অনিরুদ্ধ বসু
কথা রেখেছিল রোশন। ঠিক সকাল দশটায় গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল হেড- কোয়ার্টার থেকে।
“না গেলেই নয়?” বাথরোব জড়ানো শিরিন বাথরুম থেকে বেরিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
“অ্যাসাইনমেন্টে এসেছি। দ্য ইভিনিং উই উইল স্পেন্ড টুগেদার” শিরিনের গালে হাত বুলিয়ে ঠোঁটে চুমু দিয়ে লিফটে।
হেড-কোয়াটার্সে যাওয়ার কোনও আগ্রহই ছিল না স্নেহাশিসের। কমপ্লেক্সের বাইরে চৌরাস্তার মোড়ে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা। কখন শিরিন বেরিয়ে যায়। পাক্কা এক ঘণ্টা সিগারেট ধ্বংস। অবশেষে শিরিন টয়োটা ক্যাম্রি ড্রাইভ করে বেরিয়ে গেল। গোলাপি টপস, সানগ্লাস। মুখে যদিও বলেছে ‘না গেলেই নয়?’ মন চাইছিল স্নেহাশিস বেরিয়ে যাক। চতুর্বেদীর তলব। যেতেই হবে।
শিরিনকে বেরিয়ে যেতে দেখে স্নেহাশিস ফিরে এল ম্যাগনাম টাওয়ার্স র অ্যাপার্টমেন্টে। কেয়ারটেকারের ঘরে “কাল রাত কোই অজনবি আয়া?”
“সাব, বাহারকা আদমিকে আনে-জানে ইস রেজিস্টার মে রখতে। দেখ লিজিয়ে”
রেজিস্টার উলটে চোখ বোলাল আগতদের নাম-ঠিকানা আগমনের সময়ের দিকে। ১৩বি ফ্ল্যাটটা সুনেত্রা আগারওয়ালের। রেজিস্টারে ওই ফ্ল্যাটে কারও আগমন লিপিবদ্ধ নেই। কিছুটা বিমর্ষ হয়ে খাতা রেখে দিচ্ছিল। হঠাৎ চোখ পড়ল ফ্ল্যাট ১৩এ ওপর। আরে, ওটা তো শিরিনের ফ্ল্যাট। একজনের নাম লেখা। কিছুটা অস্পষ্ট। নামটা পড়ার চেষ্টা করল। সিন্ধ রাও দেশমুখ। টাইম অফ এনট্রি ৭ ৩০ পিএম। সে সময় তো সে শিরিনের ফ্ল্যাটে। আর তো কেউ আসেনি। কে এই লোক? যে শিরিনের ফ্ল্যাটের নাম করে কমপ্লেক্সে ঢুকেছিল অথচ শিরিনের ফ্ল্যাটে আসেনি? এই কি সে যাকে কালো স্যানট্রো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছিল কাল রাতে? এত ফ্ল্যাট থাকতে, শিরিনের ফ্ল্যাটের নাম দিয়ে ঢুকল কেন? তবে কী শিরিনের সঙ্গে কোনও যোগসাজস আছে? না কি, স্নেহাশিস ওখানে আছে বলেই অ্যালিবি খাড়া করছে?
“১৩এ ফ্ল্যাট তো শিরিন মেমসাবকা। সাড়ে-সাত বজে তো উধর হম থে। ঔর কোই তো নেহি আয়া। তব ইয়ে আদমি সিন্ধ রাও দেশমুখ কিধর কিসকে ঘরমে আয়া থা?”
“কেয়া জানে বাবু? যব কোই আতা তো নাম-পতে ঔর ফ্ল্যাট নম্বর ইধর লিখতা”
“ওহ ফ্ল্যাট মে ফোন নেহি করতা?”
“নেহি সাব। ইধার রেওয়াজ নেহি”
এ আবার কী ধরনের সিকিউরিটি? সব শো। গোড়ায় গলদ। শিরিনের ফ্ল্যাটের নাম যখন ব্যাবহার করেছে, তখন কী শিরিনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে? না কি স্নেহাশিসকে সাক্ষী রেখে অন্য কোনও ফ্ল্যাটে ঢুকেছে? সুনেত্রা আগারওয়ালের ফ্ল্যাটে। লিফট নিয়ে উঠে এল তেরো তলায়। চাবিটা দিয়ে ঢুকল সুনেত্রা আগারওয়ালের ফ্ল্যাটে। একাই খুঁজতে হবে সিন অফ ত্রুাইম। সুইসাইড না হোমিসাইড?
