অনিরুদ্ধ বসু
পোস্ট-মর্টেম ও ফরেনসিক রিপোর্ট দুটো বেশ কয়েকবার পড়ল বিনোদ রাঠোড। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট সোজাসাপটা। ‘ড্রাউনিং ডেথ ডিউ টু অ্যাসফেক্সিয়া। ওয়াটার এন্টারিং লাংস’। বৈশিষ্ট্যহীন। ফরেনসিকটা পড়ে নড়েচড়ে বসল। সিগারেটের টুকরোগুলোর মধ্যে মাত্র একটাতে মারিজুয়ানা। ও অঞ্চলটা গঞ্জিকাসক্তদের পীঠস্থান। এতগুলো টুকরোর মধ্যে শুধু একটাতেই কেন মারিজুয়ানা পাওয়া গেল!
অতীন সম্বন্ধে আরও খোঁজখবর নেওয়া দরকার। দেহরাদুন থেকে জেনেছে অতীন মুম্বাইতে চাকরি করত। কিছুদন হল নতুন চাকরি নিয়ে দেহারাদুনে। এত জায়গা থাকতে মুম্বাই ছেড়ে দেহরাদুনে কেন? মাইনে বেশি? অরিজিন্যালি পশ্চিমবঙ্গের লোক। ওর সম্বন্ধে বেঙ্গল থেকে আরও তথ্য প্রয়োজন। আইজিডিডি বেঙ্গলকে ফোন। তথ্য চাই অতীন রায় সম্বন্ধে। আইজি মুম্বাইকে ওর চাকরির ইতিহাস জানতে ফোন করল।
মধুসূদন ফাইলগুলো সাজিয়ে চা খাচ্ছিল। হঠাৎ আইজিডিডির কাছ থেকে ফোন পেয়ে সন্দিহান। অতীন রায় সম্বন্ধে তথ্য জানাতে হবে। তাহলে কী এই ছবির ব্যক্তি? দেহরাদুন পুলিসও একটা মৃত্যু নিয়ে অতীনকেই ক্লোজ-ইন করেছে। পল্টুর দোকানে জোর গলায় বলেছিল নেক্সট মার্ডার নর্থ ইন্ডিয়ায়। তাহলে কী এই মৃত্যুও অ্যাকসিডেন্ট নয়, মার্ডার? কেউ বিশ্বাস না করলেও মধুসূদনের মন বলছিল, হতেই হবে। না হলে অঙ্ক মেলে না।
এর মধ্যে স্নেহাশিসের রিপোর্ট এসে গেছে। মেহুলির ঘরে আধছেঁড়া ছবি আর সুনেত্রার কম্পিউটারের ছবি এই অতীন রায়ের। মেহুলির পিসিমা কনফার্ম করেছে। এটাও স্নেহাশিস লিখেছে দীঘার অঞ্জলি রিসর্টে ৯ নভেম্বর মেহুলি চতুর্বেদীর সঙ্গে চেক-ইন করেছিল। ওখানেই অতীন ওদের সঙ্গে দেখা করতে আসে। যাওয়ার আগে হয়ত ওয়াইনের বোতল উপহার দিয়েছিল মেহুলিকে। রোশনও পরবর্তী রিপোর্টে জানিয়েছে, যে লোকটা ওদিন লোখান্ডওয়ালার ফ্ল্যাটে এসেছিল সে অতীন। অতীন সর্বত্রই। অতীন এই চত্রেুর অংশীদার। মধুসূদনের মতে কর্মী মাত্র। কিন্তু কতগুলো ক্লু এখনও ধোঁয়াশায়।
অতীনের ছবি, রিপোর্টগুলো স্ক্যান করে ই-মেলে পাঠিয়ে দিল দেহরাদুনে। বিনোদ রাঠোড ওগুলো পেয়ে মুচকি হাসল। নয় পুলিসে চাকরি করে। এক সময় ভালো ছাত্র ছিল, একবারেই আইপিএস পাশ করেছিল। সরকারি কাজের একঘেঁয়েমিতে কেবলই মনে হত বুদ্ধিটা ভোঁতা হয়ে গেছে। এখন বুঝছে, বুদ্ধি জন্মগত। অব্যাবহারে মরচে পড়তে পারে, লোপ পায় না। না হলে, সিগারেটের বাটে মারিজুয়ানার ট্রেস পেয়ে কী করে ব্রেন ওয়েভ খেলে গেল? মুম্বাই থেকেও তথ্য ইঙ্গিত করছে ওখানকার খুনের সময় অতীন ছিল। ডিরেক্ট এভিডেন্স ছাড়া অতীনকে গ্রেপ্তার করবে কী করে? ছক কষে নিল। আপাতত তিনদিনের জন্য অতীনকে অ্যারেস্ট করে পুলিসি ঢঙে কথা বার করতে হবে। এতক্ষণ ছিল বুদ্ধির খেলা। এবার শুরু পুলিসি খেল।
যেহেতু ডিটেলসটা কলকাতা থেকে বেশি, তাই কলকাতার ডিজিকে ফোন “ক্যান ইউ সেন্ড সামওয়ান ফ্রম ইওর প্লেস টু হেল্প মি উইথ দ্য ইনভেস্টিগেশন?”
