ছেলে-মেয়েদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট করতে চাইত। এখন মিডিয়ার ঝলকানিতে তাদের চিন্তাধারা বদলেছে। এখনকার লক্ষ্য মডেলিং, ফ্যাশন দুনিয়া, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, এয়ার হস্টেস। সবের মধ্যেই একটা এলিমেন্ট অফ গ্ল্যামার আছে। গ্ল্যমারেই টাকা। শিক্ষায় ভিক্ষা। যুগের মন্ত্রটা এক অনির্দিষ্ট নতুন আকার নিচ্ছে। যা কিছু করে নাও, আজকের জন্য। কালকের কথা ভাবার প্রয়োজন নেই। এই মন্ত্রের দীক্ষায় মেহুলির মতো দু-একটা প্রাণ যে বলি হবে, এ আর এমন আশ্চর্য কী?

যৌবন তো বরাবরই আকর্ষণীয়। রামায়ণ-মহাভারত থেকে স্নেহাশিসের সময়ও ছিল। কিন্তু এই ক’বছরে তার মাদকতার বহিঃপ্রকাশ নানা আকারে ফুটে উঠেছে। আগের যুগে প্রেমে ব্যর্থ হলে দেবদাস হয়ে যেত। দু-একটা কীটনাশক খাওয়াও আশ্চর্য কিছু ছিল না। কিন্তু এখন ওসব ব্যর্থ প্রেমের প্যানপ্যানানি নয়। হয় খুন, নয় মারামারি, নয়তো একজনকে ছেড়ে আরেকজনকে নিয়ে ভেগে যাওয়া। এমনকী গুন্ডা লাগিয়ে খুন করতেও আজকের যুগ পিছপা নয়। মানুষের সহ্যক্ষমতা যেন কেমন কমে যাচ্ছে।

মোবাইল বেজে উঠল “চিনতে পারছ স্নেহাশিস?"

অনেক চিন্তার গোলকধাঁধায় ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। বলল “না, ঠিক চিনতে পারছি না। কে?"

"আমি শিরিন। মুম্বাই থেকে বলছি। আমায় ভুলে গেলে?”

শিরিন! সেই কলেজের শিরিন।

শুনেছিল মুম্বাইতে কিছু একটা করে। অনেকদিন যোগাযোগ নেই। শেষবার কলেজের রিউনিয়নে দেখা। তাও বছর চারেক আগে। তখন জানতে পেরেছিল শিরিন মুম্বাইয়ের প্রখ্যাত মডেল। ফোন নম্বরটা শিরিন তার মোবাইলে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। নম্বরটা তাহলে এখনও ভোলেনি। কিন্তু চার বছর বাদে, হঠাৎ কেন?

শিরিন একসময় স্নেহাশিসের প্রেমে পাগল ছিল। স্নেহাশিসকে বিছানায় পাওয়ার জন্য যে কত বিনিদ্র রাত তার যৌবনের উচ্ছ্বাস দিয়ে বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছে, সে একমাত্র শিরিন-ই জানে। দেখতে নেহাৎ খারাপ ছিল না শিরিন। তন্বী, স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী। পার্ক সার্কাসের গোঁড়া মুসলিম পরিবারের। দাদুর রক্ষণশীলতার মধ্যে নিজের যৌবনকে প্রকাশ করার তেমন অবকাশ পায়নি। তাই খুঁজেছিল সুপুরুষ স্বাস্থ্যবান স্নেহাশিসের মধ্যে। বিবস্ত্র শিরিনকে সেদিন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল স্নেহাশিস। শুধুমাত্র অভ্রদিতার কথা ভেবে। তার স্ত্রী অভ্রদিতা। তাকে হারাতে চায়নি। তাই শিরিনকে আবার পোশাক পরিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে একটুও দ্ধিধা করেনি। সেই শিরিন এতদিন পর!

“ভুলব কেন? কী ব্যাপার শিরিন? কেমন আছ?”