রোশনকে ফোন “অব ফ্ল্যাট মে হু। টাইম মিলে তো আ জানা। কাল প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশন সব কর লিয়া? ম্যায় হাত দে সকু?”
“জরুর। থোড়া বহত টাইম লগেগা জানে মে। সাত বাংলা মে এক ড্রাগ র্যাকেট পকড়া। উধর পুছতাছ করনা পড়েগা”
“ঠিক হ্যায়। ম্যায় ইধর দেখতা হু। তু আনে কা টাইম কুছ খানা লে আনা”
“জরুর দোস্ত”
ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখল সেলফ-লকিং দরজা। কালকে নেশার ঘোরে ঠিক খেয়াল করেনি। কেউ যদি ঘরে এসে বেরিয়ে যায়, বোঝাও যাবে না সে ঘরে এসেছিল। কেউ এসেছিল কী? এসেই যদি থাকে, নিশ্চয়ই সুনেত্রার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। না হলে, ভেতরে ঢুকল কী করে? এই অজ্ঞাত সিন্ধ রাও দেশমুখ, এটা ওর আসল নাম না হওয়াই স্বাভাবিক। দুটো পসিবলিটি খুঁটিয়ে দেখতে হবে। হোমিসাইড না সুইসাইড? উত্তর লুকিয়ে আছে কম্পিউটার আর মোবাইলে।
পরিতোষ সেন তার বসের মতো পিছুপা হয়নি। মধুসূদন মুখুজ্জের ফোন পেয়ে বলল “নিশ্চয়ই দেখব স্যার। ওদের পরিবারকে দেখে বড্ড মায়া হচ্ছিল। ওদের তো কোনও খুঁটির জোর নেই। আমারও তো ওই বয়সি একটা ছেলে আছে। বড়সাহেব আমায় অন্য একটা কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বললেন রিপোর্টটা উনি পাঠিয়ে দেবেন। আমি আর গা করিনি। হয়ত উনি নিজেই ইনভেস্টিগেশন করবেন ভেবেছিলাম”
ফোনটা নামিয়ে মনটা দুঃখে ভরে গেল। শহরে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। সবের কী কূল-কিনারা হয়? কিছু কিছুর হয়। যেখানে কোনও রথী মহারথীদের হস্তক্ষেপ থাকে। রিটায়ার্ড রজত সান্যালের সে ক্ষমতা নেই।
ঐত্রেয়ীকে ফোন। লাইন লাগতেই নারীকণ্ঠের আওয়াজ “ঐত্রেয়ী মুখার্জি স্পিকিং”
“পরিতোষ সেন। মানিকতলা থানার এএসআই”
“বলুন” নিষ্পৃহ গম্ভীর আওয়াজ।
“আপনি সোহম সান্যালকে চিনতেন?”
“হ্যাঁ। আমি এখন ব্যঙ্গালোরে” অতিরিক্ত আবেগ নেই। এতদিনে ব্যাপারটা সামলে নিয়েছে। মিলন তো বলেইছিল ঐত্রেয়ী ব্যাঙ্গালুরুতে চাকরি করে।
“সোহম মারা গেছে জানেন?”
“শুনলাম। আমাদের কমন ফ্রেন্ডের কাছে”
যেন পরিতোষ সেন শুনতে পায়নি “কার কাছে?”
“আমি এখন অফিসে। আপনার কিছু প্রশ্ন থাকলে সন্ধেবেলা ফোন করুন”
“কটায়?”
“রাত আটটার পর”
রাত তখন রাত নটা। পরিতোষ সেন সবে ডিউটি থেকে ফিরেছে। মনে পড়ল ঐত্রেয়ীকে এখনও ফোন করা হয়নি।
“পরিতোষ সেন বলছি। সকালে ফোন করেছিলাম...”
“হ্যাঁ বলুন” ওপাশে ঐত্রেয়ী।
“এখন ব্যাঙ্গালুরুতেই থাকেন?”
“কিছুদিন ধরে আছি”
“শুনলাম সোহমের বন্ধু ছিলেন। সোহম যে রাতে মারা যায় আপনি ফোন করেছিলেন?”
“আপনাকে কে বলল?”
