চার

অনিরুদ্ধ বসু

ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দ্রেয়াকে মেপে বলল “ইউ ওয়ান্ট এ ব্রেস্ট এনলার্জমেন্ট? হোয়াই?”

“মাই প্রডিউসার প্রেফার্স মি উইথ বিগ বুবস্”

“ইউ?”

“হোয়াই নট? দ্যাট ইজ দ্য ওয়ে দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ মুভিং। ইট উড বি নাইস টু হ্যাভ বিগ বুবিস। আই উড লুক মোর অ্যাট্র্যকটিভ। ইট উড গিভ মি মোর কনফিডেন্স”

ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায় ভালোভাবে আন্দ্রেয়াকে পরখ করল। দিল্লির মেয়ে। কলকাতার থেকে তফাত তো থাকবেই। কলকাতার মেয়ে যা লাজুকভাবে বলে, দিল্লির মেয়েরা অনেক খোলাখুলি। সোজাসুজি। আন্দ্রেয়া স্বাভাবিকভাবেই কথাটা বলেছে। কে কীভাবে বলছে, ভেবে কী লাভ? রোজগার করতে এসেছে। মানুষের আচার-আচরণ বিশ্লেষণ করা তার কাজ নয়। তার সুনামে, অপেক্ষাকৃত কম খরচে অপারেশন পাবে বলে, দূর-দূরান্ত থেকে মেয়েরা উড়ে আসে। এদেশ কিংবা বিদেশ। কসমেটিক সর্জারি ইজ নট কভার্ড বাই ইনসিওরেন্স। সো কোয়ালিটি অ্যাট এ চিপার প্রাইস, ইজ দ্য কি এসেন্স অফ দ্য বিজনেস।

আন্দ্রেয়া হিরোইন হতে চায় মুম্বাইতে। ছুটে এসেছে কলকাতায়। একেবারে ত্রিভুজ। ছিপছিপে গড়ন। পাঞ্জাবি মেয়েদের থেকে একটু আলাদা। লক্ষ করেছে পাঞ্জাবি মেয়েরা দৈহিক অনেক বেশি হৃষ্টপুষ্ট। আন্দ্রেয়া অন্যান্য পাঞ্জাবি মেয়েদের থেকে একটু আলাদা।

“সো হোয়াট সাইজ উইল মেক ইউ হ্যাপি?” আশিসের প্রশ্ন।

“সামথিং রিয়েলি বিগ" দু-হাত ফাঁক করে বোঝাবার চেষ্টা করল “নট অ্যাস বিগ অ্যাস প্যমেলা অ্যান্ডারসন। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই মিন?”

“সি প্লাস কাপ ওর ডি?”

“আই সাপোস সো” অনিশ্চয়তায় কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত।

আশিস চশমার ফাঁক দিয়ে এবার আন্দ্রয়াকে ভালো করে দেখল। ছিপছিপে গড়ন। আজকালকার মডেলরা যেমন হয়। সরু নিতম্ব। মুখটা শ্যামলা হলেও ঠোঁট আকর্ষণীয়। মুখ আন্দাজে একটু পাতলা। ভারী হলে ব্রেস্টের সঙ্গে বেশি মানাত। টপস্ পরা অবস্থায় ব্রেস্ট আছে কি না বোঝাই যায়। প্রডিউসার যে একটু উন্নত বক্ষ চাইবে - এ আর আশ্চর্য কী? চেহারাতে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাপ থাকলেও আধুনিকতার একটা প্রলেপ লাগাবার চেষ্টা বেশভূষায় প্রকট। কোনও বৈচিত্র নেই। এমটিভি-র সন্দেশের ছাঁচ।

ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফাই করার জন্য জিজ্ঞেস করল “হোয়ার ডু ইউ স্টে ইন ডেলহি?”