“চলছে। একরকম। তুমি কেমন? অভ্রদিতা ভালো আছে?”

“ওই আর কী। চলে যাচ্ছে। তুমি?”

“আছি স্নেহাশিস...” শিরিনের কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস। স্নেহাশিসের মনে হল, এই দীর্ঘশ্বাস অনেক কিছু বলছে। সে যাক। শিরিন অতীত। অভ্রদিতা বর্তমান। ঋজু বর্তমান। ওর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুভূতি বুঝতে পারলেও, এখন আর বিশেষ কিছু আসে যায় না।

“কী ব্যাপার? এতদিন পর? এত সকালে?”

“তুমি ভুলে গেছ। সেবার রিউনিয়নে বলেছিলাম, আমি মুম্বাইতে মডেলিং করছি”

স্নেহাশিস নির্বিকার, “তখনই তো বলেছিলে। কেমন আছ?”

“ওই আর কি। চলে যাচ্ছে”

“সেদিন বললাম তো। চোর, খুনি, বদমাশ নিয়ে আমার কারবার। সুন্দরী মডেলদের দেখার সময় কোথায়?”

"তবু ভালো। এতদিন পরে অন্তত সুন্দরী বললে। মনটা জুড়োল”

স্নেহাশিস বুঝতে পারছে, বহুদিনের আগের স্মৃতি ফিরে এসেছে। সেই স্মৃতির ডালি নিয়ে শিরিন আবার ফিরে গেছে তাদের কলেজ জীবনে। চাওয়া, পাওয়া, হারানো, ব্যথা সব মিশিয়ে।

“হঠাৎ কী মনে করে?”

“তোমায় একটু বিরক্ত করলাম। মেহুলি নামে আমাদের জুনিয়ার এক মডেলের অনেকদিন থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। শুনেছিলাম কলকাতায় গেছে। তুমি কী ওর কোনও খোঁজ করে দিতে পারবে?"

ঠিক এই মুহূর্তে এই ফোনটাই কী আসার দরকার ছিল? শুভাশিস বলছিল, এই মৃত মেয়েটার নাম মেহুলি। কী বলবে শিরিনকে? মেহুলি আর নেই? সে ওর ডেডবডির পাশে দাঁড়িয়ে আছে?

শিরিনের কাছ থেকে কোনও সূত্র পাওয়া যেতে পারে। শিরিনের কথা টেনে নিয়ে বলল “তুমি কদ্দিন থেকে মেহুলিকে চেন?”

"বেশ কিছুদিন। আমরা তো ইন্ডাস্ট্রিতেই অনেকদিন। যদিও মেয়েটা আমার পরে এসেছে। আমার মতোই কলকাতার মেয়ে। রিসেন্টলি খুব নাম করেছে”

“কবে থেকে ওর খোঁজ নেই?”

“থ্রি উইক্স হবে। বলেছিল কয়েকদিনের অ্যাসাইনমেন্টে কলকাতা যাচ্ছে। ওর এজেন্সিও ওর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করতে পারছে না”

স্নেহাশিস গম্ভীর গলায় বলল “মেহুলি আর নেই। সি ইজ ডেড। আমি ওর ডেডবডির সামনেই দাঁড়িয়ে আছি”

ওপাশ থেকে আঁতকে ওঠার মতো একটা গোঙানির শব্দ শোনা গেল “হোয়াট! কী বলছ?”

“আমি এখন ইনভেস্টিগেশন করছি। পরে ফোন করব। এটাই তো তোমার মোবাইল?”