“সিওর। হাউ কুইকলি?”
“বাই টুমরো। ডিরেক্ট ফ্লাইট টু ডেলহি অ্যান্ড দেন বাই পুলিস কার। আই উইল ইনফর্ম দ্য ডেলহি পুলিস”
“অ্যাজ ইউ উইশ”
ফোনটা কেটে ডিজি ভাবল, যদি তদন্তে সাহায্য করতে হয়, যে এ সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল, তাকে পাঠানোই ভালো। সেজন্যই তো সেদিন মধুসূদনকে ডেকে পাঠিয়েছিল। চেন্নাইয়ের হোম সেত্রেুটারিয়েট থেকেও বারবার চাপ আসছে। অতএব মধুসূদন মুখুজ্জে।
রাত আটটা। অতীন কাজের পর দেহরাদুনের ফ্ল্যাটে সিঙ্গল মল্ট খাচ্ছিল। বয়স পঁয়তাল্লিশ হলেও সারাজীবন ভেরেন্ডাবাজি করেই কেটেছে। নেহাত পৈতৃক সম্পত্তির একাংশ নিয়ে কাঁথির নিউ বাস স্ট্যান্ডের ফ্ল্যটাটা কিনেছিল। না হলে তো রাস্তায় দাঁড়াতে হত। অর্কমণ্য ছেলে। বিয়ে-থা স্বপ্নেরও অতীত। দিদিকে কতবার বলেছে, কাঁথির বাড়িটা তার নামে লিখে দিতে। টাকাও চেয়েছিল। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে বুড়িটা। কেন যে মরণ হয় না। ভাসা জীবন আরও ভেসে যেত, যদি না দাদার মেয়ে কেল্টুস সাথ দিত। মুম্বাইতে পাড়ি দিয়েছিল মডেল হবে বলে। কেল্টুস মডেল দুনিয়ায় মেহুলি নামে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
বিপিনদা যখন শেষবারের মতো কাঁথি এসেছিল, দেখা করতে গেছিল।
“কী করছিস?”
“কিছু না”
“তোকে দিয়ে কিসসু হবে না। মায়ের পেটের ভাই, ফেলি কী করে? মুম্বাইতে কাজ করবি?”
“তুমি কাজ দেবে?”
“কেল্টুস একজন বিশ্বস্ত সেত্রেুটারি খুঁজছে। তুই ওর কাকা। তোর থেকে বিশ্বস্ত পাবে কোথায়?”
“কবে যেতে হবে?”
“কেল্টুসকে জিজ্ঞেস করে জানাব। একটা কথা মাথায় রাখিস। কেল্টুসের জীবনযাত্রা নিয়ে কাউকে কিছু বলতে পারবি না”
“বলতে যাবই বা কেন?”
“ওদের জীবন তো ঠিক আমাদের মতো নয়। মুম্বাইয়ের তারকা হতে গেলে অনেক কিছু করতে হয়। সেটাকে তেমন গুরুত্ব দিস না। কোথায় কর্নফিল্ড রোডের দু-কামরার ভাড়া বাড়ি। কেল্টুসের সাকসেসে কীভাবে আছি। ভাবাই যায় না”
গ্লাসে চুমুক দিয়ে মনে হল, সেই বা কী কম সাকসেসফুল? টাকা থাকলেই সাকসেস। ফ্ল্যাটের বেল বাজতে দরজা খুলে চমকে উঠল। পুলিস!
“সাহাব আপকো ইয়াদ কিয়া”
“কৌন সাহাব?”
