অনিরুদ্ধ বসু
কে খুন করেছে, ক’টা খুন করেছে, কীভাবে খুন করেছে, সে নিয়ে মধুসূদন ভাবছে না। ভারতের প্রত্যেকটি শহরে বাঘা বাঘা পুলিস অফিসারের কমতি নেই। তাদের দক্ষতা ও চাতুর্য মধুসূদনের চেয়ে অনেক বেশি। তাইতো তারা উন্নতি করেছে। সে হিসেবে, মধুসূদন কিছুই করতে পারেনি। না চাকরিতে, না গিন্নিকে খুশি করতে, না পেরেছে বসদের সন্তুষ্ট করতে। তাইতো তাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার পদবি দিয়েও, দূর বিভুঁইয়ে কাজে না পাঠিয়ে লালবাজারে বন্দি করে রেখেছে কমিশনার-ভূষিত কেরানির কাজে। তার স্বল্প ক্ষমতার মধ্যে, একমাত্র দশাসই টেপিকে পার করতে পেরেছে। রিটায়ারের সময় এগিয়ে আসছে। জীবনের সন্ধ্যায় নতুন আলো জ্বালার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। এতদিন পল্টুর দোকানের শনিবারের আড্ডাই বেঁচে থাকার সম্বল ছিল। এখন এই চক্রকায় মাকড়শার জালে একটু ছন্দ খুঁজে পাচ্ছে। এই ছন্দই তো আসল আনন্দ। বেসুরা রাগ আবার নতুন করে সুর খুঁজে পেয়েছে। আবছা ধোঁয়াশায় ভরা হলেও নতুন ঐকতান। তাকে শুধু সিম্ফনিতে বাঁধতে হবে। একই তালে, সুরে।
খুনগুলোর মধ্যে লিঙ্ক থাকলে কেন করছে? অজানা অঙ্ক? না কি, উন্নত বুদ্ধির সুপরিকল্পিত মানসিক রসায়নের নির্মম বাস্তবায়ন? এর জবাব হয়ত দিতে পারে ডাঃ অনঙ্গ দত্ত। ফোন করল “মধুসূদন। চিনতে পারছেন স্যার?”
“কেন চিনব না? খুনের কিনারা হল?”
“না। ওই জন্যেই আপনাকে বিরক্ত করছি। স্যার, আর একটু সময় দিতে পারবেন?”
“কাল চেম্বারে আটটা-সাড়ে আটটায়”
“একটু সময় লাগবে স্যার”
“চলে আসুন না সাড়ে আটটায়। তখন চেম্বার শেষ হয়ে যাবে”
রাত সাড়ে আটটায় মধুসূদন যখন চেম্বারে হাজির তখনও শেষ পেশেন্টের সঙ্গে কথা বলছে। রিসেপশনে বসে রইল, চার-পাঁচজন মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভের সঙ্গে। আরও এক ঘণ্টা পরে এলেই হত। মিনিট পনেরো লাগল শেষ পেশেন্টের বিদায় নিতে। দশ মিনিটে মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভদের পাট চুকিয়ে ডাঃ দত্ত কনসালটিং রুম থেকে বেরিয়ে ডাকল “অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। ভেতরে আসুন”
সিগারেটের প্যাকেট টেনে বলল “একটা সিগারেট খাই। অনেকক্ষণ খাইনি। হঠাৎ খুন নিয়ে মাতলেন কেন?”
“স্যার আমি রিপোর্টং সেকশনে ছাপোষা চাকরি করি। ফাইলগুলো তাকে সাজিয়ে কোন কেসের কতদূর গতি হয়েছে, সেই রিপোর্ট লেখা ছাড়া আর বেশি কাজ নেই। সময় কাটাবার জন্য ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টগুলো খুঁটিয়ে পড়ি”
“সে তো অনেকদিন থেকেই করছেন। হঠাৎ এই কেসটা আপনার মন কাড়ল?”
“রিপোর্টগুলো পড়ে মনে হল কোথাও এই মৃত্যুগুলোর সংযোগ আছে। যারা ইনভেস্টিগেশন করছে তারা তো নিয়ম মাফিক ঠিকই করছে। আমি কোনও ইন্ডিভিজুয়াল খুন নিয়ে ভাবছি না। এগুলোর মধ্যে লিঙ্ক আছে, কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য”
“আমার কাছে কী জানতে চান?”