“মিলন। আপনাদের বন্ধু মিলন চ্যাটার্জি”
“ও কী করে জানল?”
“সোহম তখন ওর পিজি অ্যাকোমোডেশনে যখন আপনি ফোন করেছিলেন। বোধহয় সোহমের কথা বলা দেখে আন্দাজ করেছিল। সোহমের মৃত্যুর দিন আপনি কোথায় ছিলেন?”
“ব্যাঙ্গালুরুতে” সংক্ষিপ্ত উত্তর।
“কবে থেকে ওখানে?”
“প্রায় মাস দুয়েক। আগে অবশ্য কলকাতাতেই ছিলাম”
“হঠাৎ ওখানে?”
বিরক্ত হয়েই বলল “চাকরি পেলাম। চলে এলাম। যেখানে চাকরি সেখানেই তো থাকতে হবে” বোঝাই যাচ্ছে ব্যাঙ্গালুরু যাওয়াতে খুশি নয়।
“কোনও কোম্পানি?”
“দ্য নিউ এজ”
“কোম্পানির মালিক কে?”
“অতশত জানি না। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার মিঃ পি কে খাসনবিস আমায় পোস্টিং দেন”
কোম্পানি নিয়ে কথা না বাড়িয়ে আসল কথায় এল “আপনার সঙ্গে সোহমের কী সম্পর্ক?”
“মানে?” বিরক্ত ঐত্রেয়ী। নিজেকে সামলে বলল “বন্ধুত্ব”
“নিছক বন্ধুত্ব? কী রকম? এর বাইরেও অন্য কিছু?”
“সব কথা কী আপনাকে বলতে হবে? মাত্রা ছাড়িয়ে প্রশ্ন করছেন” ঐত্রেয়ীর প্রচ্ছন্ন ধমকানি। শিক্ষিত মেয়ে। এএসআইয়ের এক্তিয়ার অজানা নয়।
“ঠিক আছে। ও ব্যাপারে প্রশ্ন করব না। সোহমের বন্ধু ছিলেন বলেই দু-একটা প্রশ্ন না করে পারছি না। আপনিও তো চান সোহমের মৃত্যুর কিনারা। কিছু তথ্য না জানলে আমাদের পক্ষে এগোনো মুস্কিল”
“আমিও চাই সোহমের মৃত্যুর বিহিত হোক” ঐত্রেয়ীর সম্মতি।
“আপনি কী ওই রাতে ওকে ফোন করেছিলেন?”
“হ্যাঁ”
“ওর কথায় কোনও আশঙ্কা বা চিন্তা লক্ষ করেছিলেন?”
“না। আর পাঁচটা দিনের মতোই স্বাভাবিক”
“এনি প্রবলেম?”
“নাঃ।... বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই ও বিব্রত। বলেছিল বাবা রিটায়ার করেছে। বোন প্রিয়ার বিয়ে বাকি। থিসিসটাও শেষ হয়নি। অথচ চেন্নাইতে মোটা মাইনের চাকরির অফার। কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না”
“আর কিছু?”
বলতে যাচ্ছিল ঐত্রেয়ী। সামলে নিয়ে বলল “নাঃ। তেমন কিছু নয়”
“কারও ওর ওপর শত্রুতা? আই মিন কোনও পলিটিক্যাল পার্টি?”
“বাপের জন্মে যে রাজনীতি করল না, তার কোনও পার্টির সঙ্গে শত্রুতা থাকবে কেন?”
“অন্য ব্যাপারে কী জড়িয়ে পড়েছিল?”
ওদের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড সুনেত্রা আগারওয়ালের কথা মনে এলেও চেপে গেল। এটা মার্ডার কেস। ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের জের টানতে চাইল না। মনোমালিন্যটা ওদের মধ্যেই থাক। সোহমের মৃত্যুর মধ্যে টেনে পুলিসি ঝামেলা বাড়াতে চায় না। এই পুলিসদের বিশ্বাস নেই। কীসের সঙ্গে কোনটাকে লটকে দেবে কোনও ভরসা আছে? ভাগ্যিস। যদি জানত সুনেত্রা এখন জীবিত নেই তাহলে তো আরেক গাড্ডায়। পৃথিবীতে কত কিছু ঘটে তার কতটুকুই বা আমরা জানতে পারি? আর জানলেও, কটাই বা বুঝতে পারি? আর বুঝলেও, কতটুকুই বা করতে পারি?