“মিনটো রোড। তিলকনগর এরিয়া”

এবার বোঝা গেল। কেন দিল্লিতে না করিয়ে কলকাতায় প্লাস্টিক সার্জারি করাতে এসেছে। দিল্লির কোনও উচু মহলের ক্যান্ডিডেট নয়। যদিও সেই স্তরে পৌঁছতে চাইছে। তাই কম খরচের গন্তব্য কলকাতার প্রসিদ্ধ প্লাস্টিক সার্জেন ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধায়।

“ইফ আই মেক ইট বিগার, পিপল উইল হ্যাভ এ ন্যাচারাল টেন্ডেন্সি টু লুক অ্যাট ইওর বুবস, দ্যন ফেস। আই থিংক সি কাপ উড বি গুড এনাফ। জাস্ট ওয়ান্ডারিং ইফ ইওর লিপস্ কুড বি অগমেন্টেড সাইমাল্টেনিয়াসলি। ইট উড ম্যাচ ইওর প্রোফাইল। ... জাস্ট এ থট”

আন্দ্রেয়া সামনের আয়নায় নিজেকে দেখল। ঠোঁটাটা কী খুব পাতলা? অনুপ যেদিন প্রথম চুমু খায়, সেরকম কিছু বলেনি। সে অন্য কথা। অনুপ ঠোঁটের উষ্ণতা অনুভব করতে ব্যস্ত ছিল। যৌবনকে রাঙিয়ে দিতে। তার পরে ভেতরে সুপ্ত নিম্নাঙ্গের কামনার মুক্তি খুঁজছিল। উষ্ণতার আবেগে ঠোঁটের দিকে তাকাবার সময় হয়নি। দেহের উষ্ণতা ছাপিয়ে গিয়েছিল রূপের বাহার।

অনুপের চুমু খাওয়া আর মুম্বাইয়ের ইঁদুর দৌড়ে হিরোইন হওয়া এক জিনিস হল? ভাগ্যিস দিল্লির ‘দ্য নিউ এজ’ এজেন্সিতে পোর্টফোলিওটা পাঠিয়েছিল। সে তো আর কোনও সৌন্দর্য কম্পিটিশনে প্রথম হয়নি। দ্য নিউ এজ পোর্টফলিওটা মুম্বাইতে ফরওয়ার্ড করে। সেই থেকে এক প্রডিউসার তার নতুন ছবির জন্য ওকে বাছাই করে। শুধু দুটো শর্ত - আধুরা অংশগুলো কোনও প্লাস্টিক সার্জেনকে দিয়ে দর্শকের উপযোগী করতে হবে। আর কন্ট্র্যাক্ট সই করার আগে প্রডিউসারের শয্যাসঙ্গী হতে হবে। না বললেও আন্দ্রেয়ার অজানা নয়, বহুদিন আগেই তা দিয়েছে অনুপের কাছে। নয় এক রাত্রি কোনও মাঝবয়সিকে সঙ্গদান করল। যদি ভবিষ্যৎটা খুলে যায়, ক্ষতি কী?

ছুটে গেছিল দ্য নিউ এজের কর্ণধার ইন্দ্রাক্ষি রায়চৌধুরীর কাছে গ্রেটার কৈলাসের অফিসে। সেখান থেকেই ডাঃ বন্দ্যোপাধ্যায়ের হদিস। সস্তায় ভালো প্লাস্টিক সার্জেন। সে-ই যখন প্রসঙ্গটা তুলল, আবার নিজেকে আয়নায় দেখল। মিথ্যে বলেনি তো। সত্যি তো, ঠোঁটটা প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মতো হলে বোধহয় আরও ভালো লাগত।

“হোয়াট ডু আই হ্যাভ টু ডু?”