“হ্যাঁ” ওপাশ থেকে ভেসে এল শিরিনের কিংকর্তব্যবিমূঢ় অস্পষ্ট সম্মতি। ফোনটা ডিসকানেক্ট করে দিল।

একটু উজ্জীবিত বোধ করছে। তবু তো একটা সূত্র পাওয়া গেল। কিছুক্ষণ আগে যতটা ধোঁয়াশা ভাবছিল, এখন ততটা মন হচ্ছে না। শিরিনের কথায় কলেজ জীবনের ভালোবাসার স্পর্শ, ফেলে আসা ছন্দ অনুভব করেছে। সেই আবেগে যতটা জানতে পারবে, অন্য কোনও ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের তার ধারে-কাছে পৌঁছতে অনেক সময় পার হয়ে যাবে।

হাঁটতে হাঁটতে সুইমিং পুলের ওধারে চলে এসেছে। ওপাশে কয়েকটা লাউঞ্জার। এক কোণে, ছোট্ট একটা ইট আর টালির সাজানো বার। দ্য হ্যভেনের মালিক বোধহয় বিদেশে ঘুরেছে। রিসর্টটা বিদেশি ধাঁচে। লাউঞ্জারগুলোর মাঝখান দিয়ে আবার জলে নামার একটা রড। বার কাউন্টার এখন বন্ধ। নিশ্চয়ই লোকজন থাকলে ভালো চলে। আধা জলে দেহটাকে ডুবিয়ে কিংবা লাউঞ্জারে শুয়ে, মদ্যপান করা যায়। নীচে চোখ পড়তেই দেখল এক টুকরো কাগজ। লোকাল ট্রেনের টিকিট। তুলে পকেটে রেখে দিল। আরও কিছুক্ষণ ঘুরে বেশি কিছু পেল না।

আবার ফিরে এল মেহুলির সাদা কাপড়ে ঢাকা দেহটার পাশে। মনে হল, এটা মেহুলি না হয়ে শিরিনও তো হতে পারত? এই ছুটে চলা গ্ল্যামারের মোহে এভাবে কত প্রাণ প্রতিনিয়ত বলি হচ্ছে। তবুও এই ছুটে চলার নেশা, এর মাদকতা এখনও তরুণীদের টানে।

শুভাশিসকে বলল “স্নিফার ডগ আসতে কতক্ষণ লাগবে?”

“বলল তো স্যার এক্ষুণি পাঠাচ্ছে”

"তুমি তা হলে এদিকটা দেখ, আমি ওপরে ওর ঘরটা ঘুরে আসি”

ম্যানেজার সত্যসুন্দর মাইতিকে বলল “কত নম্বর ঘরে উঠেছিল?”

“১০২। সব থেকে দামি ঘর স্যার। একেবারে কর্নারের শেষ সুইট”

“চাবিটা?”

"ওনারটা কোথায় বলতে পারব না। তবে ডুপ্লিকেট চাবিটা আছে। আসুন স্যার, আমার সঙ্গে আসুন"

ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ১০২ সুইট খুলে, ঘরে ঢুকে পড়ল স্নেহাশিস। সত্যি বিলাসবহুল সুইট। সত্যসুন্দরের দিকে ফিরে বলল “ভাড়া কত?”

"চার হাজার। এখানে এর বেশি আর কে দিতে পারবে স্যার?"

চার হাজার টাকা দিনে। মুম্বাইয়ের মডেলের কাছে হয়ত এটা এমন কিছু নয়। শিরিনও কী এত টাকা রোজগার করে? জীবনের ঝুকি নিয়ে প্রতিনিয়ত পাশা খেলে যায়, আলো-ঝলমলে উঠতি মাদকতার দরবারে? এর আরেক নামই বোধহয় জীবন। স্বার্থকভাবে বাঁচা। সাকসেস। জীবনে কিছু করা। দশজনের একজন হওয়া। খালি বুঝতে পারে না, জীবন যদি না থাকল, সাকসেস দিয়েই বা কী হবে? তবু কে কার কথা শোনে? যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। মেটাবার নেশায় ছুটে চলেছে এক দিকহীন সভ্যতা।