“বিনোদ রাঠোড”
“কাল জানে সে নেহি হোগা? দারু পি রহা থা”
“নেহি। অভি, ইস ওয়াক্ত”
পুলিসের জিপে সোজা রাঠোডের দপ্তরে।
উলটো দিকের চেয়ারে বসা রাঠোডের প্রশ্ন “আপ হমসে এক বাত ছুপায়া। আপলোগ উধর বৈঠ কর মারিজুয়ানা পি রহে থে”
জিভ কাটল অতীন। বিরাট অন্যায় হয়ে গেছে। বলল “ভুল গয়া থা। ঐসে ভি ইয়ে সব বাত বোলনে কা হ্যায় কেয়া?”
“ফির ভি। বাত সহি হ্যায় ইয়া নেহি?”
মাথা নাড়ল “হাঁ”
“ঠিক হ্যায়, যাইয়ে। দারু পি রহে থে। পিজিয়ে”
পুলিসের গাড়িতে ফ্ল্যাটে ফেরত এসে ভাবছিল, শুধু এটুকু কথা জিজ্ঞেস করার জন্যই কী বিনোদ রাঠোড থানায় ডেকেছিল? ফোনেই করতে পারত। তবে? আধা শেষ করা গ্লাসে চুমুক দিয়ে মনে হল, বিনোদ রাঠোডের তার ওপর সন্দেহ হয়েছে। আর নয়। এবার এখান থেকে পালাতে হবে। এবার বড় শহরগুলোয় নয়। ফিরতে হবে ভিটেমাটিতে। নিজের ছোট্ট নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। যেখানে একলা নিরালায় ভাবতে পারবে পুলিস-চক্ষুর আড়ালে।
রাত আটটা। ডুন এক্সপ্রেসে উঠে বসল। পরনে সেই আগের বেশ। ধুতি-ফতুয়া। চলনে-বলনে পালিশ করা হঠাৎ বড়লোকি আভরণ মুছে সেকেন্ড ক্লাসের থ্রি-টায়ারে। লোকে গিজগিজ। এসি নেই। এই ক’টা বছরে অভ্যাস কত পালটে গেছে। চল্লিশের ওপর বসন্ত কাটিয়েছে অনাড়ম্বর। এখন মনে হচ্ছে সেকেন্ড ক্লাসের পাখার গরম অসহ্য। কেল্টুসের দেখানো আড়ম্বর হাড়ে-মাসে জড়িয়ে। কষ্ট হলেও কিছু করার নেই। এখন এটাই একমাত্র বাঁচার পথ।
ভিড়ের মধ্যে একটা জায়গা দখল করল। উইদাউট রিজার্ভেশন এই কষ্ট পোয়াতেই হবে। দেখা যাক, পরে টিটিকে খাইয়ে একটা বার্থ যদি ম্যানেজ করা যায়। ছত্রিশ ঘণ্টা, মানে দু-রাতের জার্নি। প্লেনে ঘোরফেরা করা অতীনের আনরিজার্ভড সেকেন্ড ক্লাসে ধাতস্থ হতে সময় লাগছে।
এখন তো বাঁচার সমস্যা। পুলিস যখন সন্দেহ করছে, জল কোথায় দাঁড়ায়, কে জানে? জানলার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়েছিল। ন’টা বেজে গেছে। ট্রেনের ছোটা দেখে মনে হয় সেও অন্ধকার থেকে আলোর দিশা খুঁজছে।
“মুড়ি খাবেন?” পাশে বসা লোকটির দিকে তাকাল। লক্ষ করেনি। পরনে আধ-ময়লা ধুতি, সস্তা সুতির পাঞ্জাবি। সামনে-পেছনে টাক। বয়েসে তার থেকে একটু বড় হবে। সাদা কাপড়ের বোঁচকা থেকে ঠোঙা বার করে আবার বলল “মুড়ি খাবেন?”
তাড়াহুড়োয় স্টেশন থেকে খাবার কেনার কথা ভুলেই গেছিল। খিদেও পেয়েছে। ঠোঙা থেকে একমুঠো মুড়ি নিয়ে বলল “ধন্যবাদ”
“ধন্যবাদ কেন? বিরিয়ানি পোলাও তো নয়”
“কোথায় যাচ্ছেন?”
লোকটি মুড়ি চিবিয়ে বলল “জানি না। এমনি ট্রেনে উঠে বসি। যখন ইচ্ছে হয় নেমে পড়ি। আপনি?”