“জাদা কুছ নেহি। একঠো ইনজেকশন দেনেসে ঠিক হো জায়েগা। অ্যাকোয়ামিড। হোয়েন ইউ কাম ফর ফলো আপ। জো ম্যায়নে সোচা ওহি বোলা। অব ইয়ে তুমহারা মর্জি” এটাই আশিসের স্টাইল। জোর করে চাপিয়ে দেয় না। এমনভাবে কথাটা পাড়ে, পেশেন্ট শেষ পর্যন্ত সেটা করিয়েই যাবে। যত করাবে, তত পয়সা।

এরা হিরোইন হতে চায়। স্বপ্নে ভরপুর এদের চিন্তাধারা। ইন্দ্রাক্ষির কাছে শুনেছে টুকটাক মডেলিং করেছে। একটা শুটে অনেক টাকা পায়। এই ছোটখাটো মডেলরা যদি হিরোইন হওয়ার আঙুর দেখে, কথাই নেই। টাকা ছাড়তে আপত্তি করবে না। এদের সাইকোলজিটা জানা হয়ে গেছে। সবাইকে টেক্কা দিয়ে এরা শিখরে পৌঁছতে চায়। সবসময় ভাবে যদি আরও সুন্দর হওয়া যায়। তাহলে অন্যদের লেঙ্গি মেরে বেরিয়ে যাওয়া যাবে। আশিসের কাজ ওদের সুপ্ত বাসনাটাকে জাগানো, কেল্লা ফতে।

এক সময় কত কষ্টই না করেছে। ভাটপাড়ার মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। বাবা ছিল গোঁড়া ব্রাহ্মণ। উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। ছেলেকে ডাক্তারি পড়াতে গিয়ে বিশেষ কিছুই রেখে যেতে পারেনি। অনেক শখ ছিল। অন্য ছেলেরা যখন নতুন জামা পড়ত, ভালো রেস্তরাঁয় খেত - তখন পাইস হোটেলে খাওয়া বা মায়ের রুটি-তরকারি খেয়ে নৈহাটি লোকাল। টাকার অভাবে অনেক শখ আহ্লাদ মেটাতে পারেনি। তারপর নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে চান্স। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হঠাৎ স্বর্গ পেল। সেখান থেকে কলকাতার এমএস। চণ্ডীগড়ে এমসিএইচ। ভাগ্যের চাকা ধীরে ধীরে ঘুরতে লাগল। ফেরত এসে প্র্যাকটিস। তেমন কিছু হত না। বার্ন আর স্কিন গ্রাফটিং। অর্থপেডিক সার্জেনদের কিছু রেফ্যারেল।

রোজগারের থেকে বউ শুচিস্মিতার প্যানপ্যনানিই বেশি “তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না। ভাবলাম প্লাস্টিক সার্জেনকে বিয়ে করে সারা জীবন আরামে কেটে যাবে। তা না ... ওই মাস গেলে হিসেব”

কুলকিনারা না পেয়ে, মিথ্যে স্বপ্নের প্রাসাদ ভেঙে, ছোটবেলার প্রেমিক অনঙ্গর হাত ধরে ডিভোর্স। আমেরিকায় পাড়ি দিল শুচিস্মিতা। আশিস একা। রাতের খাবার গরম করতে গিয়ে ভাবছে, এটা কী জীবন!

টাকা নেই। বউ নেই। ঘর নেই। কী রইল জীবনে?

অন্ধকারে টিভি দেখা আর মাল খাওয়া ছাড়া এন্টারটেনমেন্টও নেই। সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। আর স্বপ্ন নয়। শুধু বাস্তব। টাকা চাই। সুন্দরী চাই। অনেক... অনেক... অনেক। বউ যখন নেই, তখন রোজ রাতে নিত্য নতুন সঙ্গিনী একান্ত প্রয়োজন। টাকা না থাকলে, কে সঙ্গ দেবে? যৌবনকে যতই বোতলের মধ্যে বন্দি করে রাখা যাক না কেন, ছিপিটা খুলে বেরিয়ে আসতে চায়। খালি বেহুলার বাসরে ছিদ্রের অপেক্ষা। সুপ্ত উচ্ছ্বাস কী বাধা মানে?