“আর তো কিছু মনে পড়ছে না। যদি আর কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে পরে ফোন করতে পারেন”
“আপাতত নেই” ফোনটা রাখতে যাচ্ছিল, কী মনে হতে বলল “একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছিলাম। ডেড বডির কাছ থেকে মোবাইলটা পাওয়া যায়নি। আপনি কিছু বলতে পারবেন?”
“কী করে বলব? আমি তো ডেড বডির পাশে ছিলাম না” ব্যঙ্গ করেই বলল।
“কোথায় ছিলেন সেদিন?”
“এখানে। ব্যাঙ্গালুরুতে”
“কী করে জানলেন সোহমের মৃত্যুর খবর?”
“পরের দিন মিলন ফোনে জানায়”
"কলকাতায় গেছিলেন ওকে দেখতে?"
“নাঃ। ইচ্ছে ছিল। ছুটি পাইনি। লোকটাই যখন বেঁচে নেই, ওর ডেড বডি দেখে কী হবে? আপনার প্রশ্ন শেষ হয়েছে? না কি আর কিছু আছে? এই ফিরেছি। এবার রান্না করতে হবে” ফোন কেটে দিল ঐত্রেয়ী।
কতগুলো প্রশ্ন উঁকি মারছে পরিতোষ সেনের মাথায়। কথা শুনে মনে হল না সোহমের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক ছিল। ভাবলেশহীন, নির্বিকার। অথচ মিলন তো বলল ওদের ভাব-ভালোবাসার কথা। যুগটা কী এতই বদলে গেল? আপনজনের বিদায়ব্যথা মানুষকে নাড়া দেয় না। সবাই ছুটছে। এই ছুটে চলা পৃথিবীর অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে মাসের মাইনে গুনতে গুনতে জীবন পার করে দিল। তার ছেলেটাও কী একদিন এমনিভাবে বাবার মৃত্যুকে জীবনের অবশ্যম্ভাবী নিয়ম মেনে, অনুশোচনামুক্ত হারিয়ে যাবে? ভারাক্রান্ত হৃদয় ফোন রেখে, ইউনিফর্ম ছেড়ে হাঁক দিল “কই গো, খাবার বাড়ো। স্নান সেরে আসছি”
খিদের ক্লান্তিতে ভুলে গেছিল, ফোনের হদিস পায়নি। সোহমের পকেট থেকে পাওয়া ফোন নম্বরেরও কূল-কিনারা হয়নি। কাল নয় সুনেত্রাকে ফোন করে বাকি কাহিনি জেনে নেবে।
স্নেহাশিস ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে লক করে গিয়ে দাঁড়াল ব্যালকনিতে। কংত্রিুট নগরীর বহুতল আকাশ ছুঁতে চাইছে। কিংবা আকাশটাকে ঢেকে দিতে। কংক্রিটের চূড়া থেকে ফিরে দেখল স্বপ্নরাজ্যের সকালের আকাশটাকে। কোথায় সবুজের সমারোহ, বনাঞ্চলের স্নিগ্ধ ছায়া, গোপগড়ের পাপড়ি মেলা ফুলের হাসি? গরিব কৃষক ছেলের মিষ্টি-মধুর বাঁশি। অভ্রদিতা যতই দুঃখ করুক ছায়াঘেরা সবুজ ছেড়ে কেন যে লোকে ছোটে এই কংক্রিটের জালে?