“কলকাতা। আপনি কী এভাবেই ভবঘুরে হয়ে বেড়ান?”
“গন্তব্য থাকলে তো। ঘর, সংসার, ছেলেপুলে, চাকরি নেই। কোথায় যাব?”
“বিয়ে-থা করেননি?”
"করেছিলাম। বাচ্চাও ছিল। গাঁইশালের ট্রেন দুর্ঘটনায় দুজনেই... তখন অবশ্য দোকানে খাতা দেখার কাজ করতাম। ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। ঠিকমত কাজে মন দিতে পারিনি। মালিক ছাড়িয়ে দিল”
মায়া হল। পেয়ে হারানোর ব্যথা মর্মান্তিক। বোঁচকার কাপড়ে চোখ মুছল। কামরার ক্ষীণ আলোয় অতীনের মনে হল, জল আড়াল করতে চাইছে।
“আপনি?”
“তেমন কিছু নয়। বিয়ে-থা করিনি। তবে একটা পৈতৃক ভিটে আছে। কাঁথিতে ছোট্ট ফ্ল্যাট”
“দেহরাদুনে কাজে এসেছিলেন?”
“বিশেষ কাজে। হয়ে গেছে। ফেরত যাচ্ছি”
বেঞ্চির ওপরই ঘুমে ঢলে পড়েছিল ওরা। সকালে লখনউ পৌঁছে স্টেশনের স্টল থেকে নিমের দাঁতন কিনে আনল। ব্যাগে টুথব্রাশ থাকতেও পাছে ধরা পড়ে যায়, ভয়ে বার করতে সাহস করল না। লোকটির দাঁতন নিয়ে বলল “কালকে আপনার নামটা জানা হয়নি?”
“সনাতন মুখুজ্জে। আপনি?”
“অতীন রায়”
দাঁত মাজা, প্রাতঃকৃত্য শেষ করে, অতীন চা কিনে আনল।
“যা গরম পড়েছে। ছত্রিশ ঘণ্টা এভাবে” রুমালে ঘাম মুছল।
“আমি তো একা ঘুরেই অভ্যস্ত। আপনাকে পেয়ে গেলাম। গল্প করেই কেটে যাবে”
“থাকেন কোথায়?” চায়ে চুমুক।
“প্ল্যটফর্মে কী বেঞ্চির অভাব না বাসস্ট্যান্ডে সরকারি শৌচালয়ের?”
এরকম ভাবেও কেউ জীবন-যাপন করে। যেমন আশ্চর্য লাগছে, তেমন করুণাও হচ্ছে। আগের জীবনের সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছে। এ মুহূর্তে কোনও পরিচিতকে পাশে চায় না। চায়, আগের জীবনের মতোই কাউকে, যে মানসিক সহায় হতে পারবে।
বিনোদ রাঠোডের তলবে চিন্তিত। খটকা লাগছে। নিশ্চয়ই ওরা লোকেশের মৃত্যু নিয়ে খোঁজ শুরু করেছে। অ্যাকসিডেন্ট মানতে পারছে না। তার কাহিনিটা বিশ্বাস করতে পারছে না। এখন ওদের স্ক্যানারে। এ কোথা থেকে কোথায় যাবে কে বলতে পারে? ওদের নেটওয়ার্ক দ্রুত কাজ করে। ওদের চোখের আড়ালে হারিয়ে যেতে হবে। ট্রেনে ওঠার আগে মোবাইল সুইচ অফ করে দিয়েছে। পুরনো মোবাইলের সিম এখনও মানিব্যাগে। হাওড়ায় নেমে ওটাকে রিচার্জ করলেই নতুন অস্তিত্বকে মুছে ফেলতে পারবে। মাস চারেক আগে করেছিল। এখনও নিশ্চয়ই নম্বরটা আছে। বিএসএনএল নম্বর। কাঁথিতে আগে ব্যবহার করত।
সনাতন মুখুজ্জে বলেছিল “এখন যদি কারও উপকারে লাগতে পারি, ঝাঁপিয়ে পড়ি। ওতেই আত্মার শান্তি। সংসার তো আর ফিরে পাব না। এই ছন্নছাড়া জীবনে আশ্রমেও ভক্তির গান গাইতে পারব না। নিজের মূল্যহীন জীবনটাকে যদি বা মূল্যবান করা যায়। এই আর কী”
সেও তো এই মুহূর্তে আশ্রয় খুঁজছে। সনাতন মুখুজ্জের থেকে আর ভালো কে হতে পারে? হাওড়ায় নেমে প্রশ্ন করল “কোথায় যাবেন?”