ভাটপাড়ার ছেলের টাকা না থাকলে মেয়েরা আসবেই বা কেন? শুরু হল আরেক নতুন ব্যবসায়িক খেলা। পেপার, টিভি, ইন্টারনেটে অ্যাড। লিন্ডসে স্ট্রিটের অলিগলির হোটেলগুলোয় টাউট ফিট করা। ম্যাজিক ঘটল। কে শালা বার্ন আর পচা ঘায়ের জমাদারি করে? তার থেকে হাটে সৌন্দর্যের স্বপ্ন বেচো। সব হবে। টাকা, মেয়েছেলে, যা চাও। আর যেসব স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেছে... স... ব...

জীবন আবার নবরূপে দেখা দিল নানা পসরা নিয়ে। প্রগতিশীল বিদেশি ছাঁচে ঘেরা সভ্যতার হাত ধরে। টিভি, মিডিয়ার সাপ্লিমেন্টগুলো না-পাওয়া বাসনার আগুনে ঘি ঢালল লন্ডন পাব, তন্ত্র, ইনকগনিটো ঘেঁষা মহিলাদের নতুন যুগের কান্ডারি করে। পেজ থ্রি ফুলেফেঁপে ব্যবসার পসরা সাজিয়ে দিল আশিসের দ্বারে। শুধু মহিলা নয়, ছেলেরাও উষ্ণতার মধ্যে দেহ খোঁজে। টিভি সিরিয়ালের পথে পা বাড়াতে গেলেও সেই দেহ। বেদবাক্যটা সাজল নতুন আভরণেঃ

দেহং সত্য দেহং ধর্ম

দেহই পরমং তপঃ

দেহই বাজারে একমাত্র পণ্য

তাকেই শ্রদ্ধায় পূজা কর

আন্দ্রেয়া নিজেকে আয়নায় দেখে বলল “এনিথিং এলস্ আই নিড?”

আন্দ্রেয়ার সরু নিতম্বে হাত বুলিয়ে বলল “ইউ হ্যাভ ট্রোক্যান্টারিক ফ্যাট। এ বিট অফ লাইপোসাকশন উড কমপ্লিট দ্য স্টোরি”

যত অপারেশন, যত বিত্রিু করতে পারবে তত অর্থ। মানি ইজ হানি। সেই হানি লুকিয়ে আছে হানিগুলোর হীনমন্যতাকে জাগ্রত করায়। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করল, ঠিকমতো কী ঢালতে পেরেছে? চোখ বলছে আন্দ্রেয়া ভাবছে। মশলাতে কাজ হয়েছে। ঘি যদি আগুনে ঠিকমতো ঢালা যায় আগুন তো জ্বলবেই। আশিসের কোমল উষ্ণ স্পর্শের জাদু সৌন্দর্য বৃদ্ধির রং ছড়িয়েছে। যার হাতে এত যাদু, না জানি ছুরি চালানোয় আরও কত কী!

“ইফ আই ওয়ান্ট ব্রেস্ট এনলার্জমেন্ট অ্যান্ড লাইপোসাকশন হোয়াট উড বি দ্য প্রাইস?”

“নট এ লট। অ্যাবাউট ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ। মাচ চিপার দ্যান ডেলহি”

কয়েক মিনিট। আন্দ্রেয়াকে ভাবতে দিয়ে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর্ত চাতকের মতো বৃষ্টির আশায় বসে না থেকে ব্যস্ততা দেখানোই কাজ। ডাক্তার পেশেন্টের ডিসিশনের জন্য বসে আছে, ভাবতেও অস্বস্তি। এক সময় টেকনিকটা রপ্ত করতে পারেনি। ধীরে ধীরে শিখেছে। জাল ফেলে নির্বিকার হয়ে বসে থাকো। দেখো মাছ জালে পড়ে কি না।

যখন প্র্যাকটিস ছিল না তখনও বাবা-মা বেঁচে। ভাটপাড়ার পুরনো বাড়িতেই থাকতেন। আশিস কলকাতায় স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করার পাশা খেলছে।