“মোটিভটা। ক্যান দেয়র বি এ কমন মেন্টাল সাবস্ট্রেট টু দিজ কিলিংস?”
সুখটান দিল “আমরা শ্রমিক মানুষ। রোজ সকাল আটটা থেকে রাত আটটা প্র্যাকটিস করি। অনেক সময় মনে হয়, আমি কী শুধুই সাইকিয়াট্রিস্ট? না সাইকোফার্মাকোলজিস্ট? এখন চেম্বারের দরজা দিয়ে কেউ ঢুকলেই, প্রবলেমটা বুঝে যাই। মনে মনে চলে নানান নিউরোট্র্যান্সমিটারের সিগন্যাল ক্যাসকেডের অঙ্ক”
“আপনি আপনার কথা বলুন। শুনতেই তো এখানে এসেছি। হয়ত আপনার কথার মধ্যে সূত্রটা খূঁজে নিতে পারব”
সিগারেটের শেষ অংশ অ্যাশট্রেতে ফেলে বলল “চা খাবেন?”
“মন্দ হয় না”
রিসেপশনিস্ট তখনও বসে। স্যার না বেরলে চেম্বার বন্ধ করে যাওয়া হবে না। রাত হলে স্যার নিজেই গাড়িতে পৌঁছে দেন। মাঝে-মধ্যে ফেরার পথে ভালো রেস্তরাঁয় খাইয়েও দেন। ঘরে ফিরে রান্না করতে হয় না। যদিও সে পিজি অ্যাকোমোডেশন, প্রায়শই ফিরতে রাত হয় বলে মালকিন ঘরে রান্নার অনুমতি দিয়েছে। মফসসলের মেয়ে, রাতে ফিরে কোথায় খাবে? সারাদিন খাটাখাটনির পর রাতের রান্নাটাও নিজেই করতে হয়। সেটাতেও কুঁড়েমি।
ডাঃ অনঙ্গ দত্ত ইন্টারকমে বলল “মিতালি দু কাপ চা কর”
“আনছি স্যার”
বুঝল আলোচনা বেশ কিছুক্ষণ চলবে। স্যার খাইয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারে। মুড হলে স্যারের গোপন ফ্ল্যাটে নিশিযাপনও। যদি অবশ্য ইচ্ছে হয়। মন্দ লাগে না। দুর্গাপুরে পৈতৃক বাড়ি, লেখাপড়া, বড় হওয়া। কলকাতায় বেশি বন্ধু-বান্ধব নেই। এই স্বল্প মাইনের চাকরিতে বিনোদনের অবসরও নেই। মনকে নিজের অবস্থার সঙ্গে বশ করলেও, দেহ মানে না। উঠতি বয়সের চাওয়াও তো আছে। অস্বীকার করবে কী করে?
ডাঃ দত্ত বলল “হ্যাঁ, যা বলছিলাম। আমি তো আর ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট নই। ফরেনসিক সাইকিয়াট্রি, চায়েল্ড সাইকিয়াট্রির মতো অ্যামেরিকান বোর্ড কোয়ালিফিকেশন। কলকাতায় যেমন অনেক সেলফ-স্টাইল্ড চায়েল্ড সাইকিয়াট্রিস্ট আছে, ভারতেও অনেক কিছু সেলফ স্টাইল্ড ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট পেতে পারেন। আপনার পক্ষে আইডিয়াল হত মুম্বাইয়ের মাধুরী মিত্তাল। যে দুটো মালবরোর প্যাকেট ফুঁকে নিহারি-কাণ্ড সলভ করে দিল। সে তো এখন ভারতে নেই। মাস ছয়েকের জন্য মেলবোর্ন ও অন্যান্য জায়গায় লেকচার দিতে গেছে। কলকাতায় এলে আমার বাড়িতেই ওঠে। আপনার সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিতাম”
“মাধুরী মিত্তালকে যখন পাওয়াই যাবে না, আপনি কি সাহায্য করতে পারবেন না?”