“জানি না। আগেই বলেছি নিজেই জানি না এরপর কী করব”
“যদি ইচ্ছে হয়, আমার সঙ্গে কাঁথিতে আসতে পারেন”
কয়েক মুহূর্ত। একগাল হেসে বলল “বেশ চলুন আপনার সঙ্গে কাঁথিতেই যাই। অন্তত প্ল্যাটফর্মে শোয়ার চেয়ে ঘরের মেঝেতে শোয়া যাবে”
অতীনের যখন ঘুম ভাঙল তখন অন্ধকার। আলো জ্বালিয়ে ঘড়ি দেখল, সন্ধে ৬টা। পাশের ঘরে উঁকি মেরে দেখল সনাতন মেঝেতে পা গুটিয়ে ঘুমোচ্ছে। ছত্রিশ ঘণ্টা ট্রেনের বেঞ্চিতে, সকাল সাড়ে-সাতটায় হাওড়ায় নেমে এসপ্ল্যনেডের বাসে পাঁচঘণ্টা। ধকল তো গেছেই। বাসস্ট্যান্ডে নেমে, রুটি তরকা খেয়ে, ফ্ল্যাটে পৌঁছে, সটান ঘুম। যতক্ষণ সনাতন ঘুমোচ্ছে, রাতের খাবার কিনে আনি। মোড়ে হেঁদুর দোকানে কুড়ি টাকায় দুটো থালি। মাল কিনলে কেমন হয়? রয়েল স্ট্যাগ, শঙ্করের দোকানের চ্যানাচুর কিনে ফেরত। সনাতন উঠে পড়েছে। কলঘরে হাতমুখ ধুয়ে পা-ছড়িয়ে মেঝেতে বসে।
“কোথায় গেছিলে?”
“রাতের খাবার আনতে। বাড়িতে কিছুই নেই। তুমি সম্মানিত অতিথি। সেলিব্রেট করার জন্য মালও কিনলাম। মাল খাও তো?”
মাথা নাড়ল “পেলে খাই। অত টাকা কই?”
“তাহলে স্নান সেরে গ্লাস নিয়ে বসি”
এই সুদূর কাঁথির ফ্ল্যাটে সে অনেক সুরক্ষিত। খোচররা টেরও পাবে না। সারা রাস্তা ভয়ে কাটিয়েছে। সনাতনকে কাছে পেয়ে ভয়টা এখন কমেছে। চাপা উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তি খুঁজছে।
“রয়েল স্ট্যাগ। কদ্দিন এসব দামি জিনিস খাইনি। আজ তোমার আতিথিয়তায় সেলিব্রেশন করে নিই”
এক চুমুক দিয়ে চ্যানাচুর এগিয়ে অতীন বলল “নাও। আসল কথা কী জান? অনেকদিন টাকা আসেনি রয়েল স্ট্যাগ খাওয়ার”
সনাতন চুমুক দিল “বেশ খেতে তো। যারা খাওয়ায়, তারা কালিমার্কা ছাড়া কিছুই পারে না। তোমার মতো বন্ধু পেলাম বলে একটু ভালোমন্দ খেয়ে নিচ্ছি”
“আমারও তেমন টাকা নেই। দেহরাদুনে কিছু টাকা পেয়ে গেলাম। অতিথি বলে কথা। আজ নয় একটু হয়েই যাক”
কয়েক পেগ পেটে পড়তে সনাতনের মুখ খুলল “এক সময়, আমিও বেশ কামিয়েছিলাম। সে এক চক্করে। আমায় বলেছিল একটা প্যাকেট পৌঁছে দিলে বেশ কিছু টাকা দেবে। হাতে কিছু নেই। রাজি হয়ে গেলাম। অনেক টাকা দিয়েছিল। ইচ্ছে হল দামি মাল খাই। সেবারই রয়েল চ্যালেঞ্জ শেষ খেয়েছিলাম”
অতীনের হাসি পেল। রয়েল চ্যালেঞ্জও দামি মদ? মেহুলির দৌলতে টিচার্স থেকে গ্লেনফেডিচ কত খেয়েছে। এই লোকটা বলছে রয়েল চ্যালেঞ্জ দামি মদ।
সনাতন বলে চলেছে “তখন কি ছাই জানতাম স্মাগলিং চক্করে পড়েছি”
“স্মাগলিং!”