বাবা বলেছিল “ভাটপাড়া তো দূর নয়। এখান থেকেই তো যাতায়াত করতে পারিস”

“সময় নষ্ট হবে”

“কতটা? শিয়ালদা কিংবা বিধাননগর থেকে লোকাল ট্রেন ধরবি। মাত্র তো এক ঘণ্টা”

“টাইমটা ফ্যাক্টর নয় বাবা। শরীরের ধকল”

অতএব স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে কলকাতায়। শনি-রবিবার ভাটপাড়ায় আসা।

মা বলত “হোটেলে খেয়ে রোগা হয়ে গেছে। বাড়িতে থাকলে ভালোমন্দ খাবার করে দিতে পারতাম”

পসার তেমন না থাকলেও ভাড়া নিয়েছিল কলকাতার বনেদি এলাকায়। ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের বহুতল অ্যাপারটমেন্টে। দিনভর পেশেন্টের আশায় এক ডাক্তারের চেম্বার থেকে আরেক। লিন্ডসে স্ট্রিটের হোটেলের মালিকদের সঙ্গে দেখা করে টাউট ফিট। কমিশনের হিসেব-নিকেশ। সন্ধেতে রামের বোতলে ভুলে থাকা। শুচিস্মিতা চলে যাওয়ার পর সব যেন শূন্য। সন্ধেবেলা মনের কথা বলার কেউ নেই। নিরালায় সওদাগরি অফিসের কনিষ্ঠ কেরানির মতো ঢাকাই শাড়ি পরা গৃহবধূর স্বপ্ন দেখা। যে এল, সে রইল না। যদি-বা কেউ আসে - সে কী সাজবে অনেক না-চাওয়া না-পাওয়া না-ছোঁয়া ভালোবাসার সীমাহীন মাধুর্যে।

আশিস সবে স্নান সেরে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে রামের বোতলটা খুলে বসেছে। হঠাত ডোরবেল। দরজার ওপারে মধ্য কুড়ির যুবতী।

“একটু চিনি হবে? বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম ইন্দ্রাক্ষি রায়চৌধুরী। উলটো ফ্ল্যাটের”

নামটা ফ্ল্যাটের দরজায় নেমপ্লেটে দেখেছে। আলাপ হয়নি।

“আসুন আসুন। ভেতরে আসুন। আপনি উলটো ফ্ল্যাটের? নামটা দরজায় দেখেছি”

ইন্দ্রাক্ষি ঘরে ঢুকে মাথা নাড়ল। বিনয়ের সঙ্গে বলল “সারাদিনের খাটাখাটনির পর বাড়ি এসে দেখি চিনি শেষ। খেয়ালই করিনি। ভাবলাম, যদি আপনার কাছে ধার নেওয়া যায়...”

মুচকি হেসে বলল “চিনিও কেউ ধার নেয়? দেওয়ার মতো চিনি আছে। প্রথমবার আমার বাড়িতে এলেন। বসুন, চা করে আনি”

আশিস কিচেনে যাচ্ছিল। ইন্দ্রাক্ষি টেবলে রামের বোতল দেখে বলল “আবার চা করবেন? তার থেকে আপনার প্রসাদটাই ভাগ করে নিই। একটা গ্লাস হবে?”

কিচেন থেকে আরেকটা গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল “খাটনি বাঁচল” মনে মনে ভাবল সঙ্গীও জুটে গেল।

রাম গ্লাসে ঢেলে ইন্দ্রাক্ষি বলল “সারাদিন যা ধকল গেছে না। অফিসে ঝামেলা”

চুমুক দিয়ে দেখল ইন্দ্রাক্ষিকে। হলুদ সালোয়ার কামিজ। লম্বাটে মুখ। চুলটা কাঁধ পর্যন্ত। মাঝখান দিয়ে সিঁথি কাটা। দৃষ্টিটা নীচে নেমে এল। সাধারণ হার গলায়। ডান হাতে ঘড়ি। সু-উন্নত বক্ষদেশ। হারের ল্যাজটা আলোছায়ার মতো ঢেকে রেখেছে দুই বুকের মাঝখানের ফাঁকটাকে। সোফায় বসে বলে আন্দাজ হচ্ছে না।

“আপনার ফ্ল্যাট?”