ব্যালকনিতে ধ্বস্তাধস্তির চিহ্ন খুঁজছে। কোণে সিগারেটের টুকরো। কাল রাতে অন্ধকারে রোশন মিস্ করেছে। সুনেত্রা কী সিগারেট খেত? যদি না, তবে কে এসেছিল যে সিগারেট খায়? ড্রয়িং রুম থেকে শোবার ঘর। খুঁজে বেড়াচ্ছে কোনও অন্য মানুষের আর্বিভাবের ক্লু। সিগারেট ধরিয়ে অ্যাশট্রে খুঁজছে। যে সিগারেট খায় তার বাড়িতে অ্যাশট্রে নেই!? তাহলে সিগারেট বাট কে ফেলেছে? আগে কোনও ছেলেবন্ধু এসে থাকতে পারে। অ্যাশট্রে না পেয়ে বারান্দায় সিগারেট খেতে চলে এসেছিল। পরিষ্কারের আগেই মৃত্যু। কিচেন থেকে কাপ নিয়ে কম্পিউটারের পাশে বসল। ছবিগুলো স্ক্রোল করছে এলোমেলোভাবে। বিভিন্ন ধরনের। অকস্মাৎ একটা ছবিতে থমকে। ছবিটার চোখ কোথায় দেখেছে। চেনা, অথচ মনে করতে পারছে না।
মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। যদি ফেলুদার মতো হতে পারত। একটা নাম বলতেই লোকটার ইতিহাস বলে দিতে পারত। হিন্দি সিনেমার নায়কের মতো সবসময় জেতা যায় না। শুধু রঙিন পর্দায় সম্ভব, জীবনে নয়। স্বপ্নের দুনিয়ায় সব মানুষই কাউকে সুপার-হিরো বা সবজান্তা দেখতে চায়। তাই বিদগ্ধ গুণীদের নিয়ে কতই না রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস লেখা। যখন স্বপ্নের মানুষদের মতো সবজান্তা হতে পারে না, মনে হয়, কেনই বা পুলিসে? শুধু চাকরির তাগিদে? প্রতিদিন খুন, রাহাজানি দেখেও কেনই বা বুদ্ধি ওদের মতো তীক্ষ্ণ নয়? কারণ সে জীবন্ত। অন্যরা লেখকদের স্বপ্ন। কল্পলোকে ভেসে বেড়ানো বুদবুদ।
মাথায় এসব চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ছবিগুলো ওলটাতে লাগল। এত সাধু-সন্ন্যসীর ছবি কেন? সুনেত্রা কী আধ্যাত্মিক ছিল? বিভিন্ন সাধু-সন্ন্যাসীর ছবির মধ্যে হঠাৎ শিরিনের ছবি। জিনস-টপসে হাসছে। বোধহয় সুনেত্রার তোলা। না হলে কম্পিউটারে কী করে? শিরিন যে বলছিল সুনেত্রার সঙ্গে কেবল ‘হ্যলো-হায়’ সম্পর্ক। সুনেত্রার সঙ্গে সম্পর্ক ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেল?
মোবাইলে শিরিন “হ্যালো স্নেহাশিস... তুমি কোথায়?”
“কাজে। কেন?”
“আজ রাতে লাসানিয়া খাবে?”
“যা খাওয়াবে”
“ভাবছিলাম, লেটস মেক ইট অ্যান ইটালিয়ান ইভিনিং টুডে”
“হোটেলে?”
“নাঃ... বাড়িতে। তোমার জন্য ইটালিয়ান রান্না করব”
“তাহলে এক বোতল সিয়ান্তি নিয়ে এস”
শিরিন ফোন কেটে দিল।
এতক্ষণ মনে পড়ছিল না। এই লোকটার চোখের সঙ্গে মেহুলির সুটে পাওয়া আধছেঁড়া ছবির অনেক মিল। ফিরে গেল ওই লোকটার ছবিটায়। ভালোভাবে দেখল। কল্পনায় আঁকার চেষ্টা করল মুখটাকে। যদি আগে জানত। ছবিটা রিপোর্টের সঙ্গে অ্যাটাচ করে পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন আবার লালবাজারে গিয়ে ছবিটা খুঁজে বার করতে হবে। যদি অনুমান সত্যি হয়, তবে মেহুলির মৃত্যুর সঙ্গে এই মেয়েটির মৃত্যুর কোনও যোগসাজস আছে। স্নেহাশিস কী তবে একটা আইসোলেটেড মৃত্যুর তদন্ত করতে গিয়ে বৃহত্তর চত্রেু ঢুকে পড়েছে?
ফোন করল রোশনকে “আনেকে ওয়াক্ত একঠো হার্ড ডিস্ক ভি লে আনা”
“কিউ?”
“কম্পিউটার মে বহত সারি চিজকা ঠিকানা লাগানা হ্যায়। ঔর হো সকে তো মোবাইল নম্বরকা সার্ভিস প্রোভাইডারকে পাস সে সুনেত্রাকে মোবাইল কল কা পুরা প্রিন্ট আউট”
“উসকা মোবাইল নম্বর?”