প্রথমেই একটা মাঝারি লাউঞ্জ। ঘরের মাঝে সোফা, একটা সেন্টার, দুটো সাইড টেবল। ওদিকের কোণে টিভি, স্যাটেলাইট বক্স। অন্যদিকে মাঝারি ফ্রিজ। ফ্রিজটা খুলে দেখল। দু-একটা বিয়ারের বোতল, মিনারেল ওয়াটারের বোতল, কোক, পেপসি। সবই রাখা আছে। কর্নার টেবলের ওপর একটা অ্যাস্ট্রেতে আধপোড়া সিগারেট। অ্যাস্ট্রের পাশে একটা রিসিট। খাবার বিল। শের-ই-পাঞ্জাবের। ১০ নভেম্বর, মানে চারদিন আগের।

সত্যসুন্দরকে জিজ্ঞেস করল “উনি এখানে কবে এসেছিলেন?”

“পরশু। আজ নিয়ে টু নাইটস”

“শিওর পরশু এসছিল?”

“হ্যাঁ স্যার”

“বুকিং করে?”

"হ্যাঁ। ফোনে বুকিং করেছিলেন”

“কবে?”

“আসার দিন সকালে”

তার মানে, এখানে আসার কোনও প্ল্যান ছিল না। হুট করে ঠিক করেছে। কোলাঘাটের শের-ই-পাঞ্জাবের রিসিট দেখে মনে হচ্ছে, মেহুলির মেদিনীপুরে প্রবেশ, চারদিন আগে। বাকি দুদিন কোথায় ছিল? ধাবার রিসিটটা পকেটে পুরে নিল।

ড্রয়িং রুম ছাড়িয়ে বেডরুম। ডবল-বেডেড খাট। বিছানার চাদর অগোছালো। বালিশের পাশে একটা গোলাপি প্যান্টি। সেটা দেখে শিরিনের কথা মনে পড়ে গেল। শিরিনও সেদিন গোলাপি প্যান্টি পরেছিল। যেদিন স্নেহাশিস ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। সব মডেলরাই কি গোলাপি প্যান্টি পরে? যদিও মডেলদের প্যান্টি নিয়ে বিশ্লেষণের সময় এটা নয়।

সাদা অগোছালো বিছানার এককোণে দুমড়ে থাকা চাদরটা সরাতেই চমকে উঠল! একটা ছেঁড়া ছবি। পুরুষের। একটা চোখ আর নাক দেখা যাচ্ছে। চাদরটা সরিয়ে খুঁজতে লাগল। বাকি ছবির অংশটা কোথায়? সারা বিছানা তন্ন-তন্ন করে খুঁজল। কোথাও নেই। ছবিটা পকেটে রেখে দিল। বাঁ দিকে বেডসাইড টেবলের পাশে গোলাপি ব্রা। বিদেশি কোম্পানির। এখানে এরকম লেসের কাজ করা আন্ডারওয়ারড্ ব্রা পাওয়া যায় না।

অভ্রদিতা বেশ কয়েকবার চেয়েছিল। দোকান ঘুরেও পায়নি। শেষমেশ সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল ‘তোমার যখন এত শখ, বাইরে থেকে আনিয়ে দেব’। আর হয়ে ওঠেনি। টেবল ল্যম্পের আলোটা তখনও জ্বলছে। সুইচটা নিভিয়ে দিল। বিছানার ডান দিকে সুটকেশ রাখার জায়গা। তার পাশে ওয়ার্ডরোব। বিছানার পায়ের দিকে ড্রেসিং-টেবল। তার ওপর পড়ে আছে একটা বড় সাইজের লেডিস হ্যান্ড-ব্যাগ। চেনটা খোলা। তার থেকে উঁকি মারছে একটা ইন্ডিয়া কিংসের প্যাকেট।

সত্যসুন্দরকে বলল “উনি সিগারেট খেতেন?”

“আমি বলতে পারব না স্যার। অসিত পারবে”

“কে অসিত?”