“লোনে কেনা। আপনি ডাক্তার?”

“প্লাস্টিক সার্জেন। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়”

ভুরুটা ওপরে তুলে বিস্ময় “প্লাস্টিক সার্জেন! বাবাঃ” রামের গ্লাসে কোক মিশিয়ে বলল “আমি কোম্পানিতে চাকরি করি। নামটা তো জানেন। ইন্দ্রাক্ষি রায়চৌধুরী”

“কোন কোম্পানি?”

“ফ্যাশন এজেন্সি। নাম শোনেননি নিশ্চয়ই। বিউটি অ্যাট ইটস্ বেস্ট”

এক ঢোকে রাম গিলতে গিয়ে আবার চোখ ইন্দ্রাক্ষির বুকে। যেন ফ্যাশনের সঙ্গে বুকের কোথায় যেন অবিচ্ছেদ্য মিল। বক্ষ আর নিতম্ব ছাড়া কী ফ্যাশন হয়? তার মাধুর্য না বুঝলে কী কসমেটিক সার্জারি করা যায়!

ঠাট্টাচ্ছলে বলল “কোথায় বিউটি আর কোথায় আমি। মনে হচ্ছে বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট একসঙ্গে রাম খাচ্ছে”

জিভ কেটে ইন্দ্রাক্ষি বলল “এ মা ছিঃ ছিঃ। তা কেন?”

জিভ কাটলে যে কোনো মেয়েকে এত মধুর লাগে, আগে জানা ছিল না। নাভির কাছে সুড়সুড়ি টের পাচ্ছে। শুচিস্মিতার সঙ্গ-হারানো অনুভূতিগুলো আবার চাগাড় দিচ্ছে। হাত কচলে রামে চুমুক। অচেনা আকর্ষণ সামনে। এর মধ্যে এমন কিছু আছে, যা অন্য মেয়ের নেই। কী সেটা? যৌবন? না সাবলীলতা? না কি মাদকতা? জানে না। এই মেয়েটির উপস্থিতি যে কোনও পুরুষকে অনায়াসে বশ করতে পারে, যা থেকে পেশায় মহিলাদের শরীর ঘাঁটা ডাঃ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়েরও পরিত্রাণ নেই।

সুপ্ত ইচ্ছেটাকে চাপা দেওয়ার জন্য কথাটা ঘুরিয়ে বলল “আপনি একা থাকেন?”

“হ্যাঁ। বিয়ে করিনি। একাই থাকি”

সব প্রশ্নের জবাব একটা পঙক্তি। ইন্দ্রাক্ষির জীবন যেন ওই কটি শব্দের মধ্যে বাঁধা। আশিস ইতস্তত করছিল কিছু বলবে কি না। এতটা যখন সাবলীল রাখ-ঢাক করে লাভ নেই। দুজনের মাঝে কাচের দেওয়ালটা ভাঙাই শ্রেয়।

“আমার কাহিনিটা একটু অন্য। ডিভোর্সড। ভাড়ায় থাকি”

ইন্দ্রাক্ষি চুপ। কয়েক মুহূর্ত। হাতটা চেয়ারে ছড়িয়ে বলল “চেনা হয়ে ভালোই হল। যদিও চিনি চাইতেই এসেছিলাম, মন বলছিল অন্য কিছু পেলে ভালো, রিল্যাকসেশনের জন্য। থ্যংকস্ ফর শেয়ারিং দ্য ইভিনিং উইথ মি”

মন চাইছিল আরও কিছু। ভাটপাড়ার রক্ষণশীলতা থামিয়ে দিল। নাঃ। প্রথম দিনে, এর বেশি এগোনো ঠিক হবে না।

“আলাপ হয়ে ভালো হল। আমারও তো কোনওদিন চিনির প্রয়োজন হতে পারে। কে জানে?”