“মালুম নেহি। উসকে মোবাইল সে একঠো মিসড্ কল দেতা হুঁ”
রোশন ইতস্তত করে বলল “মত কর। ইয়ে টাম্পারিং অফ এভিডেন্স হোগা। তু মেরে উপর ছোড় দে। ম্যায় পাতা লাগাতা” ফোনটা কেটে দিল।
উইন্ডোস এক্সপ্লোরার এলোমেলো ওলটাচ্ছে। ‘মাই ভিডিওস’ এ স্ক্রোল করতে গিয়ে কতগুলো থাম্বনেলস দেখে অবাক। এ কী? এ তো কল্পনারও বাইরে। ডবল ক্লিক করতে উইনডোস মিডিয়া প্লেয়ারে ভিডিও খুলে গেল। এ তো ব্লু ফিল্ম। একজন ছ’ফিট লম্বা ভারতীয় সুপুরুষের সঙ্গে তিনটি মহিলার দৈহিক লীলা। গ্রুপ সেক্স। এ ছবি সুনেত্রা আগারোয়ালের কম্পিউটারে কেন? সন্ন্যাসীভক্ত মেয়েটা কী ব্লু ফিল্ম দেখত? আরেকটা ভিডিও। আবার সেই পুরুষ। এবার অন্য দুই নারী। নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে কামসূত্র। শয়নকক্ষ দেখে মনে হচ্ছে বিলাসবহুল পাঁচ তারা হোটেল। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, চাপা দাড়ি, সুপুরুষের সামনে ধীরে ধীরে বিবস্ত্র হচ্ছে দুই নারী। হুইস্কি খেতে খেতে স্ট্রিপটিজ দেখছে। দুটি নারীই ভারতীয়। বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছে উচ্চবিত্ত ঘরের। প্রথমটির পরনে নীল জিনস্, সাদা টপস্। অর্থহীন ঝাঁকানির মতো নৃত্যের তালে তালে ছন্দ মিলিয়ে, খুলে ফেলছে সাদা টপস। সালোয়ার-কামিজ পরা অন্য নারীর হাতের স্পর্শে খুলে গেল জিনস্। কালো লেসের প্যান্টি আর ব্রা কালো পর্দার মতো ঢেকে রেখেছে শ্বেতশুভ্র দেহ। দুহাত উঁচু করে সালোয়ার থেকে মুক্ত করছে অন্যকে। একসময় কামিজও মাটিতে। পুরুষ নির্বাক দেখছে। একসময় ফর্সা দেহ থেকে কালোর আভরণও খসে পরল। শ্যামলা দেহ থেকে সাদার শেষ সুতিকণাটুকুও। শুরু দুই নারীদেহের দৈহিক লীলা। সৌম্য পুরুষ নীরব দর্শক।
ভিডিওটা বন্ধ করে দিল। শিরিনের কথামতো গরমিল লোকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল? সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। খোঁজ লাগাতে হবে, কে এই পুরুষ? সুনেত্রা আগারওয়ালের সঙ্গে কী সম্পর্ক? ভিডিও নিয়ে আর সময় নষ্টর মানে হয় না। সন্ধেবেলা জীবন্ত ভিডিও মজুত ইটালিয়ান খাবার, ওয়াইনের সঙ্গে।
হাসি পেল। প্রথম যৌবনে এই ভিডিও দেখার জন্য সবাই মিলে কোনও বন্ধুর চিলেকোঠায় হুমড়ি খেয়ে পড়ত। তারপর জীবনে প্রচুর নারী। সেই সঙ্গে ভিডিও দেখার বাসনাও মলিন। সামনে যখন জীবন্ত সুন্দরী, কী লাভ মিথ্যে ছবির ফুলঝুরিতে? মুম্বাইয়ের টপ মডেল বিবস্ত্র হতে আগ্রহী। একটু ভয়। শিরিনের অনেক কিছুই অস্পষ্ট। শেষে জড়িয়ে আবার নিজেই কেওড়াতলার বডি নম্বর ফোর হবে না তো? ঠিক আঁচ করতে পারছে না মৌচাকের কোথায় দাঁড়িয়ে। শিরিনই বা কোথায়? ছবিটা একবার ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল - ‘মুম্বাইয়ের বিখ্যাত মডেলের ফ্ল্যাটে তরুণ পুলিস অফিসারের মৃতদেহ’। খবরটা রোমহর্ষক হলেও অভ্রদিতা, ঋজুর পক্ষে সুখকর হবে না।