“যে ছেলেটি এখানে কাজ করে স্যার। ওই ওনার দেখাশোনা করত”

বাথরুমে ঢুকে পড়ল স্নেহাশিস। হোটেলের বেডরুমটার তুলনায় বাথরুমটা বেশ বড়-ই। এক কোণে কর্নার বাথটব। চারিদিকে ছোট ছোট স্টিলের নজেল দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না বাথটবের সঙ্গে জ্যকুজিও। টবের পাশে টাওয়েল রেলে ভেজা তোয়ালে। পাশের হুকে কালো জিনস্। পাশে গোলাপি টপস।

মেয়েটি জামাকাপড় খুলে বাথটবে স্নান করেছিল। জামাকাপড় ছাড়া, শুধু প্যান্টি আর ব্রা পরেই শুতে চলে গেছে। মাথায় ঢুকছে না, খাটে শুয়ে প্যান্টি আর ব্রাটা খুলে ফেলল কেন? অনেক সময় বিবস্ত্র হয়ে শুতে ভালোবাসে। মহিলাদের কখন যে কী করার ইচ্ছে হয়। কোনও এক সময় শুধু নাইটি জড়িয়েই সুইমিং পুলে গেছিল। কিন্তু কেন?

সত্যসুন্দরকে জিজ্ঞেস করল “আপনাদের রিসর্টে বার আছে?”

"আছে বৈকি স্যার। না হলে লোকে এখানে আসবে কেন? লাইসেন্সও আছে স্যার। দেখবেন?”

বাধা দিল “নাঃ। দরকার নেই”

লেডিস ব্যাগটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। কতদিন ধরে অভ্রদিতা একটা ভালো লেডিস হ্যান্ডব্যাগ কিনে দিতে বলছে। কথা দিয়েছিল, কলকাতায় গেলে নিউ-মার্কেট থেকে কিনে আনবে। এর মধ্যে কলকাতায় অনেকবার গেছে। কিন্তু নিউ-মার্কেটে গিয়ে কেনার সময় করে উঠতে পারেনি। ব্যাগটার ভেতরে মহিলাদের সাজ সরঞ্জাম। পাউডার, মেক-আপ কিট, রুমাল, মোবাইল ফোন। চেন খুলতেই একটা প্যাকেটে হাত ঠেকল। কন্ডোম। সে যুগের মেয়েদের সঙ্গে এযুগের মেয়েদের এখানেই তফাত। এখন এরা শুধু প্রসাধনই রাখে না, কন্ডোমও। অন্য দিকের চেন খুলে হাতে এল একটা চিরকূট। এটিএম-এর ক্যাশ রিসিট। থিয়েটার রোডের অ্যাক্সিস এটিএম থেকে ১০,০০০ টাকা তোলা। ৯ নভেম্বর। মেদিনীপুরে ঢোকার আগের দিন।

হায় রে পোড়া আইপিএস। এরকম হুট করে ১০,০০০ টাকা তোলার ক্ষমতা কজন সৎ অফিসারের আছে? আছে এই দশজনের একজন হওয়া সেলিব্রিটিদের। তাই তো ছেলে মেয়েরা আজকাল আর কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় না। উকিল, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টটেন্টও নয়। অ্যাডমিন্সস্ট্রেটিভ ক্যাডারে পরীক্ষা দিতে চায় না। লেখাপড়া করে কী হবে? সেই মাস-মাইনের চাকরি। তার থেকে মডেল হও, হিরোইন হও, ফ্যাশন ডিজাইনিং কর। টাকা, গ্ল্যামার, নাম।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে খাটের পাশ দিয়ে এসে দাঁড়াল ব্যালকনিতে। দুটো সোফা পাতা। বাইরের দৃশ্য সত্যি সুন্দর। দূরে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ মাঠ। চারদিকে বট, দেবদারু, অশথের সারি। পাতার ফাঁকে সকালের সূর্য লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে। দক্ষিণের এই বারন্দা দিয়ে সবুজের সমারোহ দেখার মতো। ওপাশের আমবাগান পার হয়ে যতদূর চোখ চলে যায় - শুধু সবুজ আর সবুজ। সারাদিন একদৃষ্টে চেয়ে থাকলে অনায়াসে সময় কেটে যায়। মনটা তাতেই জুড়িয়ে যাবার কথা। বরং ডান দিকে রিসর্টের দৃশ্যটা অনেক বেশি কৃত্রিম। চার হাজার টাকা এই ঘরের জন্য দেবে না তো কি বিলাসবহুল পাঁচতারা জঙ্গলের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবে?

