একচল্লিশ

অনিরুদ্ধ বসু

মহাদেবের জটা থেকে গোমুখের কোল বেয়ে নেমে আসা সুরধুনী গঙ্গা ক্রমশ আছড়ে পড়েছে হরিদ্বারে। স্রোতস্বিনীর তরঙ্গায়িত প্রাবল্য তখনও বাঁধ ভাঙেনি দক্ষযজ্ঞের পটে। দেবী দুর্গার চরণ পড়েনি শিবের শায়িত দেহে, পরিবর্তিত হয়নি কালীরূপে।

মন অনেকদিন ধরেই চাইছিল জলের ধারে প্রদীপের মেলা দেখতে। অতীন রায় যখন লোকেশ চাঢাকে বলল “চলিয়ে দো দিনকে লিয়ে হরদোয়ার ঘুম আয়ে” মন জেগে উঠল নতুন আনন্দে।

নীতাকে নিয়ে একলা বেরনো যায় না দেহেরাদুন থেকে। বাবা-মা সায় দেবে না, নীতাও না। তবুও মন চাইছিল পাহাড়ের কোল থেকে জলের ছোঁয়া উপভোগ করতে। তাই দুম করে চলে আসা।

গোধূলির অস্তরাগ তখনও মুছে যায়নি। ওঠেনি তারা পশ্চিম দিগন্তে। হর-কি-পৌরির হাজার লোকের ভিড়ে ওরা উপভোগ করছিল দিনান্তের অস্তরাগ। যদিও কুম্ভমেলা নয়, তবু ভিড়ের শেষ নেই। পীঠস্থান তো বটেই। সন্ধ্যারতি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোক এসেছে। গঙ্গার ফুরফুরে হাওয়ার স্নিগ্ধ স্পর্শ, মন্দ কীসের? আঁশগন্ধি জীবনের আবদ্ধতায় টুকরো আনন্দ খুঁজে নেওয়া। নৈসর্গিক ঘাটতি থাকলেও পুণ্যিতে পুষিয়ে যাবে।

লাল-সাদা মন্দিরের পাশের ঘাটে বসে ছিল দুজনে। বিভিন্ন রঙের হোর্ডিংগুলো দিনের শেষে রঙের বাহার ছড়িয়ে চলেছে। গৈরিক আর লোহিতের অলিখিত সঙ্গম। মিশেছে উইকেন্ডের আনন্দে। নীতাকে নিয়ে এলে কত ভালো লাগত। বিয়ের আগে সম্ভব নয়। বছর কয়েক আগে নীতার পরিবারের সঙ্গে এসেছিল। নীতা, বাবা, মা, ভাই আর লোকেশ। এমনই সন্ধ্যায় সকলে উপভোগ করেছিল গঙ্গার ভাসানো ভেলার লীলা। তখন অবশ্য জীবনে এত জটিলতা আসেনি। নীতাকে ঘিরে নয়। অন্য জায়গা থেকে। কেন তা ঠিক এখনও বুঝেতে পারছে না লোকেশ। বারবার চাপ আসছে, নীতাকে ছাড়ার জন্য। বিয়ে করতে হবে দিল্লির মডেল আন্দ্রেয়াকে। কেন করতে হবে তাও পরিষ্কার নয়। আঁচ করতে পারছে যারা চাপ দিচ্ছে খুব শক্তিশালী।

নীতা শুনে বলেছিল “কেঁও? উনহে হামারে রিস্তে সে কেয়া তালুক?”

“মালুম নেহি। লেকিন উনলোগ জিনা হারাম কর দিয়া”

“উসে বোলো সটক জানে। ইয়ে আপনা মামলা হ্যায়”

“বোলা থা। শুননেওয়ালা নেহি। পিছে পড়া। ধমকি দিয়া বাত নেহি শুননে মে ছোড়েঙ্গে নেহি”

“কাঁহা সে ফোন আয়া?”

“মহারাষ্ট্র সে। মুম্বাই নেহি”

“তুমহে পহেচানা কৈসে?”