আউটলুকে ই-মেল পড়ছে। এক মহিলার সঙ্গে অনেক ই-মেল বিনিময়। নাম ঐত্রেয়ী। ঐত্রেয়ী মুখার্জি। কে এই মহিলা? গত রাতে সোহমকে লেখা চিঠিতে এই নামের উল্লেখ দেখেছে। এ তো লাভ ট্রাইঙ্গেল। সোহম স্যান্যাল। সুনেত্রা আগারওয়াল। ঐত্রেয়ী মুখার্জি। অনেক চিঠি। সোহমকে ঐত্রেয়ীর খপ্পর থেকে মুক্ত করবার অনুরোধ অনুনয়। একটা চিঠিতে, সোহমের জবাব ‘সুনেত্রা হোয়াই ডোন্ট ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড দিস সিমপল ইস্যু। ইউ মে হ্যাভ ফলেন ইন লাভ উইথ মি। বাট আই হ্যাভ নো সাচ ফিলিংস ফর ইউ’ প্রেমে প্রতিঘাত। আছড়ে পড়েছে ঐত্রেয়ীর ওপর। তার থেকেই কী আত্মহত্যা? ই-মেলের শব্দে মাথায় জলতরঙ্গ। ‘হোয়াই কান্ট ইউ লিভ সোহম আউট?’ ‘হাউ ডেয়ার ইউ অর্ডার মি?’ ‘আই উইল মেক শিওর ইউ আর আউট অফ সোহমস লাইফ’ ‘আই উইল সি ইউ আউট অফ ইওর লাইফ টু’
ওরে বাবা। রাগে খুনের হুমকি। মহিলাদের বিবেক নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আকাশ ছুঁতে পারে। ভাগ্যিস শিরিন সেই পর্যায় যায়নি। অভ্রদিতার সঙ্গে স্নেহাশিসকে বাঁচতে দিয়েছে। আজ যদি কিছু চায় প্রত্যাখ্যান করে কী করে? কে এই সোহম? কেই বা ঐত্রেয়ী? এই মৃত্যুর অনেক ক্লু বাংলার মাটিতে। চিঠি পড়ে অদ্ভুত লাগল। সোহম ঐত্রেয়ীর গতিবিধির অনেক তথ্য মিলন চ্যাটার্জির চিঠিতে। মিলনের কী স্বার্থ সুনেত্রাকে এত কথা জানাবার? এই মিলন শেষবারের মতো ফোন করেছিল সুনেত্রা আগারোয়ালকে।
বেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই রোশনের সঙ্গে হাবিলদার প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে ঢুকল।
“ইস মে কেয়া?”
“চাইনিজ। তু মেরা মেহমান। কামকে বিচ ইধর লাঞ্চ করুঙ্গা”
“ডিস্ক লায়া?”
রোশন হবিলদারেকে “শিউকুমার, গাড়ি সে হামারে অ্যাটাচি লানা। সিরিফ ডিস্ক কেও? বহত কুছ”
“এয়ারপোর্ট মে দেখা ছোটা উমর কা দোস্ত শিরিন কে বারে জান-পহেচান করোগে? উলটে তরফ ফ্ল্যাট মে রহতি”
“কাল তো তু উধারি রাত বিতায়া” মুচকি হাসল।
“চল কম্পিউটারকে পাস। ম্যায় বতাতা হু” সব তথ্য রোশনকে দেখাল।
“কল রাত শিরিন বোলা সুনেত্রা সে উসকা সিরিফ ‘হ্যালো-হায়’ রিলেশন। ঔর ইধর দেখ। উসকা ইতনা তসবির। সোচনে কি বাত হ্যায় না?”
মাথা নাড়ল রোশন “সহি। উসসে কিতনা দিনকে জান-পহেচান?”
“এক সাথ কলেজ মে পড়তে থে” মোহাব্বতের কথা চেপে গেল “ফির ম্যায় আইপিএস, সাদি। ও মুম্বাই আয়া তকদির ঢোড়নে। জিস খুনকে সিলসিলে ম্যায় ইঁহা, যব উধর ইনভেস্টিগেশন কর রহা থা, উসকা ফোন চার বরষ বাদ। মেহুলিকে বারে মে পুছতাছ কর রহি থি”
গরমে মাথা কাজ করছিল না। পাখার তালায় রোশনের মাথা কাজ করছে। ইধর কুছ ঢুরনা পড়েগা। লড়কি ইধর মরি। পরন্তু বাঙ্গাল কি। শিরিন, মেহুলি ভি ওহা কি। বাঙ্গাল সে গহরা তালুক হ্যায়।
“চার বরষ মে ফোন নেহি কিয়া?”