“যখন বুঝলাম বেরোতে গিয়ে সে কী বিপত্তি...”
অতীনের ভেতরটা আঁকিবুকি করছিল নিজেকে হাল্কা করার। নেশা লেগেছে। মনটা পেখম মেলতে চাইছে। বলল “আমিও এমন এক চক্করে জড়িয়ে পড়েছি”
সনাতন চুপ। বোঁচকাতে হাত। দেখে অতীন বলল “কিছু খুঁজছ?”
“দেখলাম মুড়ির ঠোঙাটা ঢুকিয়েছি কি না। নাঃ... ঠিক আছে”
অতীন বলে চলেছে “আমার দাদা বিপিনের মেয়ে মুম্বাইয়ের নামকরা মডেল। তার জন্য বিশ্বস্ত সেত্রেুটারির কাজ করতে আমায় মুম্বাই নিয়ে গেল। ভাড়ার ফ্ল্যাটও দিয়েছিল। মাইনে যদিও বেশি দিত না, চলে যেত। কিছুদিন পর দেখলাম ভাইঝির সে কী জীবন! আজ এর সঙ্গে তো কাল ওর সঙ্গে। বেশ্যারও অধম। কী আর বলব, শুধু বেশ্যাবৃত্তি করে তারকা হওয়াই নয়, চতুর্বেদী বলে এক ডনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল। পরে জানলাম, শো-বিজ লাইন শুধু দিখাওয়া। তার সঙ্গে এক সাধুবাবা ভওয়ানিশঙ্কর, স্মাগলিং থেকে মেয়ে পাচারে জড়িয়ে”
একটু থামল। সনাতন শুনে যাচ্ছে। গল্প শুনতে ভালোবাসে।
“ওর সেক্রেটারি থাকাকালীন গ্ল্যামার, সো-বিজ অনেকের সঙ্গেই পরিচয়। ওদের ছোটখাটো কাজও করে দিতাম। এক্সট্রা টাকা দিত। ভাইঝি এমনিতেই বদমেজাজি। মেহুলির মুখঝামটা কত সহ্য করব? কাকা বলে কথা। মানসম্মান আছে তো। আমিও হাঁপিয়ে উঠছিলাম ওর সাঙ্গপাঙ্গদের দেখে। ধোঁয়াটে লোকেদের সঙ্গে বড় বড় কারবার। দুজনের কাছাকাছি এসে পড়ি। অনেক টাকা দিত। বেশি টাকা পেলে করবে না কেন? কী কাজ করছি, বয়েই গেল”
নেশার ঘোরে সনাতনের হুঁশ নেই “বিপিনদা যদ্দিন বেঁচেছিল চাকরিটা ছাড়িনি কেবলমাত্র বিপিনদার মুখ চেয়ে। বছর দুয়েকে আগে, বিপিনদা মারা যাওয়ার পর আর নিতে পারলাম না। চাকরিটা ছেড়ে ওদের সঙ্গে ভিড়লাম”
“তাহলে বল শেষ পর্যন্ত ভালোই হল?”
“ভালো! তখন কি ছাই জানতাম গরম তাওয়া থেকে জ্বলন্ত উনুনে ঝাঁপ দিয়েছি”
সনাতন শুনছে। বোঁচকায় হাত “জ্বলন্ত আগুন কেন?”
“সব তো বলতে পারব না। ওরা দেখলাম খুনের চক্রে জড়িয়ে। খুন! কারণে-অকারণে খুন করছে। আমাকে জড়িয়ে ফেলল”
“এর মধ্যে জড়ালে কেন?”
“কী করব। ডেঞ্জারাস লোক। না করলে, ওদের মতো আমাকেও হাপিস করে দেবে। প্রচুর টাকাও দিত ভওয়ানিশঙ্কর, চতুর্বেদী। তবে সাংঘাতিক লোক”
“পালাবার চেষ্টা করোনি?”
“ওদের ব্যাবসার ফাঁদ সর্বত্র। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি। আমাকে মুছে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না” বুকটা মুচড়ে কেঁদে উঠছে “মেহুলির মুখঝামটা খেয়ে ওর চাকরিতে থেকে গেলেই ভালো ছিল। লোভ সামলাতে পারিনি”
“পুলিসকে খবর দাওনি?”