“মালুম নেহি। হম দোনো কে রিস্তে কে বারে জানকারি হ্যায়। দোনোকে পরিবারকে বারে মে ভি”

“কেয়া চাহতে হ্যায়? হম দোনোকে সাদি মে উনকো কেও ইতরাজ? আন্দ্রেয়া কৌন?”

“দিল্লিকে খুবসুরত মডেল”

নীতা হাসল “কর লো। মেরে সে জাদা খুবসুরত”

লোকেশ কঠোরভাবে ওর দিকে তাকাল। হাসলে ওর গালে টোল পড়ে। মিষ্টি লাগে। এই মিষ্টি মেয়েকে ছেড়ে অন্য কাউকে কেন বিয়ে করবে? যতই সুন্দরী হোক, নীতার মতো শিক্ষিত তো নয়। নীতার মতো তাকে তো ভালোবাসে না। ভালোলাগা, ভালোবাসা কী অন্য কারও ইচ্ছের মধ্যে বন্দি করা যায়?

কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যারতি শুরু হবে। দেখার জন্য ওপরে রাস্তার কালভার্ট ভরে গেছে জনস্রোতে। সন্ধ্যারতির শেষে প্রদীপ জ্বলা কলাপাতার ভেলাগুলো ভেসে যাবে ভারত সেবাশ্রমের দিকে। আরতির বন্দনায়, সূর্য বিদায় নেবে পীঠস্থান থেকে।

অতীন লোকেশকে বলল “আরতি দেখেগা?”

“কেঁও নেহি?”

“উসকে বাদ নিরালে মে বৈঠেঙ্গে”

লোকেশ বহুদিন দেহরাদুনের বাসিন্দা। কিছুদিন হল অতীনের সঙ্গে আলাপ। ছোট্ট কম্পিউটার কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে এসেছে। বিকেলে যতই নীতার সঙ্গে ঘুরুক ওর ওপর সময়ের পরোয়ানা। সন্ধের আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। বিয়েটা তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হবে। না হলে নীতার সংসর্গের সময় ক্রমশ কমে আসছে। এরাও যে পিছু ছাড়ে না। করেই ফেলতে পারত। অপেক্ষা করছে এমএ পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত। আর তো কটা মাস, দেখতে দেখতেই পার হয়ে যাবে। নতুন ফ্ল্যাটও বুক করেছে। বিয়ের পর সেখানেই উঠবে। দুই বাড়িই বিয়ের সম্মতি দিয়েছে। দেবে নাই বা কেন? লোকেশের মতো ভালো ছেলে দেহরাদুনে কটা পাবে?

স্কুলে-কলেজের বন্ধুরা কেউ দিল্লি, কেউ মুম্বাই কেউ বা অ্যামেরিকা চলে গেছে। সন্ধ্যারতির দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, ফিরে গিয়েই নীতার বাবার সঙ্গে বিয়েটা পাকা করে নেবে। পড়ে থাক নীতার পরীক্ষা। বিয়ের পরেও হতে পারে। এখন যদি বিয়ে না করে, ওরা ছাড়বে না। আর দেরি করা ঠিক নয়। এই অযাচিত যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের একটাই উপায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে।

ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কৃতী স্নাতক লোকেশ যে কম্পিউটার ফার্মে চাকরি করে, সেখানেই মুম্বাই থেকে সদ্য জয়েন করেছে অতীন। নিজেই আলাপ করেছে “হু তো বাঙ্গাল কা, লেকিন নোকরিকে সিলসিলে মে ইধর-উধর কাম মে রহনে কে ওয়াক্ত ভুলনে বৈঠা ম্যায় বঙ্গালি”

“এক হি দেশ, ভারত। চাহে ওহ বাঙ্গাল দিল্লি, দেহরাদুন ইয়া চেন্নাই। হম সব এক দেশকেই হ্যায়”

আলাপ ঘনীভূত হতে সময় লাগেনি। সামনে নীতার পরীক্ষা, বেশি বিরক্তও করা যাবে না। তাই অতীনের সঙ্গে অবসর কাটাতে মন্দ লাগে না।