“নেহি”
“ফির তো সোচনেকে বাত”
“ভিডিওকে আদমি ঔর ছোকরি লোগ...”
“ভিডিও সে সমঝ নেহি হোতা। ফির ভি তসভির দেখ কর লগতা ইনলোগ মারাঠি। তুঝে? সুসাইড ইয়া হোমিসাইড?”
“হোমিসাইডকে এভিডেন্স নেহি মিলা। দিল বোলতা হ্যায় সুইসাইড নেহি। তেরেকো বোলনা ভুল গয়া। কাল রাত এক আদমি ইস বিল্ডিং মে আয়া থা। রেজিস্টার মে লিখা উসকা নাম, সিন্ধ রাও দেশমুখ। শিরিনকে ভিসিটর। টাইম অফ এন্ট্রি ৭ ৩০। উস ওয়াক্ত হম শিরিনকে উহা। কোই ভিসিটর নেহি আয়া। কৌন ইয়ে আদমি? শিরিনকে নামমে এনট্রি কিউ?”
“সয়েদ শিরিনকে সাথ কুছ তালুক হ্যায়। আয়া থা উসে মিলনে। ফির তুঝে উধর দেখ কর সটক্ পড়া”
“ইয়ে ভি হো সকতা, ইয়ে আদমি ইস লড়কি কে ফ্ল্যাট মে আয়া থা। নাম ছোড়, ইয়ে নাম সয়েদ গলত। হমে কনফিউজ করানেকে লিয়ে বগলওয়ালা ফ্ল্যাটকা পতা লিখা”
“হো সকতা”
“যব ইয়ে লড়কি কি চিল্লানেকা আওয়াজ শুনা ঔর ব্যালকনি সে দেখা এক কালা স্যানট্রোকো নিকলতে। সয়েদ ইয়ে আদমি কালা স্যানট্রো মে আয়া থা”
“আওয়াজ শুননেকে কিতনা দের বাদ ব্যালকনি মে গয়া?”
“কই মিনিট”
“অব হমে দেখ না হ্যায় উপরসে লিফট মে নীচে জানে কিতনা টাইম লাগতা। ফির গাড়ি কর নিকলনে মে। স্টপওয়াচ শুরু কর। মোবাইল মে হ্যায়?”
“হাঁ। যব ম্যয় হাঁ বলুঙ্গা”
রোশন বেরিয়ে গেল। স্নেহাশিস বারান্দায়। রোশনকে বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে কার পার্কে। স্টার্ট দিয়ে যখন গাড়িটা গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল, স্নেহাশিস টাইম দেখল। পুরো আট মিনিট।
ব্রিফকেস হাতে ফিরতেই বলল “পুরে আঠ মিনিট”
“তু কেয়া আঠ মিনিটকে বাদ ব্যালকনি মে গয়া?”
“নেহি। উতনা নেহি হোগা” মনে করার চেষ্টা।
“ইয়ে আদমি তেরা মার্ডারার নেহি। উস টাইম মে বারন্দে সে লড়কি কো ঢকেলকর স্যানট্রো লে কর নিকল নেহি সকতা” ডাইনিং টেবলে বসে হাবিলদারকে বলল “শিউকুমার, খানা লগানা”
স্নেহাশিস ভাবছে কতক্ষণ সে শিরিনের প্রন খাচ্ছিল? কতক্ষণইবা ক্লাসিক ধরাতে লেগেছিল? চার মিনিটের বেশি হতে পারে না। তাহলে কী মেয়েটা সত্যি আত্মহত্যা করেছে? মন বিশ্বাস করছে না।
“চলা আ। খানে সে দিমাক খুলেগা”
কম্পিউটারের চেয়ার ছেড়ে খাবার টেবলে বসল স্নেহাশিস। সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। রোশন ঠিকই বলেছে। পেটে কিছু না পড়লে মাথা কাজ করবে না।
ক্ষুধা সর্বগ্রাসী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।