“মুখার্জিদা, আপনি ‘প্রোফাইলার’ সিরিয়লটা দেখেছেন? আমি যখন অ্যামেরিকাতে সাইকিয়াট্রিক কনফারেন্সে যাই, আমার বউ তনুকার জন্য সব টিভিশোগুলো কিনে নিয়ে আসি। পর্নি থেকে প্রোফাইলার, স...ব...। প্রোফাইলারে এমন সুন্দরী আছে যাকে দেখে এই বয়সেও আপনার জিভে জল এসে যাবে। তাকে কিন্তু আমি ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট মনে করি না”
“আমার তো অন্য কোনও গতি নেই। আপনিই হচ্ছেন এখনকার রক্ষাকর্তা”
“এই হচ্ছে নন সাইকিয়াট্রিস্ট আর আর সাইকিয়াট্রিস্ট-এর মধ্যে পার্থক্য। আই কনসিডার দ্যাট লেডি ইন ‘প্রোফাইলার’ দো ফিক্টিশিয়াস সি মে বি, এ ফরেনসিক অ্যাস্ট্রলজার। উনি কেস সায়েন্স দেখে শুধু বাইরের অনুমানে আপনার ফ্যমিলি ট্রি, লাইকস অ্যান্ড ডিসলাইকস, সামনে ফেলে দিতে পারেন। ফরেনসিক সাইকিয়াট্রি ইজ ইন্টারেস্টিং বাট ইকুয়ালি ডিফিকাল্ট সাবজেক্ট”
ততক্ষণে মিতালি চা করে এনেছে। মধুসূদন মিতালির দিকে তাকাল। দেখতে খারাপ নয়। ভাগ্যিস ডাক্তারের চেম্বারে কাজ করছে। নইলে সেও এই উঠতি মাদকতার জৌলুসের পেছনে ছুটত। ঝুঁকে মধুসূদনের দিকে চা এগিয়ে বলল “ক চামচ চিনি দেব স্যার?”
“এক চামচ” গিন্নির ওয়ার্নিঙে এখন একে।
ডাক্তারের রুচি আছে বটে। রিটায়ারমেন্টের বয়স হলেও মিতালির লো-কাট সালোয়ারের ফাঁকে খাঁজের ওপর চোখ পড়ল। এই নারী-পুরুষের আকর্ষণ যুগ-যুগান্তর ধরে চলে আসছে। স্বর্গে পিতামহ ব্রহ্মা রম্ভা-উর্বশী-মেনকাকে দেখে যদি আকৃষ্ট হতে পারে, মর্ত্যে মধুসূদন বা অনঙ্গ দত্ত কোন ছাড়?
চিনি নেড়ে বলল “মাধুরী মিত্তাল যখন নেই, দেখি আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি কি না। সাইকিয়াট্রি শুনলেই একটু বিশ্লেষণ করতে মন কেঁদে ওঠে” মিতালির নিতম্বের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল “আমি প্রতি মুহূর্তে আমার সাবজেক্টের সঙ্গে প্রেম করছি। ভাববেন না, অন্য মহিলারা আমার জীবনে নেই”
সেই অন্য মহিলাদের মধ্যে এই রিসেপশনিস্ট মিতালিও আছে অনুমান করতে পারছে।
অনঙ্গ বলে চলেছে “সেসব সুন্দরীদের খবর তনুকাও জানে। আর এও জানে। সি ইজ দ্য আল্টিমেট লেডি ইন মাই লাইফ। ইজিপশিয়ান মিথলজির ভাষায় যাকে বলে কসমিক পার্টনার। যাক সে কথা। সাইকিয়াট্রির কিছু ডিটেলস না বললে ব্যাপারটা বুঝতেন না, তাই। এবার আপনার কাহিনি শুনি”
যতটা সংক্ষেপে সম্ভব মধুসূদন খুনের ঘটনার বিবরণ দিল, ছোটখাটো ঘটনাগুলো বাদ দিয়ে। শেষ হতে বলল “একটা অদ্ভুত সিমিলারিটি লক্ষ করছিলাম। যারা খুন হয়েছে সবাই ব্রিলিয়ান্ট ছেলে নয়ত সুন্দরী মেয়ে”
আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল “যেই খুন করে থাকুক না কেন, প্রত্যেকটা খুনের মধ্যেই প্রখর বুদ্ধির ছাপ। দেয়ার ইজ এ কমপ্লেক্স ইন্টারপ্লে অফ অ্যান ইনটেন্সলি ফিলসফিক্যাল মাইন্ড। সিমিংলি আনফ্যাদমেবল। দ্য ক্রুডেস্ট ডিসপ্লেসমেন্ট অফ সাম ডিপ-সিটেড অ্যাঙ্গস্ট”
“বুঝলাম না। আধ্যাত্মিক কিছু?”