সুর্য বিদায় নেওয়ার সঙ্গে প্রদীপের ভেলা ভেসে উঠেছে গঙ্গার বুকে। নতুন সাজে সাজছে চিরপরিচিত সাঁঝের গঙ্গা। মহাদেবের জটা থেকে মাটির ছোঁয়ায় নতুন দেওয়ালি উৎসবে মেতে উঠেছে। প্রদীপের সন্ধ্যারতিতে নতুন অভিষেক।

অতীন বলল “ইতনে ভিড় মে দম ঘুট রহা”

“কেয়া করে?”

“চলো মেরে সাথ। নিরালে মে বৈঠেঙ্গে”

“ইধর নিরালা কাঁহা?”

“আও তো”

হর-কি-পৌরি থেকে ৩০০ মিটার হাঁটতেই কালভার্টে পার হয়ে ব্রিজে পড়ল। নীল ধারার ওপর ব্রিজ পড়েছে হর-কি-পৌরির উলটো দিকে। ২০ ফিট কালভার্ট গঙ্গার পাশ দিয়ে চলে গেছে উত্তরের পথে। হোটেল-দোকান ছাড়িয়ে হাঁটতে লাগল কালভার্ট ধরে। এগোতেই ফাঁকা অন্ধকার, নীরবতা। যুগলেরা গভীর প্রেমে মগ্ন। কেউ বা গঙ্গার মৃদুমন্দ বাতাস উপভোগ করছে। কেউ জড়িয়ে ধরে অধরের রসটুকু নিরালায় নিংড়াচ্ছে। দূরে কয়েকটা ভিখিরি পা ছড়িয়ে শুয়ে। ভিড়ের বাইরে বিশ্রামের অবকাশ। ভিক্ষে করতেও তো পরিশ্রম হয়। আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল, একজন কলকেতে মশলা গুঁজছে। মর্ত্যলোকেই ভাসতে চাইছে গঞ্জিকার স্বর্গে। ওপাশে ভক্তের হাট। এপাশে ও থেকে মুক্তির আরেক রূপ, জমজমাট।

সত্য বটে সেলুকাস কী বিচিত্র এ দেশ। বিচিত্র তার আত্মপ্রকাশ। নানা রূপে নানা রঙে। লোকেশ আগে বেশ কয়েকবার হরিদ্বার এসেছে। কিন্তু উলটো দিকের চিত্র আগে কখনও দেখেনি। অতীনকে বলল “ইয়ে ভি হরদোয়ার। পহলে ইয়ে কভি নেহি দেখা”

“মালুম হোনা চাহিয়ে। ইসলিয়ে তো ইশ্বর তুমহে মেরে সাথ ইঁহা লায়া”

সাঁঝের স্রোতস্বিনী অন্ধকারের আঁচলে ঢাকা নিভৃত গঙ্গা। ফুরফুরে হাওয়া ভেসে আসছে জলের ছোঁয়া নিয়ে। ভালোই লাগছে লোকেশের।

“আচ্ছা লাগতা?” অতীন প্রশ্ন করল।

“বড়িয়া। কিতনেবার হরদোয়ার আয়া। ইস তরফ কভি নেহি”

“অভি ভি বহত কুছ দেখনা বাকি হ্যায়”

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গাছের তলায় বসে পড়ল।

“থক গয়া। থোড়া সা আরাম কর লে” লোকেশ গাছের তলায় পা ছড়িয়ে।

“তুমহারা সাদি হো চুকা?”

“নেহি। নীতা সে বহতদিনকে ইশক হ্যায়। এমএ দে রহি। উসকে বাদ সাদি। একঠো ফ্ল্যাট ভি বুক কিয়া। তুমহারে?”