পেগে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়ল ইন্দ্রাক্ষি “নিশ্চয়। দরকার হলে কড়া নাড়বেন। চিনি-দুধ ঠিক সময়ই মজুত রাখব” ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। মানে বোঝবার আগেই লকেটটা সরিয়ে ব্লাউজের খাঁজ থেকে একটা কার্ড বার করে দিল “আমার কার্ড”

আশিস অবাক। ড্রয়ার থেকে নিজের কার্ডটা ইন্দ্রাক্ষিকে দিয়ে বলল “আপনি কী বেডরুমেও কার্ড নিয়ে শুতে যান?”

বেরিয়ে যাওয়ার আগে চোখ টিপল “এজেন্সিতে কাজ করি। কখন যে প্রয়োজন হবে, আমিই কী জানি? গুড নাইট। চিনিটা আর নিলাম না। পাওনা রইল। কাল দোকান থেকে কিনে নেব। দুধের দরকার হলে বলবেন। কমতি হবে না”

এত বদান্যতার উৎস আন্দাজ করতে না পারলেও চোখ টেপার অর্থ বুঝতে অসুবিধা হল না। ওপাশের ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে আশিস হাত নাড়ল “সুইট ড্রিমস্”

“ডান। আই উইল হ্যাভ অল দ্য থ্রি ডান” আন্দ্রেয়ার কথায় ফোন রেখে চোখের দিকে তাকাল। দৃষ্টি যে মনের শেষ দ্বিধাটুকু নির্মূল করে দিতে পারে, তার জানা। মাছ তবে জালে ফাঁসল।

“ফাইন। হোয়েন ইউ হ্যাভ অর্গ্যানাইজড্ ইওর ফাইনান্সেস, লেট মি নো”

“আই অ্যাম রেডি। হোয়েন ক্যান ইউ গিভ মি এ ডেট?”

মোবাইলের অর্গ্যনাইজারটা উলটে বলল “ফ্রাইডে। হাউ অ্যাবাউট দ্যাট?”

“ফাইন” মাথা নাড়ল আন্দ্রেয়া।

মোবাইলে ডিটেলসটা নোট করার সময় তখনও একটা বিষয় জানত না আশিস। অপারেশেনের দুদিন আগে ইন্দ্রাক্ষির ফোন। প্লাস্টিক সার্জারির নয়া সংযোজন। ইন্দ্রাক্ষির অপারেশনের প্রোফাইলেক্টিক অ্যান্টিবায়োটিক্। তার নতুন স্বপ্নের আগাম সংযোজন। স্বপ্নেও ভাবেনি আশিস। ভাবতে শুধু পারে ইন্দ্রাক্ষি।

তাই তো সে ইন্দ্রাক্ষি!

কী রূপ দেখতে চায় আন্দ্রেয়ার - তার বিশেষ অনুরোধ।

এ অনুরোধে সাড়া না দিয়ে সে যাবে কোথায়? এতদিনে সে বুঝে গেছে তার জীবনে একটাই নারী। সেই তো বহু চেনা অন্তরের ইন্দ্র। সেই তো প্রোজ্জ্বল হৃদয়ে অঙ্গীকারের একমাত্র সাক্ষী। সেই তো তার জীবন, মরণ, স্বপন, শয়ন। তার নিভৃত বাসরের একা সম্রাজ্ঞী। তার ডাকে সাড়া না দিয়ে যাবে কোথায়?

তার জীবনের ধ্রুবতারা, না-লেখা বন্ধনের একমাত্র সহমর্মী। নতুন রূপে খুঁজে পাওয়া বনলতা সেনের শান্তির প্রলেপ। বহুদেশ ঘুরে একান্ত তরল অনল গরলে, নিভৃত অন্ধকারের আলোয় অগ্নিসাক্ষী। তার একমাত্র ইন্দ্রাক্ষি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%