স্নেহাশিস বুঝতে পারছে, কেন মেহুলি কলকাতা ছেড়ে মেদিনীপুরের দ্য হেভেনে চলে এসেছিল। প্রকৃতিকে নিবিড় করে পাওয়ার এই অখণ্ড সবুজের স্বর্গ আর কোথায় পাবে?

সত্যসুন্দরকে বলল “আমরা এই ঘরটা সিল করে দিচ্ছি। আপনার রিসেপশনের রস্টারটা দেখব”

আমতা করে সত্যসুন্দর বলল “নিশ্চয়ই স্যার। একটা অনুরোধ করব?”

“কী?”

“স্যার একটু পরেই তো মিডিয়া ছেঁকে ফেলবে। আমাদের রিসর্টের নামটা একটু উহ্য রাখবেন। না হলে বিজনেসের বড্ড ক্ষতি হবে”

মাথা নাড়ল স্নেহাশিস “আমি উহ্য রাখলেও কিছু হবে না। মিডিয়া ঠিক খবর বার করে দেবে। তবুও... চেষ্টা করব। পরে আমি এই ঘরটা আবার ইনস্পেক্ট করতে আসব। আগে পোস্ট মর্টেমের বন্দোবস্ত করি। বাড়ির লোককে খবর দিতে হবে”

সত্যসুন্দর ঘরটা লক করতেই স্নেহাশিস হাত বাড়িয়ে বলল “চাবিটা আমায় দিন”

স্নেহাশিসের কড়া দৃষ্টি দেখ অমায়িক ভাবে বলল “আসুন স্যার। আমাদের রিসেপশন লাউঞ্জে”

মেহুলি রায় চেক ইন করেছে নিজের নামেই। সঙ্গে মুম্বাইয়ের ম্যাগনাম টাওয়ার্স কমপ্লেক্সের ঠিকানা। আনম্যারেড, সিঙ্গল। আরও পাঁচজনের নাম রস্টারে আছে। ওই নামগুলোয় আঙুল বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল “এরা কী এখনও আছে?”

“হ্যাঁ স্যার”

“ওদের সঙ্গে কথা বলব”

“নিশ্চয়ই। তবে স্যার, বেশি চাপাচাপি যদি না করেন... হাজার হোক ওরাও তো আমাদের কাস্টমার। আমাদের ব্যবসার কথাটা একটু মাথায় রাখবেন”

সব কিছুই হিসেবমতো। পরিচয় লুকনো বা বেনামি কোনও ব্যাপার নেই। এখানে হয়ত এই মেয়েটি সত্যি-সত্যিই প্রকৃতিকে উপভোগ করতে এসেছিল। নির্মল আনন্দ। কিন্তু সেই নির্মল আনন্দের মধ্যে নগ্নতা, সুইমিং পুল, মৃত্যু এল কী করে? সত্যি কি খুন হয়েছে? বেশি মাল খেয়ে নেশার ঘোরে জলে ডুবে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশেষ করে যখন সে নগ্ন অবস্থাতেই শুধু নাইটি পরে সুইমিং পুলে গেছিল। মেহুলি কী সাঁতার জানত?

স্নেহাশিসের মাথায় নানা চিন্তা উঁকিঝুকি মারছে। সে সব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আগে তো পোস্ট মর্টেম। না হলে পুরো কেসটাই ঘুরে যেতে পারে।

রিসেপশনের থেকে বেরিয়ে শুভাশিসের কর্ডন করা দেহটার দিকে গিয়ে বলল “অনেকক্ষণ তো হল। স্নিফার ডগ আসতে আর কতক্ষণ?”

“এই তো এল বলে”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%