“নেহি করুঙ্গা। এক লড়কি সে মোহাব্বত হুয়া। ধোকা দে কর চলি গয়ি। ফির কসম খায়া লড়কিকে চক্কর মে ঔর কভি নেহি”

লোকেশ পকেট হাতড়াচ্ছিল দেখে অতীন বলল “সিগারেট? লে মেরে পাস হ্যায়” লোকেশকে সিগারেট দিল। নিজেও ধরাল। দুটো টান দিতে লোকেশ বুঝল স্বাদটা অন্যরকম। ঠিক সিগারেটের মতো নয়। সিগারেটটা হাতে নেড়ে বলল “টেস্ট কুছ আলগ?”

“সিগারেট পাঁচ মিনিট। ফির হাওয়া মে খতম। ইয়ে সিগারেট পাঁচ ঘন্টে”

“কেয়া হ্যায় ইসমে?”

“মারিজুয়ানা। পি, মস্ত সে। ফির দেখ কেয়া মস্তি। গঙ্গেকে হাওয়া, নিরালে মে তন্দুরুস্তি”

বিয়ে নিয়ে ঝামেলা থেকে মুক্তি খুঁজছিল। আগে কখনও খায়নি। নামটা শুনেছে। একবার নয় পরখ করেই দেখা যাক। স্বাদটা অন্য হলেও মস্তি লাগছে। আরও কয়েকটা টান, আরও ভালো, আরও টান, আরও ভালো। মন ভাসছে গাঙচিলের মতো গঙ্গার বাতাসে। সন্ধ্যার মৃদুমন্দ গঙ্গার হাওয়ায় নতুন আবেশ। দূরের পৃথিবী... নীতা... বিয়ে... উটকো ঝামেলা সব দূর। কোনও কিছুই সমস্যা নয়। দূর নিকটে চলে এসেছে, নিশ্চিত সমাধানে। অতীনকে দেখে মনে হল সে আর গাছের তলায় নেই। ভাসছে অনন্ত মহাশূন্যে।

রুদ্ধ মনটা দেহরাদুন ছেড়ে হরিদ্বারে, গঙ্গার তীরে, পাখনা মেলে নতুন আনন্দের সুর পেয়েছে। বেঁচে থাকার সুর। কাব্যহীন সমস্যাভরা জীবনে নতুন স্বপ্নের দেশ। যেখানে জল, স্থল, অন্তরীক্ষ এক।

অতীন বলল “চল, নহায়ে”

“হম তো পানি মে বৈঠে”

অতীন বেশ বুঝতে পারছে লোকেশের নেশা লেগেছে “তু পানিকে উপর কভি পয়দল চলা?”

“নেহি তো”

“ফির চল। আজ দো কদম পানি পর চলে”

অতীনের হাত ধরে উঠে পড়ল। চলতে শুরু করল ঘাটের দিকে। আহা, কী আনন্দ! জলেও চলতে পারছে। আরও দু-পা। কে বলে জলে হাঁটা যায় না? সে তো দিব্যি হেঁটে চলেছে। আরেকটু... আরেকটু... আরেকটু... পায়ের তলায় ঠান্ডা ঠান্ডা... ভালোই লাগছে। ত্রুমশ দেহটা নীচে নেমে যাচ্ছে। সে যাক। সিগারেটটা শূন্যে ছুড়ে দিল। অনন্ত আকাশ, সীমাহীন মাটি, অবারিত জল, মিলে একাকার। বুঝতে পারছে না তফাত কোথায়? সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মিলেমিশে এক অনন্ত আনন্দে। এই বিপুল পৃথিবীর কোন স্তরে সে বিচরণ করে, ভাবার মানেই হয় না। লোকেশ এখন একমেবাদ্বিতীয়ম।

বাঁ দিক থেকে জলের প্রচণ্ড ধাক্কা আছড়ে পড়ল দেহে। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শূন্যে বিহঙ্গের মতো। জল... আরও জল... আরও আরও জল। এক সময় গঙ্গা সম্পুর্ণভাবে গ্রাস করে নিল উন্মুক্ত গহ্বরে। অন্য এক স্বর্গরাজ্যে, চিরশান্তির কোলে।

অতীন ঘাটে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা ফেলে দিল। কালকে একবার দিনের আলোয় ফিরতে হবে। বডিটা পাওয়া গেছে কি না, জানতে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%