“হতেও পারে। কে জানে? মার্ডারগুলোর পেছনে কোনও স্থূল বা মেটিরিয়ালিস্টিক মোটিভ বোধহয় নেই। খুনির নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেটা যে কী তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। হয়ত গভীর কোনও দর্শন। নিজস্ব সুদৃঢ় চিন্তাধারা। সেই চিন্তাধারকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্যই এই প্রচেষ্টা”
“সে কি নর্ম্যাল?"
“নর্ম্যালিটি ইজ এ স্ট্যাটিস্টিক্যাল কনসেপ্ট। দেয়ার ইজ এ ভাস্ট গ্রে এরিয়া ইন ইট। হিটলার, স্ট্যলিন, চার্চিল, মুসোলিনির বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে মূল্যায়ন হয়েছে। যুগ-যুগান্তর ধরে তর্কের পর্যায় থেকে গেছে”
“তার মানে কি বলতে চান, খুন করা পাপ নয়?”
“রোজ তো হাজারও খুন হচ্ছে। আপনি আরও ভালো জানেন। কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, ঝট করে বিচার করতে বসে যাই। গানটা মনে পড়ে ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে’”
“সেটা তো দেশাত্মবোধক ব্যাপার”
“দেশ কালের মাপের পরিধি ছাড়ালে দেখবেন, বিশ্বাসই আসল। কী বিশ্বাসে এই তীক্ষ্ণবুদ্ধি খুনগুলো করছে সেটাই ভাবার। এটুকু বলতে পারি সে ডাক্তারি, ফরেনসিক, ফিজিক্স গুলে খেয়েছে। যে সে লোক নয়। তার আইকিউ আর ইকিউ অনেক বেশি”
“কে হতে পারে?”
“বলতে পারব না। তবে তার মধ্যে মাস লিডারশিপের কোয়ালিটি আছে। চেনা নিয়মের বাইরে গোটা জাতিকে জাগাবার। সঙ্গে অসম্ভব কম্পালশন। যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলি ‘অবসেসিভ কমপালসিভ পারসোনালিটি’...রেসিলিয়েন্ট। যা করবে ঠিক করেছে, করেই ছাড়বে। হোক না চেনাজানা অঙ্কের বাইরে”
মধুসূদন বুঝতে পারলেও ধরতে পারছে না, কোন সূত্রে এগোবে। একটু ভেবে বলল “ভওয়ানিশঙ্কর হতে পারে?”
“ওই ম্যাথেরনের সাধু? হ্যাঁ, হতে পারে। কিছুক্ষণ আগেই তো বললেন, এই লোকটি ম্যাথেরনের মতো ছোট্ট জায়গায় ভক্তদের নিয়ে বিরাট আশ্রম করে সাম্রাজ্য চালাচ্ছে। মুম্বাইকে হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছে”
“মুম্বাইয়ের তাবড় তাবড় লোক ওর শিষ্য শুনেছি”
“এরা কেউ বোকা নয়। কী করে এদের বেষ্টনীতে ধরে রেখেছে? কী করে এদের মুগ্ধ করে, নিজের শিষ্যত্বে পরাধীন করেছে? ভেবে দেখুন তো। লোকটির আতীত খতিয়ে দেখুন। বলছি না এ-ই করেছে। এরকম একটা এগোসেন্ট্রিক লোকই এই ধরনের চিন্তা করতে পারে। কোনও সাধারণ লোক নয়”
মধুসূদন বুঝতে পারছে তার চিন্তাধারা ঠিক। কিন্তু এই ধরনের লোকের অন্তরে পৌঁছতে গেলে তাকে তো তার সাকরেদের সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু সেই সাকরেদটাকে ধরবে কী করে? হাতে একটাই জলজ্যান্ত প্রমাণ - ওই ছবির লোকটি। ওটাই এখন এগবার একমাত্র সূত্র।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।