“অনেকবার ভেবেছিলাম জানাব। একেই বলে বরাত। একদিকে প্রচুর টাকা। অন্যদিকে পুলিস তো আমার মতো ছাপোষা লোকের কথা বিশ্বাস করবে না। ওরা টাকা খাইয়ে কেস ঘুরিয়ে আমাকেই জেলে পুরে দিতে পারে। সব-ই কপাল। এসব নানা সাতপাঁচ ভেবে মেনে নিলাম। আমি কাজটা করলেও খুন তো ওরাই করছে। সব সময় আমাকে দিয়ে নয়। তোমার মতো, অনেক জায়গায় পার্সেল পৌছনোর কাজ করেছি মাত্র। খুন করেছে অন্য কেউ”
“এরকম কটা জায়গায় করিয়েছে?”
“জানি না। আমি সাত-আটটায়। ম্যাথেরনের অ্যাকসিডেন্ট, আমিই সব বন্দোবস্ত করেছিলাম। শেষটা দেরাদুনে”
হর-কি-পৌড়ি, লোকেশ চাডার কাহিনি শোনাল।
“এর মাথা কে?”
“বলতে পারব না। ওরা আমায় শেষ করে দেবে”
সনাতন রয়্যাল স্ট্যাগে চুমুক দিয়ে বলল “থাক। বলতে হবে না। প্রত্যেকেরই গোপন কিছু থাকে। আমাকে বলতে গিয়ে প্রাণ হারাও, সেটা আমি চাই না। আমার কিছু যায়-আসে না”
“এখন বলোত ভায়া বেরোই কী করে?”
“ভাবতে হবে। নেশায় মাথা কাজ করছে না। রাতটা ভাবতে দাও। আমি যখন এর থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি, তুমিও পারবে”
সনাতনের কথায় মনটা জুড়ল। হয়ত কাল একটা উপায় বাতলাতে পারবে। নিজেও তো এরকম খপ্পর থেকে বেরিয়েছে। অনেক জমানো ব্যথা মুক্তি পেল।
সনাতন বলল “বড্ড খিদে পেয়েছে। খেতে দাও। এই কদিন যা ধকল গেছে। ঘুম না হলে মাথা কাজ করবে না। কালকের মধ্যে উপায় একটা বার করবই”
খেয়ে বেসিনে থালা রেখে চৌকিতে শুয়ে পড়ল “তুমি এখানে শুতে পার”
“না ভাই, পাশের ঘরের মেঝেটাই ভালো। একদিনে অভ্যাস খারাপ করে দিও না”
তখনও ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি। আধো-অন্ধকারের বুক চিড়ে সূর্যের ফিকে আলো ঢেকে দিয়েছে কাঁথি শহর। ভোর হলে মুখর হবে বাংলার শহরতলি। কলিং বেলটা বেজে উঠল। শোনেনি অতীন। আবার বাজল। ভোর রাতের ঘুম কী সহজে ভাঙে? তার ওপর, কালকের মালের নেশা।
ক্রিইং... ক্রিইং... ক্রিইং...
এত সকালে কে? পাশের ঘরে এসে দেখল, সনাতন পা গুটিয়ে ঘুমোচ্ছে। দরজা খুলতেই অবাক। সামনেই পুলিসবাহিনী! ওদের মধ্যে একজন সুপুরুষ আইডি কার্ড দেখিয়ে বলল “স্নেহাশিস চ্যাটার্জি। সুপারিন্টেডেন্ট অফ পুলিস। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট”
“কেন? কী হয়েছে? আমি কী করলাম?” তোতলাচ্ছে।
“আই অ্যারেস্ট ইউ অন চার্জেস অফ মার্ডার। সেকশন ৩০২/৩০৪ আইপিসি। যা বলার থানায় বলবেন”
পুলিসেরা যখন অতীনকে হাতকড়া পড়াচ্ছে, সনাতনের ঘুম ভেঙে গেছে। উঠে এসেছে এত লোকের শব্দে। তার দিকে তাকিয়ে স্নেহাশিস বলল “থ্যাংক ইউ মিঃ মধুসূদন মুখার্জি”
হাতকড়া পরা অবস্থাতেই অতীন ফিরে তাকাল সনাতনের দিকে। মুচকি হেসে সনাতন বলল “সনাতন নয়, মধুসূদন মুখুজ্জে। অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিস”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।